চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে জাতিসংঘের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত অভিবাসন বিষয়ক বৈশ্বিক সম্মেলনে গৃহীত দ্য গ্লোবাল কমপ্যাক্ট ফর সেইফ, অর্ডারলি অ্যান্ড অর্ডারলি মাইগ্রেশন (সংক্ষেপে জিসিএম) শীর্ষক দলিলটি ভবিষ্যতে কতখানি ফলপ্রসূ হইবে তাহা লইয়া এই মুহূর্তে একাধিক মত ব্যক্ত হইতেছে। উল্লেখ্য, চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে মরক্কোতে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে সর্বমোট ১৬০টি দেশের প্রতিনিধিরা এই দলিলটি গ্রহণ করেন।
জিসিএম দলিলে অভিবাসী ও শরণার্থীরা যে সাধারণ নাগরিকদের মতই মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা ভোগের অধিকারপ্রাপ্ত তাহা উল্লেখ করা হইয়াছে। এইক্ষেত্রে আবার জীবনমান উন্নয়নে আকাঙ্ক্ষী অভিবাসী ও প্রাণরক্ষার দায়ে আগত শরণার্থীদের মধ্যে পার্থক্যের কথাও বলা হইয়াছে। জিসিএম-মতে অভিবাসন মানবপ্রকৃতির অংশ এবং সুষ্ঠু অভিবাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়া বিশ্বায়নের এই যুগে উন্নতি, উদ্ভাবন ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনয়ন সম্ভব। তথ্যমতে, বর্তমান বিশ্বের বেশিরভাগ অভিবাসীই নিরাপদ, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও সুষ্ঠু নিয়ম-প্রণালীর অধীনে থাকিয়াই অভিবাসন গ্রহণ, বসবাস ও কাজকর্ম করিয়া থাকেন। একইসঙ্গে ইহাও সত্য যে, অভিবাসনজনিত কারণে অভিবাসী গ্রহণকারী দেশগুলিতে সরকারি, সামাজিক, এমনকি পারিবারিক পরিসরে অনেক ক্ষেত্রেই নানা ধরনের সমস্যার উদ্ভব হইতেছে। জাতিসংঘের এই দলিলটি অভিবাসনজনিত সমস্যাগুলিকে মোকাবিলা করিয়া এই প্রক্রিয়ার সুফল গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ করিয়াছে। এইক্ষেত্রে বৈধ অভিবাসন গ্রহণকে প্রাথমিক শর্ত হিসাবে গ্রহণ করা হইয়াছে। একই সঙ্গে অভিবাসী হইবার ক্ষেত্রে মরিয়া হইয়া উঠিয়া যেনতেন পথ অবলম্বনকে নিরুত্সাহিত করা হইয়াছে দলিলে। অভিবাসন প্রসঙ্গটিকে বৈশ্বিক একটি বিষয় হিসাবে বিবেচনা করা হইলেও, এই দলিলে অভিবাসন ও অভিবাসী সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে যেকোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের অনস্বীকার্যতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হইয়াছে। তবে এইক্ষেত্রে মানবাধিকার, শিশু ও নারীদের সুরক্ষা ও আইনের শাসনের মতো প্রসঙ্গগুলিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করা হইয়াছে।
জিসিএম দলিলের গুরুত্ব অনস্বীকার্য হইলেও, গোটা তিনেক কারণে ইহার ভবিষ্যত্ লইয়া প্রশ্ন থাকিতেছে। প্রথমত, দলিল গ্রহণকারী দেশগুলির ক্ষেত্রেও দলিলটি মান্য করা বাধ্যতামূলক নহে, বরং ঐচ্ছিক। দ্বিতীয়ত, কোনো দেশ অভিবাসীদের অধিকারগুলি অমান্য করিলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের করণীয় প্রসঙ্গে দলিলে কোনো কিছুই উল্লেখ করা হয় নাই। তৃতীয়ত, প্রধান পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র এই দলিলটি বর্জন করিবার কারণে স্বভাবতই অভিবাসী-অভিবাসন প্রসঙ্গে বৈশ্বিক একটি উদ্যোগ গ্রহণের সম্ভাবনা অনেকটাই কমিয়া যাইতেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনুসরণে অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, সুইজারল্যান্ড, হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া, ইসরায়েল, চেক রিপাবলিক, স্লোভাকিয়ার মতো অভিবাসী ও শরণার্থী গ্রহণকারী দেশগুলি এই দলিলটি বর্জন করিয়াছে। উগ্র ডানপন্থিরা জার্মানিকেও এই দলিল গ্রহণ হইতে বিরত রাখিতে ব্যাপক চেষ্টা-চরিত্র করিয়াছে। তবে বাস্তব পরিণতি যাহাই হউক না কেন, অভিবাসী-শরণার্থী প্রসঙ্গে যেকোনো সিদ্ধান্ত লইবার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের এই দলিলটি যে সামনের দিনগুলিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা হিসাবে বিবেচিত হইতে যাইতেছে তাহা লইয়া কেহই সন্দেহ প্রকাশ করিতেছেন না।
