সাধারণ ছোট রুমটির চারপাশে সেলফ ভর্তি সারিসারি বোতল। সেসব বোতলজুড়ে নানা রকমের, নানা বর্ণের জিনিসপত্র। শখের বসে আমরা অনেকেই অনেক রকমের জিনিসপত্র সংগ্রহ করি বা সংগ্রহের খবর শুনি। কিন্তু কখনো কী শুনেছেন পোকামাকড় কিংবা আগাছা সংগ্রহ করছে কেউ!
আজ এমন একজনের কথা বলবো, যার সংগ্রহশালাতে রয়েছে প্রায় ১০০ জাতেরও বেশি পোকা। এগুলো যে সে পোকা নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এগুলোর অনেক প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যার মধ্যে যেমন রয়েছে উপকারী পোকা, ঠিক তেমনি আছে ক্ষতিকর পোকাও। ধানের মাজরা পোকা, লেডি বার্ড বিটল, গান্ধী পোকা, ক্যারাবিডল বিটল, ড্যামসেল ফ্রাই, বাদামি গাছ ফড়িং, পাতা মোড়ানো পোকা, সবুজ সুর লেদা পোকা, পামরি পোকা, ড্রাগন ফাই, মাকড়শা, কয়েক ধরনের প্রজাপতিসহ পোকায় আক্রান্ত বিভিন্ন গাছের পাতা, রোগে আক্রান্ত গাছ ও ফলের প্রায় ২০০ ধরনের নমুনা রয়েছে সেখানে। এছাড়াও সংগ্রহে আছে আবাদী জমির নানাবিধ আগাছা, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত ৭০ জাতের ধান। রয়েছে বিনা ও বারি উদ্ভাবিত ধানও। আছে এযাবতকালের কৃষিসংক্রান্ত সব বই, লিফলেট, কৃষি বিষয়ক সকল অনুষ্ঠানের ভিসিআর ও সিডি ভিডিও। বাদ যায়নি বিভিন্ন ধরনের সারও।
আর এ ব্যতিক্রমধর্মী সংগ্রাহক হলেন ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার দুল্লা ইউনিয়ন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সেলিম রেজা। দেশের কৃষকদের সেবা দেওয়ার জন্য যিনি একেবারে ব্যক্তিগত উদ্যোগেই গড়ে তুলছেন ব্যতিক্রমী এ সংগ্রহশালা। শুধু সংগ্রহে সীমাবদ্ধ থাকেননি, দিচ্ছেন সেবাও। সঠিক, সময়োপযোগী এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কৃষকদের সেবা দিয়ে এলাকায় এরইমধ্যে ‘কৃষক বন্ধু’ উপাধি পেয়েছেন এই কৃষি কর্মকর্তা।
এলাকার কৃষকরা পরামর্শের জন্য এলে তিনি সংগ্রহশালার পোকাগুলো দেখিয়ে ফসল বা গাছের পোকা কিংবা কী ক্ষতি হচ্ছে সে সম্পর্কে নিশ্চিত হন এবং সেই অনুযায়ী পরামর্শ দেন কৃষকদের। আর এই পুরো বিষয়টিকে তিনি ভালোবেসে নাম দিয়েছেন ‘পেস্ট ডায়াগনোস্টিক সেন্টার’।
দেশের অনেক বড় বড় কোম্পানি বা কর্মকর্তারা যা করতে পারেনি, তিনি তা করে দেখিয়েছেন সহজেই। দীর্ঘ ২৯ বছরের চাকরি জীবনে অর্জন করেছেন অনেক নামীদামি স্বীকৃতি ও পুরস্কার। দু-বার বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার, দু-বার প্রযুক্তি সম্প্রসারণে বিভাগীয় জাতীয় পুরস্কার, বিভাগীয় ইনোভেশন পুরস্কারসহ মোট ২১টি পুরস্কার লাভ করেছেন তিনি।
এমন ব্যতিক্রমী সংগ্রহের শুরুটা জানতে চাইলে সেলিম রেজা জানান, চাকরি জীবনের শুরুতেই কৃষকের কিছু সমস্যা তাকে ভাবিয়ে তোলে। দেখা যেত তারা যে রোগ বা পোকা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেটির সঠিক বর্ণনা দিতে বা দেখাতে পারতো না। সেখান থেকেই তার মনে হতে শুরু হয়, এমন যদি কোনো ব্যবস্থা থাকতো যে কৃষকরা দেখেই তার সমস্যা চিনে ফেলতে পারবে। আর তারপর ১৯৯৮ সালে থেকে তিনি প্রথম একটি আলমারি নিয়ে শুরু করেন তার সংগ্রহের সূচনা। তখন তিনি নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় কর্মরত ছিলেন। প্রথম প্রথম তাকে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। পরবর্তীতে সেগুলোর নানাবিধ সমাধানও তিনি নিজেই করেছেন।
বর্তমানে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার দুল্লা ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি রুমে রয়েছে তার এ বিশাল সংগ্রহশালাটি। ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সেলিম রেজা বলেন, ‘আমার সংগ্রহশালাটি এখন একটি ছোট রুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ, এটিকে বড় পরিসরে ময়মনসিংহ শহরে স্থানান্তরিত করতে চাই এবং এটাকে দেশের সকল কৃষকের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে চাই। তাছাড়াও আরো কিছু পরিকল্পনা আছে এটিকে ঘিরে।’
