ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি নুরুল হক নুর এখন আলোচনার পাদপ্রদীপে। কোটা সংস্কার আন্দোলন, ডাকসু নির্বাচন, ১০ দফা মারপিটের শিকার, বিভিন্ন ইস্যূতে সাহসী বক্তব্যসহ নানা কারনে তাকে ঘিরে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। অতীত-বর্তমানে তার রাজনৈতিক পরিচয়, উচ্চাভিলাস, গ্রামের আটপৌরে জীবন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি অবধি উঠে আসার পথ পরিক্রমা, ব্যক্তি জীবন ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে।
দীর্ঘ ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ ীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ১১ হাজার ভোটে ভিপি হিসেবে বিজয়ী হওয়ার পর থেকেই মূলত নুরুল হক নুর রাজনৈতিক অঙ্গন এবং শিক্ষাঙ্গনে আলোচনার শিরোনাম। তার প্রতি বেড়েছে আগ্রহ ও কৌতুহল। নুরুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। বর্তমানে স্নাতকোত্তর পর্বে অধ্যয়নরত। কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক তিনি। বিতর্ক প্রতিযোগিতা, অভিনয়সহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় বেশ কয়েকবার হামলার মুখে পড়েন তিনি।
নুরুল হকের জন্ম পটুয়াখালি জেলার গলাচিপা উপজেলার বৃহত্তর চর কাজল ইউনিয়নে (বর্তমান চর বিশ্বাস ইউনিয়ন) । পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে পরিবারের তৃতীয় সন্তান নূর। তিনি তার মাকে হারান ১৯৯৩ সালে। সাধারণ একটি পরিবারে জন্ম নেয়া নূরের বাবা সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মো. ইদ্রিস হাওলাদার। তিনি জানান, নূর ১৯৯৩ সালে পাঁচ/ছয় বছর বয়সে মাতৃহারা হয়েছেন। তিনি পটুয়াখালীর চর বিশ্বাস জনতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেছেন। এরপর গাজীপুরের কালিয়াকৈরে চাচাতো বোনের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করেন এবং কালিয়াকৈর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন। এইচএসসি পাশ করেন উত্তরা হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে। মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে প্রথমে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান।
নুরুল হক কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে ‘শিবির-কর্মী’ বলে অনলাইনে প্রোপাগান্ডা চালানো হয়। এমনকি ডাকসু নির্বাচনের ফল ঘোষণার রাতে নূর-এর বিজয়ের খবরে ‘শিবিরের ভিপি মানি না’ এমন স্লোগানও দিয়েছিল ছাত্রলীগ। সর্বশেষ ডাকসু ভবনে নিজের অফিসেও ছাত্রলীগের মারধরের শিকার হয়ে রক্তাক্ত হন। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সা গ্রহন করছেন।
নুরুল হক কখনো শিবিরের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন কি-না জানতে চাইলে তার পরিবার তা নাকচ করে দিয়েছে। তারা জানায়, নুর এর আগে ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় হল কমিটিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি হাজী মুহম্মদ মহসিন হল শাখা ছাত্রলীগের মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক উপ-সম্পাদক ছিলেন বলে জানা গেছে। স্কুল জীবনে তিনি ছাত্রলীগের স্কুল কমিটির দপ্তর সম্পাদক ছিলেন। নুর বর্তমানে এক কন্যা সন্তানের পিতা।
এ পর্যন্ত নুরুল হক বিভিন্ন আন্দোলনে ১০ বার হামলার শিকার হন। সর্বশেষ ২২ ডিসেম্বর ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ও জাতীয় নাগরিক নিবন্ধনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে সমাবেশে গেলে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নেতা-কর্মীরা বাধা দেয়। এক পর্যায়ে সংঘর্ষ বাধে। এসময় নুর ও তার সংগঠন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ সদস্যদের ওপর মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের কর্মীরা হামলা করে। এতে নূরসহ তার সংগঠনের একাধিক ছাত্র আহত হন। ২৪ ডিসেম্বর পুলিশ বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় মামলা দায়ের করে এবং হামলার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের মঞ্চের তত্কালীন সাধারণ সম্পাদক আল মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন আরাফাত তূর্য এবং দপ্তর সম্পাদক মেহেদী হাসান শান্তকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর বৃহস্পতিবার মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের পক্ষ থেকে নুরুর হক নুরসহ তার সংগঠনের নেতা-কর্মীদের নামে পাল্টা মামলা দেয়া হয়।
নূর প্রসঙ্গে তার বাবা ইদ্রিস হাওলাদার বলেন, রাজনীতি দুশ্চিন্তার বিষয়। নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা থাকে, নানা ধরনের ঝামেলা থাকে, জেল জুলুম হয়, অন্যায় নির্যাতনের শিকার হতে হয়। আমার ছেলে সব সাধারণ ছাত্রছাত্রীর জন্য আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে নিপীড়নের শিকারও হয়েছে। তবু আমি চাই সে এটা চালিয়ে যাক। আমার ছেলে দেশের জন্য কাজ করুক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

