অলিম্পিকে পদক জেতার স্বপ্ন সবারই থাকে

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২০:১৬

রোমান সানা

শেষ ক’বছরেও সাফল্য ধরা দিচ্ছিল নিয়মিত বিরতিতেই। কিন্তু সদ্য সমাপ্ত ২০১৯ সালটা বড়ো একটা মাইল ফলকই হয়ে রইল দেশসেরা তিরন্দাজ রোমান সানার ক্যারিয়ারে। এশিয়া কাপে স্বর্ণপদক, এসএ গেমসে বাজিমাত তো ছিলই, এর আগে বিশ্বকাপ আর্চারিতে ব্রোঞ্জপদক জয় প্রথম বাংলাদেশি আর্চার হিসেবে রোমানকে এনে দিয়েছিল অলিম্পিকে সরাসরি খেলার যোগ্যতা। এমন সাফল্যের পর খ্যাতির চূড়ায় না ওঠাটাই হতো অস্বাভাবিক। তবে ২০০৮ সালে শখের বসে তির-ধনুক হাতে নেওয়ার পর থেকে এ পর্যায়ে উঠে আসার পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না সানার। দৈনিক ‘ইত্তেফাক’কে সে গল্পটাই বললেন সানা। বললেন নতুন বছরে নতুন লক্ষ্যের কথাও :

খুলনার কয়রা গ্রামে জন্ম হয়েছিল আমার। এরপর থেকে প্রাথমিক শিক্ষার প্রায় শেষ পর্যন্ত সেখানেই ছিলাম আমি। সেখানে সময়টা খুবই দুরন্ত কেটেছে। দলবল নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম। গ্রামীণ খেলাগুলো যেমন আমায় টানত, ফুটবলের মতো বিদেশি খেলার প্রতিও টানটা ছিল সমান। পড়াশোনায় মন বসত না।

সারাদিন এপাড়া-ওপাড়ায় গুলতি নিয়ে দলবেঁধে পাখি শিকার করতাম। বাবা-মায়ের ছোট সন্তান হিসেবে অন্য দুই ভাই-বোনের চেয়ে কিছুটা বাড়তি স্বাধীনতা পেয়েছি আমি, তা বলতেই হবে। অব্যর্থ নিশানার নেশা সেই থেকেই।

এরপর শহরে চলে এলাম আমরা। নতুন পরিবেশ, নতুন স্কুল। এ সময়ে দুইবার স্কুল বদলাতে হলো আমাকে। একটু কঠিনই ছিল আমার জন্য সময়টা। তবে মাধ্যমিকে পড়ার সময় হাসান স্যারের পরামর্শ পেলাম। আমার অব্যর্থ নিশানা দেখে তিনি আমাকে আর্চারিতে যোগ দিতে বললেন। হাসান স্যার বলেছিলেন, ‘কত খেলাই তো খেলিস! আর্চারির বাছাই হচ্ছে। চল সেখানে যাই।’

শুরুর দিকে এর প্রতি আমার খুব একটা আগ্রহ ছিল না। স্যার আমাদের কয়েকজনকে ফরম পূরণ করিয়ে আর্চারির হাতেখড়ির ব্যবস্থা করে দিলেন। কিছুদিন অনুশীলনও চলল। এরপর অবাক হয়ে দেখলাম, নিশানা লেগে যাচ্ছে, একদম দশে দশ! বাছাইতেও অব্যহত রইল ছন্দটা। টিকে গেলাম!

এরপর লেখাপড়া লাটে তুলে দিয়ে বুঁদ হলাম তিরন্দাজিতে। ফলস্বরূপ এসএসসি পরীক্ষায় খারাপ করলাম। বাবা-মা তো রেগেমেগে ফিরিয়েই নিয়ে গেলেন! এসএসসির পর সুন্দরবন আদর্শ কলেজ হলো নতুন ঠিকানা। এখানে এসে আবারও আর্চারিতে ফেরার ফন্দি আঁটতে লাগলাম, যোগাযোগ শুরু করলাম আর্চারির লোকজনের সঙ্গে। এবার পুরো ব্যাপারটা হচ্ছিল বাবা-মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে।

২০১২ সাল! সময়টার কথা ভুলে যাওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পা ভাঙলাম, মনটাও যেন ভেঙে চুরমার। ক্ষণে ক্ষণেই তখন মনে হতো, আমার হয়তো আর ফেরা হবে না! ঠিকঠাক দাঁড়াতেই পারতাম না শুরুতে। আটমাস ধরে চলল এ পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। এ সময়ে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ আনসার। তারা পাশে না দাঁড়ালে হয়তো...

স্রষ্টা সময়ে সময়ে সৃষ্টির পরীক্ষা নেন। উতরে গেলেই আসে বড়ো পুরস্কার, এটাও বিশ্বাস করতাম। সেটাই হয়তো হয়েছিল আমার সঙ্গে। এর পরের বছরটা থেকেই আর্চারি আমাকে দিতে থাকল দু’হাত ভরা অর্জন।

২০১৩ সালে বাংলাদেশ গেমসে একক ও দলগত সোনা জিতলাম আনসারের হয়ে। ’১৪-তে বৈশ্বিক আসরেও (এশিয়ান গ্রাঁ প্রিঁ) এলো স্বর্ণপদক। তবে ২০১৬ গোহাটি এসএ গেমসে চোটের কারণে খেলা হলো না। ভাগ্যের ওপর কিছুটা ক্ষোভ জন্মেছিল সে সময়।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামলে নিয়েছি ব্যাপারটা। পরবর্তী লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করেছি নিজেকে। তারপর তো এলো এ বছরটাই। নেদারল্যান্ডসে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে মাউরো নেসপলিকে হারানোর পর অলিম্পিকে খেলার যোগ্যতা অর্জন করলাম। এরপর এশিয়া কাপ, এসএ গেমসে জিতলাম স্বর্ণপদক।

এবারের এসএ গেমসেই প্রথমবারের মতো খেলতে গিয়েছিলাম। আগেরবার তো চোট ছিটকে দিয়েছিল, তাই এবার একটা জেদ ছিল। তারপর আমরা সবাই মিলে যা করলাম, দেখলেনই তো!

তবে ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে বৈশ্বিক আসরগুলোয় যেমন স্নায়ুচাপ কাজ করত, এখন সেটা আর হয় না। তখন বিশ্বের বাঘা বাঘা সব তিরন্দাজের বিপক্ষে খেলার উত্তেজনাতেই মূলত কিছুটা ঘাবড়ে যেতাম। সে সময় প্রতিপক্ষকে কিছুটা বেশি শ্রদ্ধা করতাম বলেও মনে হয়।

তবে ধীরে ধীরে নিজের শক্তি-সামর্থ্যের আন্দাজটা যখন পেয়েছি, সেটাও কেটে গেছে। এখন বড়ো প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হলে অন্যরকম এক আত্মবিশ্বাস খেলা করে মনে মনে। ‘সেরাটা দিতে পারলেই হবে’ এমন একটা ভাবনা কাজ করে মনে।

কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখ আমার এ বদলে যাওয়ার পেছনে অনেক বড়ো অবদান রেখেছেন। তিনি কোচ হয়ে আসার পর আমাদের দলের মানসিকতাটাই বদলে গেছে। তার সবচেয়ে দারুণ ব্যাপারটা হলো, খেলোয়াড়দের খুব ভালোভাবে পড়তে পারেন, সেটাও খুব দ্রুততার সঙ্গেই। পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও দুর্দান্ত। দারুণ অনুপ্রেরণা দিতে পারেন তিনি। ফেডারেশনের অবদানও অনস্বীকার্য। ফেডারেশন সব সময় সব ধরনের সহযোগিতাই করছে আমাদের।

এ বদলে যাওয়া মানসিকতার সুবাদেই অলিম্পিকে উত্তরণটা সম্ভব হয়েছিল। এরপর যখন দেশে ফিরলাম, আবিষ্কার করলাম, রীতিমতো তারকা হয়ে গিয়েছি! এয়ারপোর্টে জনারণ্য দেখে হকচকিয়েই গিয়েছিলাম প্রথমে। স্রষ্টাকেও ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম, আমার অধ্যবসায়ের পুরস্কার দেওয়ার কারণে।

এবার মিশন অলিম্পিক। সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছি। এবার আরো কিছু করে দেখাতে চাই। অলিম্পিকে পদক জেতার স্বপ্ন সবারই থাকে। আমিও ব্যতিক্রম নই।

সে লক্ষ্যে অনুশীলনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছি। আগে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা অনুশীলন করতাম রোজ। এখন সেটা বাড়িয়ে আট ঘণ্টায় নিয়ে গেছি। তবে আর্চারির বৈশিষ্ট্যই এমন যেখানে নিজের সেরাটা যেমন দিতে হবে, পাশে পেতে হবে ভাগ্যকেও। নির্দিষ্ট দিনের নির্দিষ্ট সময়ে ভাগ্যটাকে পাশে পেলে টোকিও থেকেও ভালো কিছু সম্ভব। আশা করি, বিশ্বাস রাখি।

 

লেখক : অ্যাথলেটর

অনুলিখন :নেয়ামত উল্লাহ