শান্তি ও সম্প্রীতির প্রেরণা জাগ্রত হোক

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:০২

ফাদার ড. লিটন হিউবার্ট গমেজ, সিএসসি

২৫ ডিসেম্বর বড়দিন, যিশুখ্রিষ্টের জন্মদিন। আজ খ্রিষ্টবিশ্বাসীদের জীবনের কেন্দ্রে থাকেন যিশুখ্রিষ্ট। বড়দিনে খ্রিষ্টবিশ্বাসীরা স্মরণ করেন—প্রথমত, যিশুখ্রিষ্ট ২ হাজার বছর পূর্বে এসেছিলেন, তার ঐতিহাসিক আগমন; দ্বিতীয়ত, তিনি মহাগৌরবে আবার আসবেন, তার ভবিষ্যত্ আগমন এবং তৃতীয়ত, বর্তমানে প্রতিনিয়ত তিনি বিশ্বাসীদের জীবনে উপস্থিত থাকেন। বড়দিনে খ্রিষ্টবিশ্বাসীদের আনন্দ অফুরন্ত। কারণ পিতা ঈশ্বর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যিশুকে মুক্তিদাতা হিসেবে মানুষরূপে পাঠিয়েছেন, যিনি অভিযুক্ত না করে পাপের অন্ধার দূর করেছেন এবং যিনি জীবিত ঈশ্বর। সুতরাং প্রতিবেশীদের ভালোবেসে শান্তিময় জীবন যাপন করে তার মহাগৌরবময় আগমনের প্রতীক্ষায় থাকতে বড়দিন আমাদের আহ্বান করে। বেথলেহেম নগরে গোশালঘরে যিশুখ্রিষ্ট মানুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছেন। তিনি প্রকৃত মানুষ এবং প্রকৃত ঈশ্বর, এটাই তার অনুসারীদের মূল বিশ্বাস।

বড়দিনে গোশালার ভিত্তি হলো পবিত্র বাইবেলের বাণী। জগতে এসে ঈশ্বরপুত্র যিশুর প্রথম বিছানা হলো গোশালার যাবপাত্র, যা ছিল গবাদি পশুদের খাবার রাখার স্থান। গোশালার যাবপাত্রে শোয়ানো যিশুখ্রিষ্টের মুগ্ধকর প্রতিচ্ছবি তার জগতে আগমনের রহস্যকে প্রকাশ করে এবং বিশ্বাসীদের জীবনের কাছাকাছি আসেন। গোশালঘরে ঐতিহ্যগত কিছু উপাদান রয়েছে, যা বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ। গোশালার চারপাশে অন্ধকারাচ্ছন্ন শান্ত নিঝুম রাত্রি প্রকাশ করে যিশুখ্রিষ্ট শান্তি ও সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে জগতে এসেছেন। মানুষ যখন দুঃখ-কষ্ট, হতাশা-নিরাশায় অন্ধকার সময় অতিবাহিত করেছে, তখনই যিশুখ্রিষ্ট আশার আলো হয়ে পথ দেখাতে জগতে আসেন। গোশালার বিধ্বস্ত প্রাচীর জগতের পতনের চিহ্নস্বরূপ, যিশুখ্রিষ্ট এসেছেন মানুষকে উদ্ধার করতে। গোশালায় একদল রাখাল বালক উপস্থিত হয়েছে। মাঠে পশুদের সঙ্গেই তারা থাকত, তাই সমাজে তারা নিম্ন পেশাজীবী এবং অপবিত্র হিসেবে পরিচিত ছিল। সমাজের অন্যান্য মানুষ যখন নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ব্যস্ত, তখন রাখালেরা প্রথমে স্বর্গদূতের কাছ থেকে মুক্তিদাতার আগমন সংবাদ পেয়ে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। এই সহজ-সরল বিনম্র রাখালেরাই আনন্দ, ভালোবাসায় আপ্লুত হয়ে মানবদেহধারী মুক্তিদাতা শিশু যিশুকে প্রণাম জানাতে ছুটে এসেছে। হতদরিদ্র মানুষ যারা সৃষ্টিকর্তার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, তাকে কাছে পেতে চায়, তাদের জন্যই পিতা ঈশ্বর মানুষ হয়ে জগতে এসেছেন। শিশু যিশু নম্রভাবে কিন্তু খুবই জোড়ালো বার্তা দিয়ে যান—মানবিক ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তুলতে গরিবদের সঙ্গে সম্পদ সহভাগিতা করা প্রয়োজন। কারণ কাউকে বাদ দিয়ে মানবিক বিশ্ব গড়া সম্ভব নয়। গোশালায় বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ উপস্থিতি হয়েছেন প্রণাম জানাতে। সবাই প্রতিদিনকার কাজের মধ্য দিয়েই নিজেদের পবিত্র  রাখতে পারে। সাধারণ কাজের মাধ্যমে ঈশ্বরের উপস্থিতি অনুভব করে অসাধারণ আনন্দ পেতে পারে।

প্রাচ্যদেশের তিন পণ্ডিত, যারা ছিলেন প্রকৃতির পূজারি, তারা বহুদূর পথ পায়ে হেঁটে শান্তিরাজ যিশুকে প্রণাম জানাতে আসেন। তাদের উপস্থিতি বলে দেয়, যিশুর শান্তির বার্তা প্রচার করা সবার দায়িত্ব। বিশ্বাসীরা দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে যিশুখ্রিষ্টের কাছে আসে, আবার ফিরে যাওয়ার পথে তারা সুসমাচার প্রচার করে। গোশালার এই দৃশ্য পরবর্তী প্রজন্মের কাছে প্রকাশ করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। গোশালার প্রতিচ্ছবি হলো আমাদের বিশ্বাসের অংশ, প্রতিচ্ছবিটি যিশুর জীবন অনুধ্যান করতে শিক্ষা দেয়। গোশালার যাবপাত্রে শায়িত শিশু যিশু জীবন ধ্যান করে বিশ্বাসীরা সৃষ্টিকর্তার ভালোবাসা অভিজ্ঞতা করে এবং বিশ্বাস করে পিতা ঈশ্বর আমদের সঙ্গে আছেন এবং আমরা তার সঙ্গে আছি। কারণ তার নাম ইমানুয়েল, যার অর্থ ‘ঈশ্বর আমাদের সঙ্গেই আছেন’।

বড়দিনে আমাদের আহ্বান করে—প্রথমত, আমাদের আনন্দ করা প্রয়োজন, কারণ পিতা ঈশ্বর সর্বদা তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন; দ্বিতীয়ত, দীক্ষাস্নানের মাধ্যমে বিশ্বাসীরা তার সন্তান হয়ে উঠেছে এবং তৃতীয়ত, বড়দিনে নিজেকে ছাড়িয়ে সবার সঙ্গে মিলিত হওয়ার চেতনা জাগ্রত হয়। বড়দিনে প্রত্যেকের অন্তরে শান্তি ও সম্প্রীতির প্রেরণা জাগ্রত হউক, শুভ বড়দিন।

n লেখক : প্রভাষক, নটর ডেম কলেজ, ঢাকা