বিশ্বজিত্ গোস্বামী
আমার জন্ম নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থানায় ১৯৮১ সালে। ওখানেই বড়ো হওয়া। ছোট থেকেই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা। বাবা বিদ্যুত্ গোস্বামী ছিলেন একজন শিল্পী। মা রমা গোস্বামী গৃহিণী। দাদু মনোরঞ্জন গোস্বামী কংগ্রেসের রাজনীতি করতেন। পড়েছিলেন শান্তিনিকেতনে। মানসিকতায় ছিলেন প্রগতিশীল। উনি পরিবারের সকলকে এমনভাবে তৈরি করতেন যেখানে কেউ গান করছে, কেউ তবলা বাজাচ্ছে, কেউ নাচ করছে, আর কেউ ছবি আঁকছে। স্কুলে পড়াকালীনই ছবি আঁকার প্রতি আমার তীব্র ঝোঁক তৈরি হয়। স্কুলব্যাগে ছবি আঁকার সামগ্রী নিয়ে যেতাম স্কুলে। শিক্ষকরা অবাক হয়ে বলতেন, ‘ও পড়তে এসেছে নাকি ছবি আঁকতে এসেছে?’ পড়তাম কম। ঘুরতাম বেশি। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতাম। শুধু সহপাঠীরাই নয়, সিনিয়র ভাই, শিক্ষকরাও ছিলেন আমার বন্ধু। আমি মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং মোহনগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ২০০০ সালে চারুকলায় ভর্তি হই। চারুকলায় পড়ার জন্য আমাকে পরিকল্পনা করেই এগোতে হয়েছে। পরিবারের চাওয়া ছিল আমি বুয়েট থেকে আর্কিটেকচারে পড়ি। বুয়েটে ভর্তির প্রস্তুতি হিসেবে এক ভাইয়ের কাছে পড়তে দেওয়া হলো আমাকে। তিনি আমার ইচ্ছের কথা জেনে বললেন, ‘যেহেতু তুমি মন থেকে স্থির করেছ চারুকলায় পড়বে, তুমি ওখানেই পরীক্ষা দাও, শিল্পী হও।’ চারুকলাতে অনেক সক্রিয় ছিলাম। এরপর শান্তি নিকেতন থেকে পেইন্টিংয়ে মাস্টার্স করি। শাকিন্তনিকেতনের সঙ্গে আমাদের সংস্কৃতির মিল-অমিল দুটোই আছে। তবে আমরা অনেক রকম অ্যাকটিভিটিস করতাম। আমাদের এখানে পহেলা বৈশাখের মতো বড়ো একটা মেলা হয়। সে রকম শান্তিকেতনে হয় দোল, পৌষমেলা, নন্দনমেলা। এগুলো সংস্কৃতির একধরনের সমন্বিত রূপ। কিছু হলে ‘আমরা করব, আমি না,’ এই কনসেপ্ট থেকেই রবি ঠাকুর গড়ে তুলেছিলেন শান্তিনিকেতন। মানুষই সব, প্রকৃতি হচ্ছে সর্বময় শক্তি, ক্ষমতা। এ বিষয়গুলো ওখানে অনেক বেশি। যা অনুভব করতে হয়, যিনি এটা অনুভব করতে পারেন তিনি ওখান থেকে তার হূদয়ের খোরাক পেয়ে যান। আমাদের পরীক্ষা দিতে হয় বেশি। বেশি মার্কসের জন্য পাঠ্যসূচির মধ্যে আবদ্ধ রাখতে হয় নিজেকে। ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হতেই হবে। ওখানে বিষয়টি পড়া, দেখা, বোঝা এবং অনুভবের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। ওখানে একটা সাব-মিশনে ভালো-মন্দ যাচাই করে বিচার করা হয়।
ভালো শিল্পী হওয়ার জন্য সবার আগে দরকার একটা উন্মুক্ত পরিবেশ। জীবনবোধটাই সর্বাগ্রে। একটাই জীবন। ক্ষুদ্র এই জীবনে আমাদের সন্ধান করতে হবে সত্যিকারের আনন্দের।
আমার শিল্পী হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা পরিবার, পরিবেশ। এরপর বাবা। আমাদের এলাকার বড়ো ভাই মশিউর রহমান রানা, যিনি চারুকলায় পড়তেন। বর্তমানে অ্যানিমেশন নিয়ে মালয়েশিয়ায় কাজ করছেন। তিনি এ বিষয়ে আমার ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছেন। মনেপ্রাণে চাইতেন আমি শিল্পী হয়ে উঠি। তার অবদান কখনোই ভুলবার নয়। শিল্পীর গুণাবলির কথা যদি বলি—শিল্পীভেদে গুণাবলি কিন্তু ভিন্ন হয়। তবুও কমন কিছু কোয়ালিটি আছে যেগুলো থাকা আবশ্যক। যেমন, আবেগ। সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ না থাকলে কাজের প্রতি অ্যাটাচমেন্ট তৈরি হওয়াটা কষ্টকর। থাকতে হবে ভাবনার সততা। অর্থাত্ নিজের কাছে স্বচ্ছ হতে হবে যে, ভাবনাগুলো আমার ভেতর থেকে আসছে কি না। সুন্দরকে, নতুনকে গ্রহণের মানসিকতা। থাকতে হবে সামান্যে বিশালতা খোঁজার প্রবণতা।
আমি যেহেতু শিক্ষকও—ফলে শিল্পী ও শিক্ষক এই জায়গা দুটি অনেক সময় সংঘর্ষের সৃষ্টি করে। কাজ করার, ভাববার, সামনে এগোবার ক্ষেত্রে প্রত্যেক শিল্পীরই নিজস্ব একটা দর্শন থাকে। শিক্ষকের দর্শন আবার ভিন্ন। তখন ভাবনার বিষয়টি হচ্ছে শিক্ষার্থীরা বিষয়টি কীভাবে ভাববে, কাজ করবে। আমার কনসেপ্ট নিয়েই যে তারা কাজ করবে তা কিন্তু নয়। আস্থা রাখতে হবে ওদের দক্ষতার ওপর। গুরুত্ব দিতে হবে ওদের মোটিভেশনে। কেউ পরীক্ষার নম্বরে হয়তো পিছিয়ে, কিন্তু অন্য কোনো বিষয়ে অনেক ভালো। তার সে গুণ সঙ্গে নিয়ে তাকে এগিয়ে যাবার জন্য উত্সাহিত করতে হবে।
উন্নত সভ্যতা তখনই হয় যখন মানুষ চা খেতে খেতে শিল্প, শিক্ষা, রাজনীতি নিয়ে কথা বলে। আমাদের সেটা হয় না। আর হলেও তা গসিপের মধ্যে থেকে যায়। উন্নত চিন্তা আর সঠিক সমালোচনা রয়ে যায় দূরে। সভ্যতা টিকে আছে শিল্প, সাহিত্য আর স্থাপত্য দিয়ে। এর জন্য আমাদের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। যেহেতু কাজের জন্য বিভিন্ন দেশে যেতে হয়েছে, তাই উন্নত দেশগুলোর বর্তমান অবস্থান, জীবনবোধ, এ বিষয়ে তাদের ভাবনা নিয়ে কিছুটা হলেও জানার সুযোগ হয়েছে আমার। সেক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধতা অনেক। সেগুলোকে অন্যভাবে পূরণ করার চেষ্টা করতে হবে। থাকতে হবে প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক, উদারনৈতিক মানসিকতাসম্পন্ন। হতে হবে সত্যিকারের দেশপ্রেমিক।
‘বিন্দু বিসর্গ’র প্রসঙ্গে একটু বলি—এটা আমার প্রথম কিউরেটোরিয়াল প্রজেক্ট ‘বৃহত্ত্ব’। এটি ২০১৭ সালে অবিন্তা গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হয় ৪ মাসব্যাপী। শিল্পকলার মহাপরিচালক, এশিয়ান বিনিয়ালের ন্যাশনাল কমিটিতে যারা রয়েছেন তারা অনেকেই বৃহত্ত্ব-এ গিয়েছেন। কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে প্রশংসা করেছেন। তাদের ধারণা এটা আরো বেশি হওয়া দরকার। তারাই আমাকে এ কাজটির জন্য আমন্ত্রণ করেছেন। ‘বিন্দু বিসর্গ’র ব্যাপারটা আরেকটু খোলাসা করে বলি—বিন্দু হচ্ছে এখানকার প্রত্যেক তরুণতর শিল্পী। আর আমরা হচ্ছি বিসর্গ। বিসর্গ বর্ণমালার এমন একটি বর্ণ যা নিজে কোনো শব্দ সৃষ্টি করে না। কিন্তু শব্দ সৃষ্টিতে সহায়তা করে। আমাদের ওই জায়গা থেকে চিন্তা করতে হবে। যারা চারুকলায়, শিল্পকলায় আছেন, যারা শিক্ষক, বাবা-মা তাদের হতে হবে বিসর্গ। এই বিন্দুই একদিন পরিণত হবে সিন্ধুতে। শিল্পী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সারা বাংলাদেশ থেকে ফিল্টারিং করে ১১ জন শিল্পী নির্বাচন করি। বৃহত্ত্ব’র বেলায় প্রথমে অনলাইনে ওপেন কল করি। ৮০টির বেশি আবেদন থেকে ৩০ জনকে নির্বাচিত করে, মুখোমুখি বসে তাদের ভাবনা, ইন্সপিরিয়েশন বোঝার চেষ্টা করেছি। আমি প্রথমে ওদেরকে লামাতে প্রকৃতির কাছে নিয়ে যাই। ওদের বলেছি তোমরা প্রকৃতির অপরূপ শোভা অবলোকন করো। উপভোগ করো। ইনহেল করো। বোঝো প্রকৃতি কত সুন্দরভাবে শৃঙ্খলার সঙ্গে প্রতিনিয়ত নিঃস্বার্থভাবে আমাদের কতকিছু দিয়ে চলেছে। ফিরে এসে ওগুলোকে নিজের মতো ট্রান্সফর্ম করে শিল্পে রূপান্তর করো। এ তো গেল বিন্দু বিসর্গের ব্যাপারটা। নতুনদের নিয়ে আরো বড়ো পরিসরে কাজ করার জন্য সামনে একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার চেষ্টা করছি। গুরুজন, বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে পাওয়া উত্সাহ আমাদের আরো বেশি উদ্যমী করে তুলেছে। স্যার যোগেন চৌধুরীর মতো গুণী শিল্পী এই প্রজেক্ট দেখে আপ্লুত হয়ে বলেছেন, ‘এ রকমভাবেই আমাদের এগোনো উচিত। তুমি যদি গ্রুপ করো, আমি তোমাদের উপদেষ্টা হব।’ তারুণ্য গতির প্রতীক। রবীন্দ্রনাথকে ধার করে বলি, গতিতেই জীবন, স্থিতিতেই মরণ। এ পৃথিবীর সব বড়ো বড়ো আন্দোলন, পরিবর্তন তরুণরাই করেছে। শিল্প সৃষ্টির জন্য অভিজ্ঞতাই সব নয়, চাই স্বপ্ন- চাই উন্মাদনা, যেটা তরুণদের আছে। তাদের প্রয়োজন সামান্য সুযোগের। আমার সাধ্যের মধ্যে আমি তাদের জন্য সেই সুযোগটুকু তৈরি করে দিতে চেয়েছি। একজন শিল্পীর জীবনে বাধা আসবে, সে বাধাকে উত্তরণও করতে হবে। কিন্তু ওসব নিয়ে আমি ভাবি না।
এবারের এশিয়ানে আমার শিল্প ‘ট্রাভেলিং উইথ মাদার’ ছিল একটি ইন্টারেকটিভ ফটোগ্রাফি প্রজেক্ট। এখানে আমি রিক্সা পেইন্টিংয়ের উপাদানগুলো ব্যবহার করেছি। বাংলা বর্ণমালার একটি হূদয়গ্রাহী শব্দ হলো ‘মা’। যার সঙ্গে আমাদের বন্ধন আত্মার, নাড়ির। ইটস অ্যা সিম্বল অব হার্টস। পৃথিবীর যেখানেই যাই সঙ্গে থাকে আমার মা। এই মা হচ্ছে আমার জন্মদাত্রী মা, দেশ মা, মাতৃভাষা মা। ‘মা’ ইউনিভার্সেল। শান্তির জায়গা। এই শান্তি নিয়ে যেখানেই যাব সেই স্থানই সুন্দর হয়ে যাবে। এর কারণেই শিল্পের নামটা হচ্ছে ‘মাকে নিয়ে ভ্রমণ’। সেই ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতেই বর্তমানে আমি মা, মাটি, মানুষ, স্বদেশ, ভাষা, প্রকৃতি এই ৬টি উপাদান নিয়ে কাজ করছি। যা পেইন্টিং, ভাস্কর্য, ফটোগ্রাফি, ভিডিও ইনস্টলেশনের মধ্য দিয়ে উঠে আসবে। কারণ এগুলো ইউনিভার্সেল।
লেখক: শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চারুকলা অনুষদ।
শ্রুতিলিখন: পপি দেবী থাপা
