৪৮ বছরে কেউ খোঁজ নেয়নি ৭১-এ গুলিবিদ্ধ হুমায়ূনের

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৬:২৬

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকবাহিনীর গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছিলেন হুমায়ূন আলি। তারপর থেকে মানবেতর জীবনের ৪৮বছর পার করেছেন। আজ পর্যন্ত কেউ তার খোঁজ নেয়নি! বর্তমানে তিনি ৭৫বছর বয়সী বৃদ্ধ।

হুমায়ূনের বর্তমান বাড়ি মোবারকপুর ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের  কলাবাড়ি গ্রামে, শিবগঞ্জ সোনামসজিদ রোডের পাশে। আগে তার বাড়ি ছিল শ্যামপুর ইউনিয়নের সদাসেদপুর গ্রামে। তার পিতার নাম সহিমুদ্দিন (মৃত)।

সরজমিনে গত রবিবার সন্ধ্যায় হুমায়ূন আলির নিজ বাড়িতে গেলে পাক বাহিনীর গুলি করে হত্যা ও আহত করার লোমহর্ষক বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, 'সেদিন আশ্মিন মাসের দিকে বন্যা নামে। রবিবার সন্ধ্যায় মল্লিকপুর হাট হতে বাড়ি ফিরি। পরের দিন  ৮ অক্টোবর সোমবার শ্যামপুর ইউনিয়নের বাজিতপুর গ্রামের চৌধূরী পাড়ার স্বাধীনতার পক্ষের ও আওয়ামীলীগ সমর্থক  আলতাফ চৌধূরী, মিন্টু চৌধূরী, আব্দুল বারী চৌধূরী, ভোগুরুদ্দিন ও তার দুই জামাই ৭/৮জনকে পাকবাহিনী গুলি করে হত্যা করে। এ সংবাদ এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে এলাকার অনেকে আতংকিত হয়ে জীবন বাঁচাতে  বাড়ি থেকে পালায়। এ সময় আমার বাড়ি থেকে সামান্য দূরে বাঁশের জঙ্গলের মধ্যে লুকানোর চেষ্টা করি। এ সময় তিনজন পাক সেনা আমাদের দেখে ফেলে। তখন আমাদের প্রায় ৪০জনকে বাঁশাবাগানের মধেই গোল করে বসিয়ে গুলি করতে শুরু করে।

এ সময় ৯জন মারা যায় এবং প্রায় ২৫জন গুলিবিন্ধ হয়ে আহত হয়। আরও কয়েকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। গুলিবিদ্ধ ২৫জনের মধ্যে আমি একজন। আমার বাম হাঁটুতে গুলি লেগে বেরিয়ে যায়। আমি আহতাবস্থায় প্রথমবার ২মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলাম। কিছুদিন পরে আরও ৫ মাস হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে কিছুটা সুস্থ হলে বাড়ি ফিরে আসি। তখন থেকেই আমি পুরাপুরি অক্ষম। কোনও কাজ করতে পারি না। গরীব মানুষ কোন রকমে বেঁচে আছি। গুলিবিদ্ধ হয়ে ৪৮বছর পার করলেও কেউ কোনও খোঁজ-খবর নেয়নি। এমনকি আমার বয়স ৭৫বছর পার হয়ে গেলেও বয়স্ক ভাতার কার্ডটিও দেয়নি।মাঝে মাঝে কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করতে আসে। তাদের একইভাবে বর্ণনা দিয়েছি। কিন্তু কোনও সরকারি লোক বা কোনও মুক্তিযোদ্ধা আমার খোঁজ করেনি।'

তিনি বলেন, 'শেষ বয়সে  এসে আর কি চাইবো। আছি অত্যন্ত  কষ্টে।পরিবারের অবস্থা  খুব ভালো নয়।'

তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে আরও বলেন, 'আমার চোখের সামনে সেদিন আমার নিজের দুই ভাইসহ মোট ৯ জনকে গুলি করে হত্যা করেছে পাকবাহিনী। তারা হলো আমার ছোট ভাই ও আদিনা কলেজের ছাত্র গুমানী আলি, একইগ্রামের এমাজ উদ্দিনের ছেলে টাগু আলি, তোবজুল হোসেনের দুই  ছেলে আলতা আলি ও  মোজাফর হোসেন,  রইসুদ্দিন মন্ডলের ছেলে পোলান, মাজেদ মন্ডলের ছেলে সোহরাব আলিম, সলেমানের ছেলে সাহু, শের মোহা¤দের ছেলে বেলাল ও ঝাটু মাঝি।'

তিনি আরও বলেন, 'যারা গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছিল তাদের মধ্যে আমার ভাই এমাজ উদ্দিন, তোফাজ্জুলের ছেলে একরাম আলি, রইসুদ্দিনের ছেলে নজরুল ইসলামসহ মোট ২৫জন।'

হুমায়ূনের ব্যাপারে শিবগঞ্জ উপজলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা কাঞ্চন কুমার দাস বলেন, 'ঘটনাটি আমার জানা ছিল না। এখন জানলাম। খুব শিগগিরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবো।'

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শিমুল আখতার বলেন, 'মুক্তিযোদ্ধা না, তবু কেন গুলিবিদ্ধ হলো?' এমন প্রশ্ন রেখে তিনি সমাজ সেবা অফিসে আবেদনের পরামর্শ দেন। 

আরও পড়ুন: উল্লাপাড়ায় বাস চাপায় একজন নিহত

৪৩ চাঁপাইনবাবগঞ্জ ১শিবগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য ডা. সামিল উদ্দিন আহম্মেদ শিমুল বলেন, 'তার সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে আমি সাক্ষাৎ করবো এবং উপজেলা সমাজসেবা অফিস বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবো।'

ইত্তেফাক/নূহু