নেপাল ও ভুটানেও আমাদের বাইক যাচ্ছে

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৯:২৭

মো ট র সা ই কে ল

আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে গ্রামীণ মানুষের কাছে সহজে মোটরসাইকেল পৌঁছে দেওয়া। এ লক্ষ্যে আমরা কমদামে কম সিসির বিভিন্ন মডেলের মোটরসাইকেল তৈরি করছি। বেশি সিসির মডেলও আমরা করছি। তবে ১০০ সিসির নিচে থাকা মোটরসাইকেলগুলো তৈরিতে আমরা বেশ শক্ত অবস্থানে আছি। সম্প্রতি ২০০ সিসির মোটরসাইকেলও বানাচ্ছি। তবে এক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান সেরকম শক্তিশালী  হয়ে ওঠেনি

হাফিজুর রহমান খান, চেয়ারম্যান, রানার গ্রুপ

রানার-এর শুরুর গল্পটা জানতে চাই।

হাফিজুর রহমান খান : ২০০০ সালে রানার অটোমোবাইলস লিমিটেডের যাত্রা শুরু হয়। শুরুর দিকে আমরা আমদানি করে পণ্য বাজারজাত করতে থাকি। ২০০৬ সালে প্রথম আমরা নিজস্ব পদ্ধতিতে মোটরবাইকের পার্টস বানানো শুরু করি। প্রথমে চেসিস বানাই। পর্যায়ক্রমে অন্য পার্টসগুলোও বানাতে থাকি। ২০১০ সালে আমরা কারখানা স্থাপন করি। ২০১১ সালে সরকারের পক্ষ থেকে ম্যানুফেকচারিংয়ের অনুমোদন পাই। এরপর থেকে নিয়মিত মোটরবাইক বাজারজাত করতে থাকি।

 

সাধারণত কী ধরনের বাইক রানার তৈরি করে?

হাফিজুর রহমান খান : আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে গ্রামীণ মানুষের কাছে সহজে মোটরসাইকেল পৌঁছে দেওয়া। এ লক্ষ্যে আমরা কমদামে কম সিসির বিভিন্ন মডেলের মোটরসাইকেল তৈরি করছি। বেশি সিসির মডেলও আমরা করছি। তবে ১০০ সিসির নিচে থাকা মোটরসাইকেলগুলো তৈরিতে আমরা বেশ শক্ত অবস্থানে আছি। সম্প্রতি ২০০ সিসির মোটরসাইকেলও বানাচ্ছি। তবে এক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান সেরকম শক্তিশালী  হয়ে ওঠেনি।

 

সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের মোটরসাইকেল মার্কেটের অবস্থা এখন কেমন?

হাফিজুর রহমান খান : আগের তুলনায় এখন দেশের মোটরসাইকেল বাজার বেশ এগিয়েছে। বিগত ৫ বছরের পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, অন্তত শতকরা বিশ ভাগ মোটরসাইকেলের বাজার বেড়েছে। সারাদেশে এখন মোটরসাইকেলের গ্রাহক আছে প্রায় পাঁচ লাখেরও বেশি। এটি যথেষ্ট শক্তিশালী একটি সংখ্যা—এতে কোনো সন্দেহ নেই।

 

আমাদের দেশে ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেল অনুমোদনযোগ্য নয়। বাজারে কি এর চেয়েও বেশি সিসির মোটরসাইকেলের চাহিদা আছে?

হাফিজুর রহমান খান : তা তো অবশ্যই আছে। যেহেতু সরকারি বিধি-নিষেধ আছে তাই বেশি সিসির মোটরসাইকেল আমরা বাজারজাত করি না। তবে ৫০০ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল রপ্তানি করার অনুমোদন সরকার আমাদের দিয়েছে। ইতিমধ্যে আমরা ২০০ সিসি পর্যন্ত বানিয়েছি এবং দেশের বাইরে রপ্তানিও করছি।

 

এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন কি?

হাফিজুর রহমান খান : আমাদের বাইরের ক্রেতারা প্রশ্ন করে, যে বাইক তোমাদের দেশে চালানোর অনুমোদন নেই আমাদের কাছে ওই বাইক কেন বিক্রয় কর? আমরা সরকারকে বলেছি, আমাদের রাস্তায় আরো বেশি সিসির মোটরবাইকের অনুমোদন দেওয়ার জন্য। এতে কোনো সমস্যা হবে বলে মনে হয় না। কিন্তু সরকার সবদিক ভেবে এখনো অনুমোদন দিচ্ছে না। তবে দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

 

নেপালসহ বিভিন্ন দেশে রানারের বাইক যাচ্ছে...

হাফিজুর রহমান খান : নেপালের বাজারে আমরা মোটামুটি একটা জায়গা করে নিয়েছি। ভুটানেও আমাদের বাইক যাচ্ছে। শ্রীলংকায় যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা খুব চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। বাংলাদেশেও আমরা চ্যালেঞ্জ নিয়ে টিকে আছি। ওইসব দেশেও টিকে থাকছি। তবে এক্ষেত্রে সরকার আমাদের আরো সুযোগ-সুবিধা দিলে আমাদের জন্য সহজ হতো। আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের মতো আমদানিনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকা খুব কঠিন। এ কঠিন কাজটিই আমরা হাসিমুখে করার চেষ্টা করছি।

 

আপনি বলেছেন, গ্রামীণ মানুষ আপনাদের টার্গেট। সেক্ষেত্রে আপনারা কতটুকু সফল হয়েছেন?

হাফিজুর রহমান খান : আমরা সফল্যের চূড়ায় আছি বলে মনে করি। একশ সিসির নিচে মোটরবাইকের বাজারের আশি ভাগই আমাদের দখলে। তাছাড়া ক্রেতারাও সন্তুষ্ট। আমাদের বাইকের ব্যাপারে অভিযোগ তো নেইই, বরং কয়েকটি মডেলের বাইক এমন আছে, দশ বছরেও ইঞ্জিনের কাজ করানোর প্রয়োজন হয়নি বলে কাস্টমাররাই জানিয়েছেন।

 

এ সফলতার কারণ কী?

হাফিজুর রহমান খান : প্রথম কারণ হচ্ছে, আমাদের মোটরসাইকেলগুলোর ব্যাপারে কাস্টমারদের কোনো অভিযোগ নেই। তবে সবচেয়ে বড়ো কারণ হলো খুবই অল্প মূল্যে তাও আবার কিস্তিতে কেনার সুযোগ থাকার কারণে আমরা সহজেই বাজার ধরতে পেরেছি।

 

সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি করার কোনো পরিকল্পনা আপনাদের আছে?

হাফিজুর রহমান খান : এটা খুব চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। বড়ো ধরনের পুঁজি এবং সমর্থন ছাড়া এককভাবে এ ধরনের বিশ্বমানের ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা খুব কঠিন। তবে সরকার এ ব্যাপারে বেশ আন্তরিকতার সঙ্গেই উদ্যেগ নিয়েছিল, পরে তা খুব একটা গতি পায়নি। এক্ষেত্রে ম্যানুফেকচারিং প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বাধ্য করা দরকার। সরকারেরও আন্তরিকভাবে তদারকি করা উচিত। তাহলে হয়তো এ চ্যালেঞ্জিং ব্যাপারটি সহজ হয়ে যাবে।

 

আমাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে। সে ক্ষেত্রে অটোমোবাইলের দেশীয় ব্র্যান্ড তৈরি হওয়া দরকার—এ বিষয়ে আপনি কী বলেন?

হাফিজুর রহমান খান : দেশীয় ব্র্যান্ড তৈরি করা সহজ নয়। শুধু মাত্র রানার ছাড়া আর কেউই এত বড়ো চ্যালেঞ্জ নেওয়ার সাহস করেনি। সবাই বিদেশি ব্র্যান্ডই বিক্রি করছে। আমরা চেষ্টা করছি একটি ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করার। যেমন ইতিমধ্যে ওয়ালটন ইলেকট্রনিক্স ব্র্যান্ড দাঁড় করিয়ে ফেলেছে। আমরা চেষ্টা করছি। সাফল্যের সম্ভাবনাও দেখছি।

 

অটোমোবাইল নিয়ে আপনাদের ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা কী?

হাফিজুর রহমান খান : আমাদের সব পরিকল্পনা ক্রেতাদের ঘিরেই হয়। ক্রেতাদের চাহিদা এবং সুলভে সে চাহিদা পূরণের টার্গেট আগেও ছিল এখনো আছে, ইনশাল্লাহ ভবিষ্যতেও থাকবে। আগামীতে ই-ভেহিক্যাল অর্থাত্ ইলেক্ট্রিক যানবাহনের চাহিদা তুঙ্গে থাকবে। মোটরচালিত যানের কারণে পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে মোটরচালিত যান পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে ইউরোপেও মোটরযান না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা এখন ই-ভেহিক্যাল নিয়ে ভাবছি। ক্রেতারা যদি ই-ভেহিক্যালের প্রতি আগ্রহী হয় তাহলে সুলভে তাদের দোরগোড়ায় কীভাবে ইলেক্ট্রিক যান পৌঁছে দেওয়া যায়—এসব নিয়ে আমরা পরিকল্পনা সাজাচ্ছি।

 

ই-ভেহিক্যাল এলে তো পরিবেশের জন্য ভালোই হবে...

হাফিজুর রহমান খান : সেক্ষেত্রে মোটর ইঞ্জিনিয়াররা বলছেন, তারা পরিবেশ দূষণ হয় না এমন ইঞ্জিন বাজারে আনবেন। আবার ব্যাটারিচালিত যানেও পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি থেকে যায়। সবদিক যোগ-বিয়োগ করে ক্রেতাদের চাহিদা বিবেচনায় রেখেই আমরা পণ্য বাজারজাত করব।

 

শ্রুতলিখন : আল ফাতাহ মামুন