মো. আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব
বস্তুত এ বিশ্বে জাদু বা ম্যাজিকের কথা শুনেনি, এমন লোক খুঁজে পাওয়া ভার। আর জাদু কথাটি শুনলেই মনে হয় অস্বাভাবিক কিছু বা মিরাকেল বা ভেল্কিবাজি বা বিভ্রম। আসলে অনেকেই এই বিষয়টি ভালো চোখে দেখে না। মূলত জাদু শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ম্যাজিয়া (Mageia) থেকে। ফার্সি ভাষায় এর অর্থ পূজারি। মোটামুটি শ্রেণি বিন্যাসের দিক দিয়ে জাদুর কার্যক্রম দুটি ধারায় চলমান। এর মধ্যে একটি বিনোদনমূলক ট্রেডিশনাল (Traditional) বা হোয়াইট জাদু এবং অন্যটি হলো কালো (Black) জাদু। আমরা প্রথমে সঙ্গতকারণেই বিনোদনমূলক জাদুর বিষয়টি তুলে ধরছি। আসলে এই ধরনের জাদু হলো পরিচ্ছন্ন বিনোদনমূলক মনোরম, মনোলোভা ও আকর্ষণীয় একটি শিল্প। সাধারণত আমরা মনে করি যে, এর মধ্যে হয়তো মন্ত্রতন্ত্র আছে, যার কারণে অতিপ্রাকৃতিক কিছু করা বা ঘটানো সম্ভব। আসলে এটি নীরেট ভুল ধারণা। যদি এই জাদু সম্পর্কে কিছুটা গভীরে যাই; তাহলে অনুধাবন করতে পারি যে দর্শক-শ্রোতা বাস্তবতার নিরীখে স্থূল মনোভাব নিয়ে জাদু দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকেন। অথচ জাদুকর (Magician) তার কৌশলী বুদ্ধি ও নেতৃত্বের আমেজে মোহিত করে তুলেন এবং সূক্ষ্ম ধারাবাহিকতায় আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গির আড়ালে দ্রুত কাজটি সম্পাদন করার কারণে দর্শক বুঝে ওঠার আগেই জাদুকর আর একটি ইভেন্টে চলে যান। আসলে একজন দক্ষ জাদুকরকে পাক্কা অভিনেতা হতে হয়।
স্মরণকাল থেকেই জাদুর ধারাবাহিকতা চলে আসছে। সেই গ্রিক, সুমেরীয়, মেসপটেমিয়া, মোহঞ্জেদারো-হরপ্পা, মিশরীয়, রোমান, ইত্যাদি সভ্যতায় জাদু শিল্প তত্কালীন মানুষের জীবনে একটি অবস্থান নিয়ে বিদ্যমান ছিল। তখন অবশ্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে অলৌকিকতার আদলে বিবেচনা করা হতো। যেভাবেই বলি না কেন, অন্যান্য শিল্পকলার চেয়ে দর্শক-শ্রোতা জাদুর প্রতিটি ইভেন্টের সময় উন্মুখ হয়ে থাকেন। উদহারণস্বরূপ—ধরুন, জাদুকর একটি সাদা রুমাল খালি থলের মধ্যে রেখে কলা-কৌশল ও সম্মোহনীপূর্বক ঐ রুমাল দিয়ে একটি কবুতর সৃষ্টি করে দেখালেন। এতে হাততালিও কম পড়ল না! অবশ্য এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী, ইভেন্টের স্থান এবং মঞ্চের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। যাই হোক, যখন জাদুকর বলেন, ‘এটি কিছুই নয়, কেবল কলা-কৌশল, বুদ্ধির খেলা এবং হাত সাফাই’। তখন প্রায় দর্শক-শ্রোতা এটা নিয়ে কৌতুলবশত চিন্তা-ভাবনা করতে থাকেন এবং এর রহস্য উদ্ঘাটনের জন্যে ব্রতী হন। এই রহস্যজনক ও অজানা বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা প্রকারান্তরে ব্রেণ কালচার (Brain Culture) বলে পরিগণিত হয়। আর এই ব্রেন কালচার সংশ্লিষ্ট দর্শক-শ্রোতাকে অধিকতর সুনিপুণ ও দক্ষ করে তুলে, যা তাদের বাস্তবজীবনে সিদ্ধান্ত নিতে অনেকাংশে পরোক্ষভাবে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে।
এতক্ষণ আমরা ট্রেডিশনাল তথা সাদা জাদু নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করেছি। এবার দেখা যাক, কালো জাদুটি কী এবং এর কী ধরনের কর্মকাণ্ড? মূলত কাল জাদু বলতে স্বার্থপরতার উদ্দেশ্যে অতিপ্রাকৃতিক শক্তির ব্যবহার বোঝায়। অনেকে আবার এটাকে শয়তানি জাদু বলে অভিহিত করে থাকেন। এই বিশ্বসংসারে অনেক গনক বা তথাকথিত জ্যোতিষী অথবা মায়াবিনী বা ঐন্দ্রজালিক বা ডাইনি অলৌকিকতার আলোকে অভাবনীয় ঘটনা ঘটালেও সেগুলো মোজেযা নয়, এটি কালো জাদু বলে অভিহিত।
জাদু, বিশেষ করে সাদা কিংবা কালো জাদু নিয়ে যতই লম্বা লম্বা কথা বলি না কেন, জাদু বলতে আমরা ট্রেডিশনাল সাদা জাদুকে বুঝে থাকি, যা একটি বিশেষ কলা (Special Art) হিসেবে নির্মল আনন্দ দিয়ে থাকে। সেহেতু দেশ হোক, আর বিদেশই হোক, প্রায় বড়ো বড়ো প্রদর্শনী বা করপোরেট শো বা মেলা বা ভ্যারাইটিজ অনুষ্ঠানে এই জাদু বেশ জনপ্রিয়। কেননা এটি দর্শক-শ্রোতাকে পরিচ্ছন্ন বিনোদনের সারথি ধরে মাতিয়ে রাখে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো যে, শিল্প হিসেবে জাদুকে অনেক সুধীজন ভালো চোখে দেখেন না। অনেক ক্ষেত্রে কতিপয় ব্যক্তিবর্গ পাপ (Sin) বলে মনে করে থাকেন। কিন্তু এ চিন্তাধারা মোটেই ঠিক নয়। কেননা এই জাদুর কারণে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না বরং পরিচ্ছন্ন আনন্দ পেয়ে থাকেন এবং এটি সাময়িক হলেও দুশ্চিন্তা থেকে মানুষকে মুক্ত রাখে। এ ক্ষেত্রে কিছু তথাকথিত জ্ঞানী-গুণীরা আরব্য উপন্যাসের সেই জাদুটোনার আদলে নেতিবাচক চিন্তা-ভাবনা করে থাকেন, যার আদৌ কোনো ভিত্তি নেই।
এদিকে বর্তমানে বাংলাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কতগুলো জাদুসংঘ গড়ে উঠেছে। অথচ দুঃখের বিষয় হলো যে, অনেক দেশে শিল্পকলা প্রতিষ্ঠানে জাদুকে ঘিরে পৃথক অনুষদ বিদ্যমান। কিন্তু বাংলাদেশের স্বনামধন্য শিল্পকলা একাডেমিতে জাদু শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের জন্য পৃথক অনুষদ আজও পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ কোনো টিভি চ্যানেলে অন্যান্য শিল্পের মতো জাদুশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পীদের তালিকাভুক্ত করা হয়নি। তাই সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করব যে, দেশীয় জাদুশিল্পের ওপর ভর করে আধুনিকীকরণের পথ ধরে বিকাশ লাভের মাধ্যমে মানুষের নিরানন্দ জীবনে স্বল্প সময় হলেও যাতে আনন্দ বয়ে আনতে পারে, সেটা নিশ্চিতকল্পে এ ব্যাপারে খোলা মনে যেন এগিয়ে আসে।
n লেখক :গবেষক
