ধর্মপালের গড় নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলায় অবস্থিত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এটি ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় খননের মাধ্যমে আবিষ্কার করে। জলঢাকার এ ধর্মপাল গড়ে ১৯৯০ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খনন কাজ শুরু করে। সেসময় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খনন কাজে উল্লেখ করে ধর্মপাল গড়ের প্রাচীরগুলো মাটির তৈরি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ আবার খনন শুরু করে। এরপর গড়ের পূর্ব বাহু, দক্ষিণ বাহু ও মধ্য বাহুতে খনন কাজ করে। বিশেষ করে গড়ের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে পরিখার বাইরে প্রাচীরে খনন করার সময় ইটের অবকাঠামোর কিছু নিদর্শনের অস্তিত্ব মেলে। এরপর পর্যায়ক্রমে এ পরীক্ষামূলক খননে পূর্ব-পশ্চিমে প্রলম্বিত একটি ইটের দেওয়াল পাওয়া যায়।
লোকমুখে এ গড়ের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, পাল বংশের রাজা ধর্মপাল এখানে বাস করতেন। এখান থেকে তিনি রাজ্য পরিচালনা করতেন। এটা ছিল তার রাজপ্রাসাদ। তারই নামানুসারে এই এলাকার নাম হয়েছে ধর্মপাল। এলাকাবাসীর ধারণা ৫০০ বা হাজার বছর আগে এই স্থাপনা নির্মিত হয়েছিল। ঐতিহাসিকভাবে এ লোককথার সত্যতা মেলা ভার। কথিত রয়েছে, গড় ধর্মপালের পূর্বদিকে একটি ছোট নদীর তীরে ধর্মপালের রাজপ্রাসাদ ছিল।
ঐতিহাসিক সত্যতা অনুযায়ী প্রাচীন বাংলা যে কয়টি ভাগে ভাগ ছিল, তারই কামরূপ অংশের একটি অংশ হলো নীলফামারী জেলা। বাংলার কামরূপ অঞ্চল কখনো পাল বংশের শাসনাধীন ছিল না। সেই সূত্রে এ ঐতিহাসিক স্থাপনা পাল রাজা ধর্মপালের কি-না তা আজও প্রশ্নই রয়ে গেছে। যদি পাল বংশের স্থাপনা হয়, তবে এ স্থাপনার বয়স হবে প্রায় হাজার বছর। কিছু কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন, পাল বংশের শেষদিকের রাজা হর্ষবর্ধণ দেবের ছেলে ধর্মপাল হয়তো এ অঞ্চল দখলে নিতে যুদ্ধবিগ্রহ করতে এসে এখানে দুর্গ গড়ে তুলেছিলেন।
অনেকের মতে, পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপাল পালের (৭৯৫ খ্রি.) মৃত্যুর পর তার পুত্র ধর্মপাল রাজ সিংহাসন আরোহণ করেন। তিনি জলঢাকা উপজেলার উত্তর পশ্চিমে প্রায় ২০ কি. মি. দূরে তার রাজধানী স্থাপন করেন। বহিঃশক্রর হাত থেকে রক্ষার জন্য মাটির প্রাচীর দ্বারা তিনি রাজধানীকে বেষ্টিত করেন। সেই থেকে এ স্থানের নাম হয় গড় ধর্মপাল।
এ স্থান থেকে প্রায় ১ মাইল পূর্বে তার রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ ও প্রায় ৩৩ বিঘা পরিমিত চন্দনপাঠের দীঘি আজও তার স্মৃতি বহন করছে। বর্তমানে এ ধ্বংসাবশেষের কোলঘেঁষে গড় ধর্মপাল নামে আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠেছে। ওই স্থাপনাটি দশম কিংবা একাদশ শতাব্দিতে তৈরি হয়েছে এ রকম জনশ্রুতি রয়েছে। এ অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এ গড়ের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ঐতিহাসিক নদী গুপ্তবাসী।
যেভাবে যাবেন
নীলফামারীর ডোমার রেল স্টেশন থেকে ৫ মাইল পূর্ব-দক্ষিণ দেওনাই নদীর পূর্বতীরে গড় ধর্মপাল নামক গ্রামে এ গড়টি অবস্থিত। জলঢাকা উপজেলা থেকেও যাওয়া যায় সহজে। যেতে হলে অটোরিকশা করে আর ১৪/১৫ কিলোমিটার দূরে গড়ের হাট নামক জায়গায় গেলেই এই ধর্মপালের গড়ের অবস্থান পাবেন। ঢাকার গাবতলী, কল্যাণপুরে দিবা ও নৈশ কোচে জলঢাকা অথবা ডোমারে নেমে ধর্মপালের গড়ে যাওয়া যায়। এছাড়া নীল সাগর আন্তঃনগর ট্রেনে ডোমার স্টেশনে নেমে বিমানে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে নেমে মাইক্রোবাস ও কারে যেতে পারেন ধর্মপালের গড়ে। যারা ইতিহাসের শেকর খোঁজেন কিংবা ঐতিহাসিক নিদর্শন পছন্দ করেন তাদের জন্য এটি একটি ভালো জায়গা।
