অণুগল্প

সম্পর্ক

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:০৬

 

একটি নীল রঙের অটোতে যাচ্ছিলাম, সচরাচর যেভাবে আমি যাই না। বাতাস আসছিল বেশ। একটু পরে একটি মেয়ে এসে বসল ঠিক আমার সামনের সিটটাতে। গুচ্ছ গুচ্ছ চুল তার কপাল জুড়ে ছিল। এমনকি কপোল অবধি তার অনেকগুলো এসে বাতাসে দোল খাচ্ছিল। নাকমুখ দেখা যাচ্ছিল না তেমন। কালো একটি ওড়নায় ঢাকা ছিল বুকের পুরোটা, বেশ পরিপাটি করেই। সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। সম্ভবত সে আমার দিকে একবার তাকাল। তারপর চুলগুলো সে গোছাতে শুরু করল। মনে হলো কানের ওপর দিয়ে সাজিয়ে রাখতে চেষ্টা করছিল। আর ওড়নাটাকে এখানে ওখানে একটু ছড়িয়ে দিয়ে আরো ভালোভাবে ঢাকার একটা প্রয়াস যেন তাকে পেয়ে বসল। এভাবে কখনো চুল, কখনো ওড়না। যতক্ষণ ছিল সে ততক্ষণ এভাবেই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত ছিল।

সময়টা সন্ধ্যা-পরবর্তী। রাস্তার আলো মাঝেমধ্যে এসে পড়ছিল। আমি সৌজন্যবশত বা অভ্যেসবশত তার দিকে তাকাচ্ছিলাম না সেভাবে। তবু আলো-আঁধারিতে যতটা নজর পড়েছে তার দিকে, তাতে মনে হলো, নিজেকে গুছিয়ে রাখার একটা মল্লযুদ্ধেই যেন সে নেমে পড়েছে। একটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিল সে? কেন? আমি তো সে অর্থে তার দিকে তাকাচ্ছিলাম না। যাতে সে লজ্জা পেতে পারে বা বিব্রত হতে পারে। আর তাকালেও তো তার দেখার কথা নয়। সবই সে নিজের মনে ভেবে নিয়েছে? একটি মেয়ে যেভাবে নেয়, বিশেষত একটি ছেলে সামনে থাকলে অজানা অচেনা। ছেলেদের নজরের কথা মনে করে বা পুরুষের চিরকালীন স্বভাবের কথা মনে রেখে। বা মনে করা বা রাখার প্রয়োজন নেই, এটাই নারীসত্তা বা স্বভাবের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া বিশেষ পরিস্থিতিতে। পুরুষের ক্ষেত্রেও তাই। নারী-পুরুষের চিরায়ত সম্পর্কের এ নান্দনিক প্রকাশ। কারো পক্ষেই ক্ষতিকর কিছু নয় এসব। এটা নর-নারীর স্বাভাবিক সম্পর্ক বা আচার-ব্যবহারে মানিয়ে যায়। সমাজ স্বরূপে মনে হয় এক ধরনের অপরূপতাও দেয় এটি। এমনটা হতে আলাদা কোনো সম্পর্কের প্রয়োজন নেই দুজনের মধ্যে। দুজনেই মনে মনে খুব দ্রুত কাছে আসতে পারে। আপন হয়ে উঠতে পারে। নতুবা কেন মেয়েটির এত ব্যস্ত হয়ে ওঠা নিজেকে নিয়ে? নিজেকে সাজিয়েগুছিয়ে রাখার জন্যে? এ নিশ্চয়ই শুধু লজ্জা নয়, বাঙালি নারীর চিরায়ত লজ্জাশীলতার সৌন্দর্যের প্রশ্নও এ নয়, সম্ভ্রমশীলতার প্রশ্ন নয়, রক্ষণশীলতার প্রশ্নও নয়, নিজেকে উপস্থাপন করার বা আকর্ষণীয় করারও প্রশ্ন। এর মধ্যে প্রচ্ছন্ন একটি কামনা বা ভালোবাসা কি জড়িত নেই? চিরায়ত কাম্যের কাছে কমনীয় হয়ে ওঠার চেষ্টা কি এ নয়? পাত্রের কাছে পানি বা পানীয়ের স্বতঃস্ফূর্ততা এ নয়? সুন্দরের কাছে সুন্দর হয়ে ওঠার চেষ্টার এক নামান্তর এ মনে হয়।

একটু পরে সে নেমে পড়ল। সম্ভবত দশ মিনিট সময়মাত্র সে আমার সামনে ছিল। হালকা চুল আমাকে ছুঁয়ে গেল। ভ্যানিটি ব্যাগটা একটুখানি স্পর্শ করে যেন বলে গেল—বাই-বাই! আমি যেন মনে মনে বলে উঠলাম—সাবধানে যেয়ো মেয়ে। উলটো দিকে নামলে কেন? হুসহাস যেভাবে গাড়ি চলছে এদিক-সেদিক থেকে!

অলংকরণ :অভিজিত্ চৌধুরী