সব দলকে সহিংসতা পরিহারের আহ্বান মার্কিন রাষ্ট্রদূতের

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:৫১

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলকে সহিংসতা পরিহারের আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার। গতকাল বুধবার রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি এই আহ্বান জানান।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মিলার বলেন, ‘আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আমার যে আলোচনা হয়েছে, এখানেও আমি একই বিষয় নিয়ে কথা বলেছি।’ নির্বাচনে লেভেল প্লেইং ফিল্ড বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবে বলে যুক্তরাষ্ট্র আশা করে। সহিংসতামুক্ত নির্বাচন করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের, আমরা আশা করি তারা সেই  ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ফ্রন্ট নেতাদের সঙ্গে বেলা দুইটা প্রায় দেড় ঘণ্টা কূটনীতিকরা বৈঠক করেন। বৈঠকে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান, কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, তুরস্ক, ডেনমার্ক, ফিলিপাইন, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়াসহ বেশ কয়েকটি  দেশের রাষ্ট্রদূত ও দূতাবাসের কর্মকর্তারা। ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, তাবিথ আউয়াল, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বিএনপি নেতা সাবিহ উদ্দিন আহমেদ, জেবা খান ও ড. আসাদুজ্জামান রিপন প্রমুখ।

বৈঠক শেষে বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের বলেন, সরকারের চাপেই হোক বা নির্দেশেই হোক নির্বাচন কমিশন সবকিছু দেখেশুনেও চুপ করে থাকে। বৈঠকে উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে আমরা কথা বলেছি। তবে বৈঠকে কূটনীতিকরা কী বলেছেন তা তিনি জানাননি।

কূটনীতিকদের কাছে কী ধরনের সহযোগিতা চান, এমন প্রশ্নের জবাবে নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমরা যাতে নির্বাচনে অংশ নিই, সেজন্য তারা বহু অনুরোধ করেছে। আমরা তো নির্বাচনে গেলাম। প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছিলেন সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। মামলা ও গ্রেফতার হবে না। কিন্তু তা বন্ধ হয়নি। সরকার কোনো কথাই রাখছে না। বিদেশিদের কাছে বিএনপি মায়া কান্না করে, আওয়ামী লীগের এমন অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগও বিদেশিদের নিয়ে বৈঠক করে। কান্নার কিছু নেই। যা সত্য ও বাস্তব তা সবাইকে জানতে দেওয়া উচিত। কারণ, সরকার বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারই নির্বাচন বানচাল করতে চাচ্ছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট যে ইশতেহার দিয়েছে সেটা কূটনীতিকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বলে জানান বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপন। বৈঠকের বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন করতে গিয়ে কীভাবে তারা বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন এবং প্রার্থীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে, সেসব বিষয়ে তাদের বলা হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। রিপন বলেন, ৩৫টি  দেশের কূটনীতিকরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকের বিষয়ে বিএনপি নেতা রিপন সাংবাদিকদের আরও বলেন, আজকে মূলত সেরকম আনুষ্ঠানিক বৈঠক ছিল না। আমরা এবার নির্বাচনে যাচ্ছি, তার জন্য ইশতেহার ঘোষণা করেছি, সেটা ছিল বাংলায়। আজ বিদেশি কূটনীতিকদের ইংরেজিতে আমাদের ইশতেহার দিয়েছি। ইশতেহারের মূল বিষয় আমরা কী করতে চাই, তা তাদের জানিয়েছি। এছাড়া আমরা কীভাবে বাধার মুখোমুখি হচ্ছি; হামলা, মামলা ও গ্রেফতারের শিকার হচ্ছি, তাও জানিয়েছি।

তিনি বলেন, কূটনীতিকরা নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ে খুব সিরিয়াস। আর আমাদের যে কয়েকজন নারী প্রার্থী রয়েছেন, তারা সবাই সম্প্রতি আক্রমণের শিকার হয়েছেন। এসব বিষয়ে আমরা তাদের অবহিত করেছি। বৈঠকে কূটনীতিকরা কী বলেছেন জানতে চাইলে রিপন বলেন, বিদেশি কূটনীতিকরা সাধারণত শোনেন, বুঝেন কিন্তু তারা  কোনো মন্তব্য করেন না।

বৈঠক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সাংবাদকিদের বলেন, আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছি, যদি ২০ ডিসেম্বর থেকে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়, তাহলে এখন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে সহিংসতা হচ্ছে, তা হবে না।

নির্বাচন হওয়া উচিত অংশগ্রহণমূলক অবাধ সুষ্ঠু

গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ

মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল আর. মিলার বলেছেন, নির্বাচন হওয়া উচিত অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ। আমাদের অবশ্যই সহিংসতা এড়াতে হবে। কারণ সহিংসতা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।

গতকাল বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যমচেম) আয়োজিত মাসিক মধ্যাহ্ন ভোজসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। অ্যমচেম সভাপতি মো. নুরুল ইসলাম এতে স্বাগত বক্তব্য দেন। সভায় মিলার বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের প্রশংসা করে বলেন, আমি এটা জেনে আনন্দিত যে, বাংলাদেশের একক পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। অনেক সফল বিনিয়োগের উদাহরণ রয়েছে বাংলাদেশে। যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বাড়ানো সম্ভব।

সদ্য নিয়োগ পাওয়া মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাংলাদেশে দায়িত্ব গ্রহণের এক মাস পূর্তি হয়েছে গত রবিবার। জাতীয় নির্বাচন আসন্ন হওয়ার সময়কালে দায়িত্ব পেয়ে তিনি ইতিমধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ অনেকদূর এগিয়েছে, এরপরেও অনেক বিষয়ে আরো নজর দিতে হবে যেমন, শ্রম অধিকার। কর্মপরিবেশের সুরক্ষা এবং শ্রম অধিকার নিয়ে বাংলাদেশকে আরো কাজ করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগামী তিন বছর আমি এদেশে দায়িত্ব পালন করবো। দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ বৃদ্ধিসহ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করে ‘জয় বাংলা’ বলে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন তিনি।