হো ম অ্যা প্লা য়ে ন্স
প্রযুক্তি, ডিজাইন, আউটলুক ও গুণগতমানের দিক থেকে ওয়ালটনের তৈরি হোম অ্যাপ্লায়েন্স আমদানিকৃত পণ্যের চেয়ে আলাদা। আমাদের দেশে আমদানিকৃত হোম অ্যাপ্লায়েন্সের বেশিরভাগই আসে চায়না থেকে। কিছু আসে ইউরোপ বা পশ্চিমা দেশগুলো থেকে। সেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, আবহাওয়া ও বিদ্যুত্ পরিস্থিতির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ক্রেতা অভ্যাস, পছন্দ, রুচি, পণ্যের ব্যবহার এবং ক্রয়সক্ষমতায়ও রয়েছে ভিন্নতা। কিন্তু, আমদানিকৃত পণ্য বাংলাদেশের বাজার ও সামগ্রিক প্রেক্ষাপটের কথা চিন্তা করে তৈরি করা হয় না
আতিকুল ইসলাম
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত গত বছরের একই সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ অর্থাত্ ১০০ শতাংশ বেশি হোম অ্যাপ্লায়েন্স বিক্রি হয়েছে ওয়ালটনের। এর মধ্যে একই সময়ে ওয়ালটন গ্যাস স্টোভ বিক্রিতে ১৩২ শতাংশ, ব্লেন্ডার বিক্রিতে ১২৮ শতাংশ, রাইস কুকার বিক্রিতে ২০৬ শতাংশ, ওয়াশিং মেশিন বিক্রিতে ৮৬ শতাংশ, ইলেকট্রিক ও মাইক্রো ওভেন বিক্রিতে ৩৫ শতাংশ এবং আয়রন বা ইস্ত্রি বিক্রিতে ৭৭ এবং জেনারেটর বিক্রিতে ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে
বাংলাদেশেই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক মানের পণ্য তৈরি করে ওয়ালটন ইতিমধ্যেই হোম অ্যাপ্লায়েন্সের স্থানীয় বাজার তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। দামে সাশ্রয়ী হওয়া ছাড়াও, ডিজাইন, কালার ও আউটলুকের ভিন্নতার কারণে এর গ্রাহকচাহিদাও বাড়ছে দিন দিন। দেশের চাহিদা মিটিয়ে ওয়ালটন হোম অ্যাপ্লায়েন্স এখন এশিয়ার বিভিন্ন দেশসহ মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় রপ্তানি হচ্ছে। ওয়ালটনের হোম অ্যাপ্লায়েন্সের স্থানীয় বাজার সৃষ্টি ও অনুষঙ্গিক নানা বিষয়ে ওয়ালটনের চিফ অপারেটিং অফিসার আতিকুল ইসলাম-এর সঙ্গে কথা বলেছেন অতনু তিয়াস
হোম অ্যাপ্লায়েন্স বাংলাদেশের বড়ো একটি শিল্প। কিন্তু এতদিন আমরা কেবল বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। এখন দেশেই হোম অ্যাপ্লায়েন্স উত্পাদন করছে ওয়ালটন। মানের দিক থেকে কি সেগুলো বিদেশি পণ্যের সমান্তরাল?
আতিকুল ইসলাম : বাংলাদেশ হোম অ্যাপ্লায়েন্সের সম্ভাবনাময় এক বিশাল বাজার। আগে এ খাতটি ছিল সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর। সেই চিত্র কিন্তু বদলে গেছে। ওয়ালটন এখন দেশেই নিজস্ব কারখানায় বিশ্বের সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি, মেশিনারিজ ও উন্নত কাঁচামালের সমন্বয়ে বিভিন্ন ধরনের হোম অ্যাপ্লায়েন্স তৈরি করছে। এর মধ্যে রয়েছে ওয়াশিং মেশিন, ওভেন, রাইস কুকার, ইন্ডাকশন কুকার, ব্লেন্ডার, গ্যাস স্টোভ ইত্যাদি। এসব পণ্যের মান অনেক উন্নত। ইলেকট্রনিক্স ও হোম অ্যাপ্লায়েন্সের আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ইলেকট্রোটেকনিক্যাল কমিশন (ইআইসি)’-এর স্ট্যান্ডার্ড শতভাগ বজায় রেখেই ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগযুক্ত হোম অ্যাপ্লায়েন্স উত্পাদন করছে ওয়ালটন।
ওয়ালটন যেসব পণ্য উত্পাদন করছে, সেগুলো কি আমদানিকৃত পণ্যের দেশি সংস্করণ?
আতিকুল ইসলাম : প্রযুক্তি, ডিজাইন, আউটলুক ও গুণগতমানের দিক থেকে ওয়ালটনের তৈরি হোম অ্যাপ্লায়েন্স আমদানিকৃত পণ্যের চেয়ে আলাদা। আমাদের দেশে আমদানিকৃত হোম অ্যাপ্লায়েন্সের বেশিরভাগই আসে চায়না থেকে। কিছু আসে ইউরোপ বা পশ্চিমা দেশগুলো থেকে। সেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, আবহাওয়া ও বিদ্যুত্ পরিস্থিতির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ক্রেতা অভ্যাস, পছন্দ, রুচি, পণ্যের ব্যবহার এবং ক্রয়সক্ষমতায়ও রয়েছে ভিন্নতা। কিন্তু, আমদানিকৃত পণ্য বাংলাদেশের বাজার ও সামগ্রিক প্রেক্ষাপটের কথা চিন্তা করে তৈরি করা হয় না। এদিকে বাংলাদেশের আবহাওয়া, বিদ্যুত্ পরিস্থিতি, ক্রেতার পছন্দ, অভ্যাস, পণ্য ব্যবহারের ধরন, ক্রয়সক্ষমতাসহ সার্বিক বিষয়গুলো মাথায় রেখেই হোম অ্যাপ্লায়েন্স উত্পাদন করছে ওয়ালটন। ফলে, স্থানীয় বাজারে আমদানিকৃত বিদেশি পণ্যের চেয়ে ওয়ালটন হোম অ্যাপ্লায়েন্সের প্রযুক্তি, ডিজাইন, কালার ও আউটলুক অনেক আলাদা। মানও অনেক উন্নত। দামেও সাশ্রয়ী।
ওয়ালটনের কি হোম অ্যাপ্লায়েন্সের জন্য নিজস্ব গবেষণা সেল আছে? উত্পাদিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে কোন কোন বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে ওয়ালটন?
আতিকুল ইসলাম : গাজীপুরের চন্দ্রায় ওয়ালটন মাইক্রো-টেক কর্পোরেশন লিমিটেডে প্রতিটি হোম অ্যাপ্লায়েন্সের জন্য রয়েছে আলাদা পণ্য গবেষণা ও উন্নয়ন (আরএনডি) বিভাগ। সেখানে কাজ করছেন অত্যন্ত দক্ষ ও প্রশিক্ষিত প্রকৌশলীরা। তারা নিয়মিত গবেষণার মাধ্যমে পণ্যের মানোন্নয়নের পাশাপাশি বিশ্বের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও বৈচিত্র্যময় ডিজাইনের হোম অ্যাপ্লায়েন্স তৈরি করছেন। আরএনডি’র পাশাপাশি ওয়ালটন হোম অ্যাপ্লায়েন্স উত্পাদন কারখানায় রয়েছে পণ্যভিত্তিক আলাদা ল্যাবরেটরি, কোয়ালিটি কন্ট্রোল এবং কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স বিভাগ।
ওয়ালটন গ্রাহকদের হাতে সাশ্রয়ী দামে সর্বোচ্চ গুণগতমানের পণ্য তুলে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেজন্য পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব দেয় ওয়ালটন। উত্পাদিত পণ্যের উচ্চ গুণগতমান নিশ্চিত করতে মান নিয়ন্ত্রণে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছি। আনুষঙ্গিক কাঁচামাল বা যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে পণ্য উত্পাদন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কাঁচামাল বা যন্ত্রাংশ উত্পাদন ও সংগ্রহ, পণ্য উত্পাদন ও এজিং লাইন—এই তিনটি ধাপে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়।
প্রথম ধাপে, হোম অ্যাপ্লায়েন্সে ব্যবহূত আনুষঙ্গিক কাঁচামাল, প্লাস্টিক ও মেটাল যন্ত্রাংশ সঠিক মানের কি না তা যাচাই-বাছাই করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে ফিনিশড পণ্য উত্পাদন শুরুর পূর্বে প্রয়োজনীয় পার্টস বা যন্ত্রাংশগুলোর মান স্ট্যান্ডার্ড অব প্রসিডিউর বা এসওপি অনুযায়ী কি না তা পুনরায় নিশ্চিত করা হয়। সর্বশেষ উত্পাদিত পণ্যটির আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ‘ইআইসি’-এর স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী নিশ্চিত করা হয়। বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি দিয়ে পণ্যের মান পরীক্ষা বা টেস্টিং করা হয়।
এই তিনটি ধাপের পাশাপাশি কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স নামে আরেকটি বিভাগ রয়েছে। বিক্রয়োত্তর সেবার সঙ্গে যা যুক্ত। ক্রেতা ওয়ালটন হোম অ্যাপ্লায়েন্স থেকে প্রতিশ্রুত মান অনুযায়ী সেবা পাচ্ছেন কি না, সে সম্পর্কে গ্রাহকের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
বাংলাদেশে হোম অ্যাপ্লায়েন্সের বাজার কতটুকু? এ শিল্প বিকাশের বড়ো জায়গা বলা যাবে একে?
আতিকুল ইসলাম : হোম অ্যাপ্লায়েন্স বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় এক বিশাল শিল্পখাত। এ খাতের বাজার ফ্রিজের চেয়েও কয়েকগুণ বড়। উদাহরণস্বরূপ বলি, একটি পরিবার বা বাসায় সাধারণত ফ্রিজ থাকে একটি। যার দাম হয়তো ৩০ থেকে ৪০ হাজার। অন্যদিকে সেই পরিবারেই রাইস কুকার, প্রেসার কুকার, আয়রন, ইলেকট্রিক কেটলি, ওভেন, ব্লেন্ডার, ওয়াশিং মেশিন, ভ্যাকুয়াম ফ্লাস্ক ও ক্লিনার, গ্যাস স্টোভসহ বিভিন্ন ধরনের হোম অ্যাপ্লায়েন্স ব্যবহূত হয়। এসব পণ্যের মূল্য লাখ টাকারও বেশি। এ থেকেই কল্পনা করুন হোম অ্যাপ্লায়েন্সের বাজার কত বড়ো।
আধুনিক ও কর্মব্যস্ত জীবনে গৃহস্থালীর প্রাত্যহিক কাজকে আরো সহজ ও আরামদায়ক করেছে হোম অ্যাপ্লায়েন্স। কাপড় ধোয়ায় সাধারণত একজন গৃহিণীকে দৈনিক প্রায় দুই ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয়। সেইসঙ্গে রয়েছে প্রচুর কায়িক শ্রম। ওয়ালটন ওয়াশিং মেশিনের সাহায্যে মাত্র আধা ঘণ্টায় এই কাপড় ধোয়া ও শুকানোর কাজটি করতে পারছেন গৃহিণী। সময় ও শ্রম দুটোই সাশ্রয় হচ্ছে। এছাড়াও দৈনন্দিন রান্নাবান্নায় একজন গৃহিণীর প্রায় ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা সময় লাগে। রাইস কুকার, প্রেসার কুকার, ফুড প্রসেসরের মতো হোম অ্যাপ্লায়েন্স রান্নাবান্নার কাজটি আরো সহজ ও আরামদায়ক করেছে। এছাড়া মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সঙ্গে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, বিদ্যুতায়ন, এলাকার পরিধি বৃদ্ধি, দেশীয় হোম অ্যাপ্লায়েন্সের সহজলভ্যতার কারণে গত কয়েক বছর ধরে স্থানীয় বাজারে হোম অ্যাপ্লায়েন্সের চাহিদা ও বিক্রি বেড়েছে ব্যাপক হারে। বিশেষ করে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সঙ্গে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, বিদ্যুতায়ন এলাকার পরিধি বৃদ্ধি, দেশীয় হোম অ্যাপ্লায়েন্সের সহজলভ্যতাও চাহিদা ও বিক্রি বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে।
সাশ্রয়ী মূল্য, উচ্চ গুণগত মান, দ্রুত বিক্রয়োত্তর সেবার নিশ্চয়তা এবং অসংখ্য বৈচিত্র্যময় ডিজাইন ও কালারের কারণে ওয়ালটন হোম অ্যাপ্লায়েন্স গ্রাহকপ্রিয়তার শীর্ষে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত গত বছরের একই সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ অর্থাত্ ১০০ শতাংশ বেশি হোম অ্যাপ্লায়েন্স বিক্রি হয়েছে ওয়ালটনের। এর মধ্যে একই সময়ে ওয়ালটন গ্যাস স্টোভ বিক্রিতে ১৩২ শতাংশ, ব্লেন্ডার বিক্রিতে ১২৮ শতাংশ, রাইস কুকার বিক্রিতে ২০৬ শতাংশ, ওয়াশিং মেশিন বিক্রিতে ৮৬ শতাংশ, ইলেকট্রিক ও মাইক্রো ওভেন বিক্রিতে ৩৫ শতাংশ এবং আয়রন বা ইস্ত্রি বিক্রিতে ৭৭ এবং জেনারেটর বিক্রিতে ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
আমাদের এখানে কি হোম অ্যাপ্লায়েন্সের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড তৈরি সম্ভব? সেক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কী কী উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে?
আতিকুল ইসলাম : অবশ্যই সম্ভব। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগযুক্ত ওয়ালটন হোম অ্যাপ্লায়েন্স এখন এশিয়ার বিভিন্ন দেশসহ মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় রপ্তানি হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় এগিয়ে থাকার জন্য দরকার সরকারের প্রয়োজনীয় নীতি ও শুল্ক সহায়তা। বিশেষ করে, হোম অ্যাপ্লায়েন্স রপ্তানির বিপরীতে সন্তোষজনক প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি এ খাতের উত্পাদন শিল্পের ব্যবহূত প্রয়োজনীয় মেশিনারিজ, যন্ত্রাংশ ও কাঁচামালের ওপর জিরো ডিউটি বা শূন্য শুল্ক করতে হবে। পাশাপাশি, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে হবে। এসব সহায়তা পেলে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই হোম অ্যাপ্লায়েন্সের আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি ব্র্যান্ডের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হবে।
