চা শি ল্প
বাংলাদেশে চা উত্পাদনের ইতিহাস দেড়শত বছরেরও অধিক পুরনো। চা রপ্তানি পণ্য হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে আমাদের দেশের জনগণ চা পানের অভ্যাস এমনভাবে রপ্ত করেছে, যার দরুন অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানিযোগ্য চায়ের পরিমাণ একেবারে কমে এসেছে। এতে এটা প্রমাণিত হয় যে বাংলাদেশের জনগণের স্বাদ, ইচ্ছা, চাহিদা, আর্থিক সক্ষমতা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে
ড. মোহাম্মদ আলী
চা একটি স্বাস্থ্যকর পানীয়। সমগ্র বিশ্বে নিষ্পাপ মৃদু উদ্দীপক পানীয় হিসেবে চায়ের জনপ্রিয়তা বর্তমানে তুঙ্গে। ক্যামেলিয়া সাইনেনসিস নামক গাছের পাতা থেকে তৈরি হয় এই পানীয়। এই চা গাছের আদি উত্পত্তি চীনে। চীনেই প্রথম ঔষধি পানীয় হিসেবে চা পান করা শুরু হয় প্রায় ৩ হাজার বছর আগে। বর্তমানে সারা বিশ্বে চা সমাদৃত। প্রায় সকলের কাছেই চা এখন প্রাত্যহিক ভোজের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। চা যেমন সাধু পানীয়, তেমনি চা বাগানের বিস্তৃতময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সকলের কাছে সমান প্রিয়।
বাংলাদেশে চা উত্পাদনের ইতিহাস দেড়শত বছরেরও অধিক পুরোনো। চা রপ্তানি পণ্য হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে আমাদের দেশের জনগণ চা পানের অভ্যাস এমনভাবে রপ্ত করেছে, যার দরুন অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানিযোগ্য চায়ের পরিমাণ একেবারে কমে এসেছে। এতে এটা প্রমাণিত হয় যে বাংলাদেশের জনগণের স্বাদ, ইচ্ছা, চাহিদা, আর্থিক সক্ষমতা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। চা পানের বৈশ্বিক চাহিদাও অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বৃদ্ধি পেয়েছে বাংলাদেশে চা চাষাধীন জমির পরিমাণ, মোট চা উত্পাদনের পরিমাণ; যা বাংলাদেশের চা শিল্পের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। কেননা এ অগ্রগতির কারণে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন কর্মসংস্থান, দেশজ আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, দারিদ্র্য হ্রাসকরণের মাধ্যমে উন্নয়ন হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতির। ২০১৮ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে ১৬৬টি চা বাগান রয়েছে, যার ৬১,৫৯৭ হেক্টর এলাকায় চায়ের আবাদ হচ্ছে। গত বছর (২০১৮) এ জমিতে বাত্সরিক উত্পাদন হয়েছিল ৮২.১৩৪ মিলিয়ন কেজি চা। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ভোগে ব্যবহূত হয়েছিল ৯০.৪৫ মিলিয়ন কেজি চা। কাজেই এই বাড়তি পরিমাণ চা দেশে আমদানি করতে হয়েছে। অতীতের সেই রপ্তানিমুখী পণ্য আজ আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রপ্তানিতে যাতে বাংলাদেশ চা শিল্প ভূমিকা রাখতে পারে, সে জন্য বর্তমান সরকার চায়ের উত্পাদন ও গুণগত মান বৃদ্ধিতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। উত্তরাঞ্চলসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র পর্যায়ে চা চাষের সম্প্রসারণ এই উদ্যোগগুলোর অন্যতম। বর্তমানে ক্ষুদ্র পর্যায়ের চা চাষ বেকার ও স্বল্প আয়ের জনগণের কাছে আয় বর্ধনমূলক বিকল্প ক্ষেত্র হিসেবে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হচ্ছে, যা গ্রামীণ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সফলভাবে ভূমিকা রাখছে। গত বছর থেকে ৮.৫ মিলিয়ন কেজি চা জাতীয় উত্পাদনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ২০১৯ সালে এর পরিমাণ আরো বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের চা শিল্পের বর্তমান প্রেক্ষাপট অতীতে এতটা উজ্জ্বল ছিল না। এ উপমহাদেশে সূচনার পর অনেক বন্ধুর পথ অতিক্রম করে চা শিল্প আজ দেশের একটি উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ১৯৫৭-৫৮ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চা বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকার সময়টি ছিল বাংলাদেশ চা শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি বাংলাদেশ চা বোর্ড, তথা বাংলাদেশ চা শিল্পের জন্য ছিল অত্যন্ত গর্বের বিষয়। সে সময় তার কিছু বলিষ্ঠ পদক্ষেপ বাংলাদেশের চা শিল্পের উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ করে। তিনি চা শিল্পের উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এ সময় সরকার চা শিল্পের উন্নয়নে ১৯৭২-৭৪ সাল পর্যন্ত চা উত্পাদনকারীদের নগদ ভর্তুকি প্রদান, ভর্তুকি মূল্যে সার বিতরণ, চা বাগান মালিকদের ১০০ বিঘা পর্যন্ত জমির মালিকানার অনুমতি প্রদান করে এবং ভারত থেকে ঋণ এনে চা ফ্যাক্টরিগুলোর জন্য যন্ত্রপাতি আমদানি ও পুনর্নির্মাণে ব্যয়সহ নানা গঠনমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করে। বিকল্প রপ্তানি বাজার অনুসন্ধানেও প্রয়োজনীয় সহায়তা সরকারিভাবে দেওয়া হয়। চা শিল্প ও চা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের কাজ তখন থেকেই শুরু হয়। চা শিল্পের উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু গবেষণাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তারই হাত ধরেই পাকিস্তান টি রিসার্চ স্টেশন (পিটিআরএস) নামে একটি চা গবেষণা প্রতিষ্ঠান সে সময় প্রতিষ্ঠিত হয়, যা বর্তমানে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) নামে প্রসিদ্ধ। বঙ্গবন্ধুর সরাসরি হস্তক্ষেপ ও তত্পরতায় প্রতিষ্ঠানটির নির্মাণ কাজ দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়। চা শিল্পের উন্নয়নে গবেষণা কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা, লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা, নতুন যন্ত্রপাতি ক্রয়, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বঙ্গবন্ধুই তত্কালীন চা গবেষণা কেন্দ্রে একজন বাঙালি গবেষক যেন প্রধান হতে পারেন, সে লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. কে. এ. হাসানকে নিয়ে আসেন। পরবর্তীকালে তিনিই পাকিস্তানি পরিচালক ড. এফ. এইচ. আব্বাসীর স্থলাভিষিক্ত হন। বর্তমানে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট বিজ্ঞানভিত্তিক কলাকৌশল সম্প্রসারণের মাধ্যমে চা শিল্পের উন্নয়নে সার্বক্ষণিকভাবে সফল ভূমিকা রেখে চলছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের জনগণের কাছে চা একটি অত্যাবশ্যকীয় পানীয় হয়ে উঠেছে। এ দেশের শ্রমজীবীসহ আপমর জনতার কাছে চা অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য পানীয়। এই দ্রুত গতিতে বর্ধমান জনসংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পাওয়া চা পানের চাহিদা বাংলাদেশের চা শিল্পের জন্য একটি বিশাল অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে। সম্ভাবনাময় এই ক্ষেত্র চা শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের ভবিষ্যত্ সুনিশ্চিত করবে এবং কর্মক্ষেত্রের সকলের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিরাট ভূমিকা রাখবে। বর্তমানে বিশ্বের অন্যান্য দেশের চা-পিপাসুদের মতো বাংলাদেশের ভোক্তারাও চায়ের বৈচিত্র্যায়ণে আকৃষ্ট হচ্ছে। কাজেই দেশি-বিদেশি ভোক্তাদের কাছে আমাদের চাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য চায়ের উত্পাদন বাড়ানোর পাশাপাশি গুণে মানে উন্নতকরণ ও বৈচিত্র্যায়ন সংযোজন করা প্রয়োজন। প্রতিযোগিতাময় বৈশ্বিক বাজার আর আধুনিক প্রজন্মের এই চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ চা শিল্প এগিয়েও যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে কালো চায়ের পাশাপাশি সবুজ চা ও অন্যান্য ভ্যালু অ্যাডেড চা তৈরি হচ্ছে। চায়ের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের আকর্ষণ ও বহির্বিশ্বে এর রপ্তানিকরণ, বাংলাদেশ চা শিল্পকে একটি সোনালি ভবিষ্যত্ উপহার দেবে বলে আশা করা যায়।
লেখক :পরিচালক, বিটিআরআই
