ব্যবসা-বাণিজ্যে তথা অর্থনীতিতে বেশ সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন হচ্ছে এবং তা দৃশ্যমান। একজনের কাজ আরেকজন নিয়ে নিচ্ছে। একের ব্যবসা অন্যজন নিয়ে নিচ্ছে। ছোট ব্যবসায়ীদের কাজ বড় বড় ব্যবসায়ীরা নিয়ে নিচ্ছে। আবার হাতের কাজ চলে যাচ্ছে মেশিনে। ‘টেকনোলজি’ বদলে দিচ্ছে দিন-দুনিয়া। আচার-আচরণ, ব্যবহারও বদলে দিচ্ছে। অনেক জিনিসের নাম-পদবিও বদলে যাচ্ছে।
সবার চোখের সামনেই এসব ঘটছে। কেউ আমরা তা আমলে নিচ্ছি, কেউ নিচ্ছি না। যেমন, আজকের ঢাকা শহরের রিকশাওয়ালা। রাস্তা ভর্তি রিকশা। মনেই হয় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু কে তা বলবে? বোঝা যায় তখনই যখন ওরা বলে তাদের রোজগার এখন কম। আগে দিনে তারা যা কামাই করত এখন তা তারা পারে না। ঐদিন বলছিল সুদূর লালমনিরহাটের এক রিকশাওয়ালা। সে বাড়িতে যাবে নির্বাচনের আগে। এসেছে এক মাস আগে। এখনও তার ১৫ হাজার টাকা জমেনি। অথচ দরকার ২০ হাজার টাকা। জমি রাখবে ‘বন্ধকী’ ব্যবস্থায়। তার কথা এখন দৈনিক কামাই কম। বাজার মন্দা। তার মতে, শহরে লোক কম, যাত্রী কম। আগে দিনে ৮শ’-হাজার টাকাও রোজগার হত। কিন্তু এখন তা ৫শ’-৬শ’ টাকা। অবশ্য সব খরচের পরে। এটাই রিকশাওয়ালাদের হিসাব। মালিকের ‘জমা’, চা-নাস্তা এবং খানা-খরচা বাদেই হয় তার হিসাব। এই হিসাবে তাদের রোজগার এখন কম। এর কারণ কিন্তু চোখে দেখা কারণের চেয়ে ভিন্নতর। তার বাজার মন্দার কারণ অনেক।
তার সেবার চাহিদা হয়ত কিছুটা কম। কিন্তু এও সত্য তার কাজ কিছুটা নিয়ে গেছে রাইড শেয়ারিং-এ অর্থাত্ মোটরসাইকেল ওয়ালারা। ইদানীং শহর ভরে যাচ্ছে মোটরসাইকেলে। আগে রিকশার ‘যন্ত্রণায়’ রাস্তায় চলা যেত না। এখন মোটরসাইকেলের কারণে। তারা নিয়ম-কানুন মানে না। বেশ কিছু ক্ষেত্রে তাদের আচরণ ‘উগ্র’। তারাই রিকশাওয়ালাদের বাজার কিছুটা নিয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মোটরসাইকেলের ভাড়া কম। সময়ও লাগে কম। শুনেছি পাঁচটি কারখানায় মোটরসাইকেল এসেম্বলিং হচ্ছে। তার মানে রাস্তা ভরে যাবে মোটরসাইকেলে। রিকশাওয়ালার কাজ তাহলে কী চলে যাবে মোটরসাইকেলওয়ালাদের কাছে? ভবিষ্যত্ই তা বলবে। আরেকটির ভবিষ্যত্ও এখন অজানা। ‘সিএনজির’ জায়গা নিয়ে যাচ্ছে ‘উবার’ ইত্যাদি কোম্পানি। ‘সিএনজির’ ভাড়া সরকার নির্ধারিত। কিন্তু চালকরা তা মানে না। সরকার তাদেরকে সমবায়ের ভিত্তিতে ‘সিএনজি’ দিয়েছিল। ব্যাংকের ঐ টাকা আদায় হয়নি। তাদের ‘আচরণও’ বিশ্বাসযোগ্য নয়। যাত্রীদের হয়রানি করা তাদের প্রতিদিনের কাজ। এর বিপরীতে এখন রাস্তায় ‘উবার’ জাতীয় ট্যাক্সি। সাধারণত সস্তা। ডাকলেই পাওয়া যায়। যদিও কিছু কিছু অভিযোগ পাওয়া যায় তবু এখন পর্যন্ত তাদের সেবা উঁচুমানেরই। এর ফলে ‘সিএনজি’ওয়ালাদের কাজ কমছে। তাদের কাজ চলে যাচ্ছে ‘উবার’ ইত্যাদি ট্যাক্সিওয়ালাদের কাছে। এদের রোজগারও ভালো।
এখানে যন্ত্রের কাজ নিচ্ছে উন্নততর যন্ত্র। টেকনোলজি বনাম টেকনোলজি। দেখা যাচ্ছে ওষুধ ব্যবসাতেও ঘটছে একই ঘটনা। ‘ফার্মেসী’ ওষুধের দোকান পাড়ায় পাড়ায়। অলিতে-গলিতে এই ‘ভদ্রলোকের’ ব্যবসা গড়ে উঠেছিল এক সময়। একটু লেখাপড়া করা লোকজন কিছু পুঁজি নিয়ে ওষুধের ব্যবসা করত। এটা মুদি দোকানের চেয়ে বেশি সম্মানজনক। বিয়ের বাজারে বলা যায় যা মুদি দোকানের বেলায় হয় না। ইদানীং দেখা যাচ্ছে বড় বড় দোকানওয়ালারা সারা ঢাকা শহরে বিশাল বিশাল ওষুধের দোকান খুলছে। তারা অনেক ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ ‘ডিসকাউন্ট’ও দিচ্ছে। লোকে লাইন ধরে ওষুধ কিনছে। আবার তারা দোকানের অংশ হিসাবে ‘কসমেটিকস’ গ্রোসারি ইত্যাদি জিনিসপত্রও বিক্রি করছে। ‘ব্লাড প্রেসার’ চেক করার লোকও আছে। বিনা পয়সায়। অতএব লোক যাচ্ছে সেখানে। ওষুধও সব পাওয়া যাচ্ছে। এ ধরনের ব্যবস্থা মীনা বাজার জাতীয় দোকানগুলো আগেই করেছে। তাই ছোট ওষুধের দোকানগুলো যেমন এখন ক্ষতিগ্রস্ত তেমনি ছোট ছোট খুচরা দোকানও অনেক আগে হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত। ‘ডিপার্টমেন্টাল স্টোর’-এর ধারণা অনুযায়ী বড় বড় সব দোকান এখন পুরনো ঢাকাতেও হচ্ছে। বিশাল স্টোর। বহু পুঁজির ব্যাপার। দুই-চার লাখ টাকায় এসব ব্যবসা হয় না। কোটি কোটি টাকার মামলা। সাধারণ মধ্যবিত্ত টাকা জমিয়ে এসব ব্যবসা করতে পারবে না। তাই তারা হচ্ছে এমন ছোট দোকানদার থেকে বড় দোকানের কর্মচারী। বিশাল বিবর্তন।
অনেক মাছওয়ালা পর্যন্ত মেগা শপে এখন কর্মচারী। স্বাধীন ব্যবসা বর্জিত। প্রতিযোগিতায় টেকা যাচ্ছে না। বইয়ের ব্যবসাতেও হচ্ছে পরিবর্তন। কোম্পানি আছে যারা বাড়ি বাড়ি বই পাঠিয়ে দেয়। হুকুম দিলেই তারা বই নিয়ে হাজির হয়। যেমন শাড়িওয়ালারা হচ্ছে। ই-শপিং জাতীয় জিনিস আবির্ভূত হচ্ছে। ব্যাংকগুলো শুরু করেছে এজেন্ট ব্যাংকিং। তাদের মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে সঞ্চয় জোগাড় করছে। ব্যাংক গ্রামে গ্রামে শাখা খুলে খরচ বাড়াতে চায় না। এসব নতুন নতুন উদ্যোগে মানুষও সাড়া দিচ্ছে। ‘টেকনোলজি’র পরিবর্তন। মানুষের আয়ের ঊর্ধ্বগতি, চাহিদার পরিবর্তন, মধ্যবিত্তের উত্থান, রেমিটেন্সের টাকা, উন্নয়নের টাকা, সরকারি ব্যয় ইত্যাদি এসব পরিবর্তনে মদদ জোগাচ্ছে। কে ভেবেছিল উমাচরনের ‘দাঁড়িপাল্লা’ বাজার থেকে উঠে যাবে? এখন চীনা ওজন মাপার যন্ত্র দোকানে দোকানে। এক মেশিনে দুই কাজ। ওজন এবং মূল্য। কাজও সহজ। এসবে যে একজনের কাজ আরেকজন নিয়ে নিচ্ছে তার খবর কী কেউ আমরা রাখি। কেউ বেকার হচ্ছে, কেউ নতুনভাবে কাজ পাচ্ছে। যারা ‘নতুনকে’ গ্রহণ করছে তারা লাভবান, আর যারা ‘এ্যাডজাস্ট’ করতে পারছে না তারা পড়ে যাচ্ছে পেছনে। যেমন জেলেরা ছিটকে পড়েছে তাদের পেশা থেকে। নদী নেই, খাল নেই, বিল নেই। অতএব জেলেরা বাঁচতে পারছে না। জাল আছে কাজ নেই, নৌকা আছে নৌকা চলার জল নেই। সব মাছ চাষ চলে গেছে ধনীদের হাতে। এটা এখন বড় একটা ব্যবসা। মাছের চাষ হচ্ছে সারা দেশে। দেখা যাচ্ছে অনেক বড় বড় রাজনীতিবিদেরও ব্যবসা ‘মত্স্যচাষ’ ভাবা যায়। জেলেরা হচ্ছে বেকার, আর মাছের খামার ওয়ালারা হচ্ছে লাভবান।
গরিবের জায়গা দখল করছে ‘পুঁজি’ (ক্যাপিটেল), জেলেদের বাঁচার পথ একটাই। তাদের চাকরি করতে হবে মত্স্যচাষির কাছে। ঢাকার আশেপাশে ঝাড় জঙ্গলে অনেকেই করছে বাগানবাড়ি। অনেকেই করছে ‘পিকনিক স্পট’; বেড়াবার জায়গা আনন্দ ফুর্তির জায়গা। গরিবরা জায়গা বিক্রি করে দিচ্ছে লোভে। একবিঘা জমির দাম অনেক। লোভেলোভে বিক্রি। ‘চক্রে’ পড়ে বিক্রি। তারপর? তারপর পুঁজির কাছে মাথানত করে সেখানেই করছে চাকরি। নিজের জমিতে পরে করেছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সেখানে সে চাকরিজীবী। একের কাজ অন্যে নিয়ে নিচ্ছে। দেখা যাচ্ছে বড়দের ক্ষেত্রেও তা ঘটছে। বড়দের কাছ থেকে ব্যবসা নিয়ে যাচ্ছে বিশাল বিশাল ব্যবসায়ীরাও। চট্টগ্রামের পুরনো ব্যবসায়ীরা এখন বাজারে নেই। তাদের ব্যবসা বলা যায় ‘লাটে’ উঠেছে। শত শত খেলাপি ঋণের মামলা তাদের বিরুদ্ধে। চট্টগ্রামে আবির্ভূত হয়েছে বিশাল বিশাল ব্যবসায়ী। তারা অগাধ টাকার মালিক। একাই নিয়ন্ত্রণ করে একেক ব্যবসা। কেউ চাল, কেউ ডাল, কেউ সয়াবিন, কেউ লবণ, কেউ চিনি, কেউ পেঁয়াজের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। আবার দুইজন-তিনজন মিলেও গড়ে উঠেছে ‘চক্র’ যারা নিয়ন্ত্রণ করছে আমদানি ব্যবসা। ব্যাংক, বিমা, লিজিং ব্যবসাতেও একই প্রবণতা দেখা দিয়েছে। একজনের ব্যবসা নিয়ে যাচ্ছে আরেকজন। দুর্বলের ব্যবসা নিয়ে যাচ্ছে সবল। বড় ব্যবসায়ীর ব্যবসা নিয়ে যাচ্ছে প্রভাবশালী বিশাল ব্যবসায়ী। এখানে ‘টেকনোলজি’ হচ্ছে ক্ষমতা, রাজনৈতিক আনুকূল্য। টিকতে না পেরে অনেকেই ব্যবসা ছাড়ছেন বলে খবর। অর্থমন্ত্রী গত সোমবার বলেছেন, একজন খুবই বড় ব্যবসায়ী সরকারকে বলেছেন তার ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে নিয়ে নিতে। এসবও এখন খবর। কার ব্যবসা কে নেয়, কোন ব্যবসা কোথায় যায় বলা মুশকিল।
n লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
