ই - ক মা র্স
বাংলাদেশে ই-কমার্স খাতে এখন সব মিলিয়ে বছরে ১ হাজার কোটি টাকার মতো লেনদেন হয়। এটা আগামী ৩-৪ বছরে ১০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা সম্ভব। এজন্য ইন্টারনেট ও ডেলিভারি সিস্টেমের সমস্যা সমাধান করতে হবে। এখন যে মাত্র ১৫ লাখের মতো অনলাইন ক্রেতা আছে, সেটি এক থেকে দেড় কোটিতে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সব মিলিয়ে দেশের ই-কমার্স মার্কেটের অবস্থা এই
ফাহিম মাশরুর
বাংলাদেশে ই-কমার্স যাত্রা শুরু করেছে বেশিদিন হয়নি। সারাবিশ্বের বিভিন্ন দেশেই; বিশেষ করে এশিয়ার অনেক দেশে ই-কমার্স গত চার-পাঁচ বছরে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আমাদের দেশে ই-কমার্স যেমন কিছুটা দেরিতে শুরু হয়েছে, তেমনি এখনো আশেপাশের দেশের তুলনায় এর বিকাশ বা প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে এখনো কম। আমরা যদি ভারতের কথা চিন্তা করি, গত পাঁচ বছরে অনলাইন কেনাকাটা একশ থেকে দুশো পার্সেন্ট করে প্রতি বছর বেড়েছে (গ্রোথ হয়েছে)। ভারতে এখন মোট জনসংখ্যার ১০%-এর মতো লোক বছরে একবার হলেও অনলাইনে কিছু না কিছু কেনে। এমনকি ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও চীনেও ই-কমার্স ব্যবসা ভালো অবস্থায় আছে। চীনে ৫০%-এর মতো লোক অনলাইনে কেনাকাটা করে। ভিয়েতনাম বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশেও ২০-২৫%-এর মতো লোক অনলাইনে কেনাকাটা করে। সেই হিসেবে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। আমাদের একটা হিসেবে বাংলাদেশে এখনো মোট জনসংখ্যার ১%-এর কম লোক অনলাইনে কেনাকাটা করে। অনলাইন কেনাকাটা এখনো অনেকটা শহরকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। ই-কমার্সের ভবিষ্যতের জন্য এটা একটা বড়ো সীমাবদ্ধতা।
যে সকল কারণে আমরা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মতো করে এখনো এগোতে পারিনি—তার বড়ো কারণ হচ্ছে আমাদের ইন্টারনেট। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এখনো শহরকেন্দ্রিক। শহরের বাইরে যেহেতু ব্রডব্যান্ড সুবিধা নেই, সেখানে মোবাইলের মাধ্যমেই সকলে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। মোবাইলের এখনো ডাটা খরচ অনেক বেশি। ভারতের সঙ্গে তুলনা করলে এখনো তিন-চার গুণ বেশি। সেই হিসেবে গ্রামের কিংবা মফস্বলের মানুষের জন্য মোবাইলের ডাটা খরচ করে অনলাইনে কোনোকিছু কেনা অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। এই প্রতিবন্ধকতা অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতাকে নিরুত্সাহিত করে! আরেকটা বিষয় হচ্ছে লজিস্টিক সাপোর্ট বা পণ্য পরিবহনের সমস্যা। গত কয়েক বছরে ঢাকা বা চট্টগ্রাম শহরে দুই-তিন দিনের মধ্যে পণ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের বেশিরভাগ জায়গাতেই এখনো পণ্য পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে। সাত-আট দিন এমনকি কোনো জায়গায় পণ্য পাঠাতে ১০ দিনও লেগে যাচ্ছে। লজিস্টিক বা ডেলিভারি সিস্টেমটা এখনো তৈরি হয়নি। আবার পণ্য পরিবহনের খরচও আছে। যেমন ২০০ টাকার একটা জিনিস ঢাকার বাইরে পাঠাতে একশ-দেড়শ টাকা লেগে যায়। যিনি ক্রেতা, তিনি তো দেখবেন পণ্যের জন্য সব মিলিয়ে কত টাকা দিচ্ছেন। তিনি তো শুধু পণ্যের দাম দেখবেন না, ডেলিভারি খরচসহ কত টাকা দিচ্ছেন এটাই দেখবেন। এজন্য ঢাকায় যেরকম লোকজন অনলাইনে পণ্যের অর্ডার দেন, ঢাকার বাইরে তুলনামূলকভাবে অর্ডার কম হয়। কারণ ঢাকায় ডেলিভারি খরচ কম। আর পণ্য অনেক দ্রুত হাতে পায়। ঢাকার বাইরে সে হিসেবে তার দাম বেড়ে যাচ্ছে, পেতেও দেরি হচ্ছে। এই দুটো সমস্যা; ইন্টারনেটের খরচ ও গতি এবং ডেলিভারির ব্যাপারটা ভালো হলে বাংলাদেশও ভারত, ইন্দোনেশিয়া বা ভিয়েতনামের মতো ই-কমার্স খাতে খুব দ্রুত এগিয়ে যেতে পারবে।
বাংলাদেশে ই-কমার্স খাতে এখন সব মিলিয়ে বছরে ১ হাজার কোটি টাকার মতো লেনদেন (ট্রানজেকশন) হয়। এটা আগামী ৩-৪ বছরে ১০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা সম্ভব। এজন্য ইন্টারনেট ও ডেলিভারি সিস্টেমের সমস্যা সমাধান করতে হবে। এখন যে মাত্র ১৫ লাখের মতো অনলাইন ক্রেতা আছে, সেটি এক থেকে দেড় কোটিতে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সব মিলিয়ে দেশের ই-কমার্স মার্কেটের অবস্থা এই।
এখন দেখা যাক ই-কমার্স খাতে উদ্যোক্তাদের সমস্যা ও সম্ভবনা দিকগুলোও আমাদের তো গত কয়েক বছরে ১০-১৫ হাজার দেশিয় উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে। কেউ ওয়েব সাইটের মাধ্যমে বিক্রি করছে। কেউ ফেসবুকের মাধ্যমে বিক্রি করছে। এই উদ্যোক্তারা প্রচুর কর্মসংস্থানও তৈরি করেছে। প্রায় তিন-চার লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করেছে।
ই-কমার্সের ক্ষেত্রে বড়ো একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বিদেশি জয়েন্ট কোম্পানির দৌরাত্ম্য। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে বিদেশি কোম্পানিগুলো ই-কমার্স মার্কেট একচেটিয়াভাবে দখল করে নিচ্ছে। ভারত বা এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোতে এমনটা হয়েছে। বিদেশি কোম্পানিগুলোর অনেক বড়ো অঙ্কের বিনিয়োগ করার সক্ষমতা থাকে। তারা অনেক সময় কিছু অনৈতিক পন্থায় ব্যবসা করে মার্কেট দখলের চেষ্টা করে। যেমন কোনো পণ্যের দাম কৃত্রিমভাবে কমিয়ে দিলো। দেশীয় উদ্যোক্তারা সেক্ষেত্রে হুমকির মুখে পড়ে। আমরা ভারতেও এমনটা দেখেছি। ভারতে প্রথম দিকে স্থানীয় উদ্যোক্তারা ই-কমার্স মার্কেট তৈরি করেছে। মার্কেটটা যখন একটু বড়ো হয়েছে তখন বিদেশি কোম্পানি যেমন অ্যামাজন, ওয়ালমার্টের মতো কোম্পানিগুলো এসে অনেক স্থানীয় কোম্পানিকে তারা মার্কেট থেকে সরিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশেও আমরা এমন ঘটনা দেখেছি রাইড শেয়ারের ক্ষেত্রে। ‘পাঠাও’-এর মতো প্রতিষ্ঠান শুরু করেছিল, পরে উবার এসে মার্কেট শেয়ার নিয়ে নিয়েছে। এই জিনিসটা ই-কমার্সেও ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
আরেকটা বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশীয় ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের বেশিরভাগই নিজেরা পণ্য উত্পাদন বা বিতরণ/সরবরাহ (সাপ্লাই-চেইন) ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। এর মাধ্যমে অনেক ধরনের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। কিন্তু বিদেশি কোম্পানিগুলো; যেমন ‘আলীবাবা’, 'অ্যামাজন', ‘আলী-এক্সপ্রেস’ বা এ ধরনের কোম্পানি যখন আসে—তখন দেখা যাবে তারা বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করে এনে সরাসরি ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেয়। এর ফলে যারা দেশীয় পণ্য উত্পাদনকারী আছে এবং যারা এগুলোর সাপ্লাই চেইনে আছে (এর মধ্যে অনেক পাইকারি বা খুচরা বিক্রেতাও আছে) তাদের অবস্থান বিপন্ন হবে। ভারত দেরিতে হলেও এ ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে এবং বিদেশি কোম্পানির ব্যাপারে বেশকিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ভারতে বিদেশি কোম্পানিগুলো সরাসরি বিদেশ থেকে পণ্য এনে বিক্রি করতে পারে না। আগে ভারতীয় ছোট ছোট উদ্যোক্তারা আমদানি করবে, পরে বিদেশি বড় ই-কমার্স কোম্পানিগুলো সেসব পণ্য প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিক্রি করবে। এতে ই-কমার্সটাও বাড়ল, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের স্বার্থও রক্ষা পেল। অনেক দেশেই এরকম আছে।
বাংলাদেশ সরকার একটা ই-কমার্স নীতিমালা করেছে। এটি গত বছরই গেজেট আকারে পাশ হয়েছে। সেক্ষেত্রে একটা ভালো জিনিস আছে যে, কোনো বিদেশি কোম্পানি কখনো ৫৯%-এর বেশি শেয়ার উন করতে পারবে না। এটাকে আমরা স্বাগত জানিয়েছি। যেমন বাংলাদেশে অনেক খাতেই তা আছে যেমন ফার্মাসিউক্যািলস খাত। এমনকি তৈরি পোশাক খাতেও বিদেশি কোম্পানিগুলোর ব্যাপারে একধরনের নিয়ন্ত্রণ আছে। আমরা মনে করি যে, এই কন্ট্রোলটা ই-কমার্সেও জোরালোভাবে থাকা উচিত। অন্যথায় এটা টেলিকমের মতো অবস্থা হবে, যেখানে পুরাটাই বিদেশি নিয়ন্ত্রণে।
আমরা বিদেশি ইনভেস্টমেন্টকে স্বাগত জানাই। কিন্তু নিয়ন্ত্রণটা যেন থাকে। এজন্য ই-কমার্স নীতিমালা কার্যকর করতে হবে। সরকারের উচিত এমনভাবে নীতিমালা কার্যকর করা, যাতে একদিকে বিদেশি বিনিয়োগ আসে, অন্যদিকে দেশীয়টাও টিকে থাকে।
ই-কমার্সে ট্রাস্ট বা বিশ্বস্ততা একটা বড়ো ব্যাপার। ক্রেতা বা গ্রাহকের বিশ্বাস অর্জন করতে না পারলে ব্যবসা মার খাবে। কোনো কোনো সময় প্রতারকচক্র তথাকথিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান খুলে লোক ঠকায়। এক্ষেত্রে ক্রেতা যদি কোনো কারণে তার অর্ডার করা পণ্য বুঝে না পান বা মনে করেন তিনি প্রতারিত হয়েছেন, তার ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষের কাছে চাওয়ার সুযোগ আছে। বাংলাদেশে যারা খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবসা করতে চান দেখা যায়, ফেসবুকে একটা পেইজ খুলে পণ্য দেখিয়ে বলে আমাকে বিকাশ করে টাকা পাঠাও। এ ধরনের কোম্পানির ক্ষেত্রে দেখা যায় যে কোনো ফিজিক্যাল এক্সিসটেন্স-ই (অফিস বা ঠিকানা) নাই। কারণ ফেসবুকে পেইজ খুলতে তো কোনোকিছুর দরকার হয় না। এজন্য ক্রেতাদের সতর্ক হওয়ার দরকার আছে। যেখানে ছোট-বড়ো যেধরনের প্রতিষ্ঠানের পণ্যই কিনুক না কেন, তাদের অফিস আছে কিনা, ট্রেড লাইসেন্স আছে কিনা, অফিস আছে কিনা—এসব খোঁজ নেওয়া দরকার। অন্তত কোম্পানির নামটা যাচাই করা উচিত। কারো পরামর্শ নিয়ে বা মার্কেটে সুনাম আছে এমন কোম্পানির কাছ থেকে যেন পণ্য কিনেন। এক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও একধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। যারা ফেসবুকের মাধ্যমে প্রতারণা করছে, এই প্রতারকদের নিয়মিত শনাক্ত করতে হবে।
সবশেষে যেটা বলা যায়—অন্য যেকোনো দেশের মতো বাংলাদেশেও ই-কমার্স খাতের বিশাল সম্ভবনা আছে ও ই-কমার্সের ব্যাপক বিস্তার হলে একদিকে যেমন মানুষের কেনাকাটার ব্যাপারটা অনেক সহজ হয়ে যাবে, অন্যদিকে অনেক নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হতে হবে। এর জন্য দরকার সঠিক পরিকল্পনা, দেশব্যাপী ইন্টারনেট আর ডেলিভারি ব্যবস্থার উন্নয়ন আর দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক নীতিমালা ও তার দ্রুত বাস্তবায়নও।
লেখক: প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও চেয়ারম্যান আজকের ডিল ডট কম
সাক্ষাত্কার গ্রহণ ও অনুলিখন : সোহরাব শান্ত
