ব্রাদার প্রদীপ প্লাসিড গমেজ, সিএসসি
যে মহান পুণ্যাত্মার জন্মবারতাকে ঘিরে সমগ্র ভূলোক-স্বর্গলোক আনন্দে মেতে উঠেছিল তিনি হলেন ঈশ্বরপুত্র যিশুখ্রিষ্ট। যিশুখ্রিষ্ট ঈশ্বরপুত্র হয়েও যে এই ধরাধামে মানব শিশুরূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তা ছিল মহান করুণাময় ঈশ্বরের এক মহাপরিকল্পনার অংশস্বরূপ। আর এই পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল প্রথম মানব-মানবী আদম ও হাওয়ার সৃষ্টির পর থেকেই। আদম-হাওয়া সৃষ্টিকর্তার অশেষ অনুকম্পাপ্রাপ্ত ছিলেন এবং তারা ছিলেন স্বর্গীয়; কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় পরে ঈশ্বরের আদেশ অমান্য করে নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ করার কারণে তারা এক মহাপাপ করে বসেন। এই পাপের কারণে তারা সমগ্র মানব জাতির জন্য তিন ধরনের ফল বয়ে এনেছিলেন। প্রথমত সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে মানুষের যে সরাসরি আত্মিক সম্পর্ক ছিল তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মর্তের দুঃখ-কষ্ট সমবেত জীবনপ্রাপ্ত হলো, দ্বিতীয়ত মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেহ থেকে আত্মা বিচ্ছিন্ন হলো এবং তৃতীয়ত চূড়ান্ত মৃত্যু—অর্থাত্ আত্মা দেহ-মন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চিরকালের জন্য আগুনে পতিত হলো। এতে করে মানুষের সঙ্গে ঈশ্বরের মৌলিক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়; কিন্তু ঈশ্বর মানুষকে শর্তহীনভাবে ভালোবাসেন। ঈশ্বর চাইলেন তাঁর সর্বোত্তম সৃষ্টি মানুষ তাদের পাপ থেকে মুক্ত হোক এবং পুনরায় তাঁর কছে ফিরে আসুক। আর তাই ঈশ্বর মানুষের মুক্তির জন্য তাঁর একমাত্র পুত্রকে পৃথিবীতে পাঠানোর জন্য প্রতিজ্ঞা করলেন।
আজ থেকে ২০১৯ বছর আগে মা মারিয়ার গর্ভে যিশুর জন্মগ্রহণের মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের সেই প্রতিজ্ঞা পূরণ হলো। সমগ্র মানবজাতির মুক্তির জন্য সামান্য এক গোয়ালঘরে জন্ম নিলেন ঈশ্বরপুত্র যিশুখ্রিষ্ট। প্রথম মানব আদম মানুষের জন্য যে পাপভার বয়ে আনলেন তা থেকে মুক্তির জন্য ঈশ্বর মানুষের আকারে এই ধরাধামে জন্মগ্রহণ করলেন। যিশুর অপর একটি নাম হলো ইম্মানুয়েল। যার অর্থ হলো ঈশ্বর মানুষের মধ্যে। যিশু ঈশ্বর হয়েও মানুষের ঘরে জন্ম নিলেন। বাইবেলে যেমনটি বলা হয়েছে—‘ঈশ্বরের স্বরূপবিশিষ্ট থাকিতে তিনি ঈশ্বরের সহিত সমান থাকা ধরিয়া লইবার বিষয় জ্ঞান করিলেন না; কিন্তু আপনাকে শূন্য করিলেন; দাসের রূপ ধারণ করিলেন, মনুষ্যদের সাদৃশ্যে জন্মিলেন এবং আকারে-প্রকারে মনুষ্যবত্ প্রত্যক্ষ হইয়া আপনাকে অবনত করিলেন।’ (ফিলিপীয়, ২:৬-৮)। অর্থাত্ যিশু আকারে-প্রকারে মানুষ হলেন, মানুষের মতো ৩৩ বছর জীবনযাপন করলেন; কিন্তু তিনি তাঁর ঐশ্বরিক ক্ষমতা দ্বারা নিজের ঐশ্বরিক মহিমা প্রকাশ করলেন। মৃত মানুষকে জীবন দান করলেন, কুষ্ঠ রোগীকে সুস্থতা দান করলেন, দৃষ্টিহীনদের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিলেন, দাসদের মুক্ত করলেন আর পাপীদের দেখালেন মুক্তির পথ। পবিত্র বাইবেলে বলা হয়েছে— ‘যিশুখ্রিষ্টতেই আমরা মুক্তি, পাপের মোচনপ্রাপ্ত হইয়াছি। ইনিই অদৃশ্য ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি, সমুদয় সৃষ্টির প্রথমজাত। কেন না তাহাতেই সব সৃষ্টি হইয়াছে। স্বর্গে ও পৃথিবীতে, দৃশ্য কি অদৃশ্য যে কিছু আছে, সিংহাসন হউক কি প্রভূত্ব হউক, কি আধিপত্য হউক, কি কর্তৃত্ব হউক, সকলই তাহার দ্বারা ও তাহার জন্য সৃষ্টি হইয়াছে।’ (ইঞ্জিল শরিফ কলসীয় ১: ১৪-১৬)।
২৫ ডিসেম্বর যিশুখ্রিষ্টের জন্মদিন পালন করার পূর্বে খ্রিষ্টবিশ্বাসীগণ চার সপ্তাহ আগে থেকে এক ধরনের আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি নেয়। মানুষ যেমন হাজারো বছর মুক্তিদাতার প্রতীক্ষায় ছিল তেমনি খ্রিষ্টবিশ্বাসীগণ যিশুর জন্মতিথিকে ঘিরে মানুষের জীবনে যিশুকে নতুন করে ফিরে পাওয়ার প্রতীক্ষায় থাকে। তিনি এসেছিলেন বিশ্বশান্তির অগ্রদূত হয়ে। প্রচার করেছেন সৌম্য, সম্প্রীতি আর ভালোবাসার বাণী। আমরা যদি ত্যাগ স্বীকার, ধ্যান, প্রার্থনা, দান, দয়া এবং পুনর্মিলন সংস্কার গ্রহণের মধ্য দিয়ে বিশ্বশান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারি, যদি ভালোবাসাপূর্ণ মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে পারি তবে যিশুর জন্মোত্সব সার্থক হবে। যিশু যে মানবজাতির মুক্তির অভিপ্রায়ে এই ধরাধামে জন্মগ্রহণ করে নিজেকে উত্সর্গ করেছেন সেই মানবমুক্তির আনন্দে উদ্ভাসিত হোক বড়দিনের আনন্দ।
n লেখক :অধ্যক্ষ, সেন্ট গ্রেগরী হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা
