মোবাইল ব্যাংকিং সেবা :আওতায় নেই ৭০% নারী

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ২০:৩৩

 

মোবাইল ব্যাংকিংয়ে দেশের নারীরা অনেক পিছেয়ে রয়েছেন। জাতিসংঘের মূলধন উন্নয়ন তহবিল (ইউএনসিডিএফ) ও মাইক্রোসেভ কনসালটিংয়ের এক যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশের ৬৯ শতাংশ নারী এখনো মোবাইল ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়েছে। রাজধানীর একটি হোটেলে সম্প্রতি ‘পজিটিভ ডেভিয়েন্টস-হোয়াই উইম্যান ইউজ ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (ডিএফএস) ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই সেমিনারে ওই গবেষণার সারসংক্ষেপ প্রকাশ করা হয়।

সেমিনারটির মাধ্যমে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রোভাইডার, ব্যাংক, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ এবং ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে লিঙ্গ বৈষম্য নিয়ে যারা কাজ করেন তাদেরকে একত্রিত করেছে। ডিএফএস মূলত ব্যাংকিং বহির্ভূত জনগণ, মোবাইল এন্টারফেস ভিত্তিক লেনদেন ও বিকল্প মাধ্যমগুলোতে যারা দেনদেন করে তাদেরকে নিয়ে কাজ করছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরের নারীদের মধ্যে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের হার ভালো হলেও পিছিয়ে রয়েছেন গ্রামীণ নারীরা। তাই নারীদের মধ্যে এখনো ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণের। বিশেষ করে কর্মজীবী নারীদের ক্ষেত্রে। এছাড়া এখন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে নানা ধরনের ছাড় দেয়া হয়। সেটিকে আরো নারীবান্ধব করা হলে; বিশেষ করে নারী অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ পরিশোধ করা হলে, আরো বেশি ছাড় দেয়া হলে তাদের মধ্যে এ নিয়ে আগ্রহ বাড়বে। যেসব নারীর স্বামী বা অভিভাবক বিদেশে থাকেন, তাদের বাজারে লেনদেন করতে হয়। ফলে তাদেরও এ সেবার আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে।

গবেষণানুযায়ী, দেশের ১৮টি বাণিজ্যিক ব্যাংক এখন মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ সেবা গ্রহণ করছে সাড়ে ছয় কোটিরও বেশি মানুষ। প্রতি মাসে গড়ে লেনদেন হচ্ছে ৩০-৩৫ হাজার কোটি টাকার। কিন্তু দেশের নারীরা এখনো মোবাইল ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছেন। মাত্র ৩১ শতাংশ নারী এ সেবা গ্রহণ করলেও বাইরে রয়ে গেছেন ৬৯ শতাংশ। দেশের ৬৭% মানুষের হাতে মোবাইল ফোন রয়েছে। যার মধ্যে ২৪% বেসিক ফোন, ৩৭% ফিচার ফোন ও ২০% স্মার্টফোন।

গবেষণার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দ্রুত প্রকাশ করা হবে বলে গতকালের সেমিনারে জানান ইউএনসিডিএফের কান্ট্রি প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেটর মো. আশরাফুল আলম। তিনি বলেন, গবেষণার মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার বেশকিছু দিক তুলে আনা হয়েছে। নারীরা কেন সেবাটি গ্রহণ করছেন না, কিংবা যারা নিচ্ছেন, কোন কোন বিষয় তাদের উত্সাহিত করছে, সেবাটির পরিধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেসবই এতে নির্ণয় করা হয়েছে।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত  ওই সেমিনারের প্যানেল প্যানেল আলোচনায় ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিং শাখার প্রধান সরদার আকতার হামিদ বলেন, ‘নারীদের মোবাইল ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের জন্য একটি প্লাটফর্ম প্রয়োজন। আর্থিক কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তির জন্য বিষয়টিকে ঝামেলাহীন করতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংক হিসাব খোলার সময় সাত-আট পাতার একটি ফর্ম পূরণ করা হয়। এটি পূরণ করতে অনেকেই নিরুত্সাহী হন।’

গবেষণায়  আরো উঠে আসে, ২০১০ সালে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালুর অনুমতি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলো বিভিন্ন মোবাইল ফোন অপারেটরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে এ সেবা দিচ্ছে। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক প্রথম এ সেবা চালু করলেও এ খাতে এখন সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশ। এখন পর্যন্ত ২৮টি ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অনুমোদন নিয়েছে। এর বিপরীতে চালু করেছে ২০টি ব্যাংক। মোট গ্রাহকের প্রায় ৯০ শতাংশই রয়েছেন বিকাশ ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের রকেটের আওতায়।

সেমিনারে ইউএন উইম্যানের প্রোগ্রাম স্পেশালিষ্ট দিলরুবা হায়দার বলেন, ‘মোবাইল ব্যাংকিংয়ের যেসব সেবা ও প্রডাক্ট রয়েছে, সেগুলো নারীবান্ধব কিনা, সেটি দেখতে হবে। নারীরা কী কারণে এ সেবা নিচ্ছেন না, সেগুলো আরো বিশ্লেষণ করতে হবে। সে অনুসারে মোবাইল ব্যাংকিং পণ্য চালু ও জনপ্রিয় করতে হবে।’

বিকাশ লিমিটেডের চিফ এক্সটার্নাল অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার মেজর জেনারেল (অব.) শেখ মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের মোবাইল ব্যাংকিং সেবা নিচ্ছে তিন কোটির বেশি গ্রাহক। এর মধ্যে নারী গ্রাহক ৩০ শতাংশ। তবে গ্রাহক ৩০ শতাংশ থাকলেও ব্যবহার ও নগদ সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ আরো কম। আমরা আমাদের সেবাকে নারীদের মধ্যে পৌঁছাতে আরো সম্প্রসারণমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করেছি। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের নারীদের মধ্যে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছাতে যৌথভাবে কাজ করা হচ্ছে। ভালো সাড়াও পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের মধ্যে পৌঁছাতে কাজ চলছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি শেষে দেশে মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবের সংখ্যা ছিল ৫ কোটি ৯৬ লাখ ৪৫ হাজার। সেখান থেকে বেড়ে অক্টোবরে গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৬৮ লাখে। এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে দেশে মোবাইল ব্যাংকিং গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ৫ কোটি ৭৭ লাখ ৩০ হাজার। চলতি বছরের অক্টোবর শেষে ব্যাংকগুলোর মনোনীত মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৬৮ হাজারে।