বিশ্ব পরিক্রমা ২০১৯

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৫০

২০১৯ অতিক্রান্ত হয়েছে আর সব বছরের মতো। তবে তুলনামূলকভাবে সংকটের ঘনঘটা লক্ষ করা গেছে এ বছর। মারাত্মক ধরনের যুদ্ধবিগ্রহ হয়নি বটে, তবে সংকটগুলো উত্তাপ ছড়িয়েছে গোটা বছর ধরে। আর এসব সংকট উত্তরণের জন্য এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সহযোগিতার জন্য বেশ ঘন ঘন সম্মেলন ও শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা তুলনামূলকভাবে অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি মনে হয়েছে। সেই সঙ্গে বছরটিকে গণ-আন্দোলনের বছর বলেও অভিহিত করা যায় বলে আমরা মনে করি। ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাব আরব বসন্তের মতো এতটা প্রবল না হলেও প্রকোপ কোনো অংশেই কম ছিল না। এ বছরের একটি নেতিবাচক দিক এরকম যে, কোনো শান্তির লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। পূর্ববর্তী যুদ্ধ ও সংকটের কোনো সরল সমাধান ঘটেনি। বছরটি আলোচিত হতে পারে লোকরঞ্জনবাদের কারণে। প্রাচ্যের দুর্বল গণতান্ত্রিক কাঠামোতে যখন লোকরঞ্জনবাদের অতিরঞ্জন দেখা যায় তখন আমরা একে স্বাভাবিক বলে মনে করি। অন্যদিকে পাশ্চাত্যের উন্নত গণতন্ত্রে যখন আমরা ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি বা কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা লক্ষ করি তখন হতাশ হতে হয়। সেদিক থেকে ২০১৯ সাল হতাশার বছর বইকি।

মার্কিন-উত্তর কোরিয়া শীর্ষ বৈঠক : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার প্রতি মহা ক্ষিপ্ত ছিলেন। অনেকবার ‘উচিত শিক্ষা’ দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন। উত্তর কোরিয়ার নেতা একই মনোভঙ্গি প্রকাশ করেছেন। তিনিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে হামলার হুমকি দিয়েছেন অনেকবার। অবশেষে কীভাবে কী হয়ে গেল! একরকম আকস্মিকভাবেই এ বছরের প্রথম দিকে শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন। এটা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন কোনো প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বের সঙ্গে প্রথম বৈঠক। বৈঠকটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিব্রতকর স্মৃতি বিজড়িত ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যবর্তী বেসামরিক এলাকায়। চার মাস পর অনুষ্ঠিত ঐ বৈঠকে ডোনাল্ড ট্রাম্প অনেকটা নাটকীয়ভাবে উত্তর কোরিয়ার মাটিতে পা রাখেন। এসব আন্তরিকতা ও উষ্ণতা সত্ত্বেও অবাক হওয়ার কাণ্ড যে সম্পর্কের অগ্রগিত ঘটেনি এবং শান্তি সেই সুদূর পরাহতই থেকেছে। দুই পক্ষের অনমনীয় মনোভাবই সংকট জিইয়ে রাখার প্রধান কারণ।

ব্রেক্সিট ও ব্রিটিশ রাজনীতি : ২০১৯ সালের সমাপ্তি ঘটলো ব্রেক্সিট ইস্যুর একটি শক্ত ও স্বচ্ছ পরিণতির মধ্য দিয়ে। ১২ ডিসেম্বর ব্রিটেনের জনগণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের পক্ষে প্রকারান্তরে সুস্পষ্ট মতামত জ্ঞাপন করে। বছরটি শুরু হয়েছিল অনিশ্চিত অবস্থায়। ২৯ মার্চ নির্ধারিত ছিল ব্রিটেনের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের সর্বশেষ তারিখ হিসেবে। তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে পার্লামেন্টে চুক্তিটি অনুমোদন করাতে ব্যর্থ হন। অবশেষে পদত্যাগে বাধ্য হন। ব্রিটেনের ট্রাম্প বলে পরিচিত বরিস জনসন কর্তৃত্ববাদী আচরণ করে দ্বিধাগ্রস্ত ব্রিটিশ জনমতকে অবশেষে সম্মত করতে সক্ষম হন। এর আগে ২৪ জুলাই তিনি ব্রিটিশ রক্ষণশীল দলের নেতৃত্বে আসীন হন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে পাশ কাটিয়ে ব্রেক্সিট কার্যকর করতে উদ্যোগী হন। এতে তিনি ব্যর্থ হন। বাধ্য হয়ে নতুন নির্বাচনের ঘোষণা দেন। গত ১২ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ব্রিটিশ জনগণ কর্তৃত্ববাদী বরিস জনসনকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করে। এর ফলে আগামী বছর ৩১ জানুয়ারির মধ্যে ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের আর কোনো বাধা থাকল না।

চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধ : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতাসীন হওয়ার পরপরই সবকিছু করায়ত্ত করার যে পরিকল্পনা নেন, চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে জয়লাভের আকাঙ্ক্ষা তার একটি। ২০১৮ সালের মার্চ মাসে তিনি টুইট করেছিলেন, ‘বাণিজ্যযুদ্ধ ভালো, জয়লাভও সহজ’। কিন্তু এতকাল ধরে এই যুদ্ধজয়ের কোনো স্পষ্ট নিদর্শন ডোনাল্ড ট্রাম্প দেখাতে পারেননি। এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন করে চীনা পণ্যদ্রব্যের ওপর শুল্ক আরোপের কথা ঘোষণা করেও বাস্তবে তা প্রয়োগ করেননি। বলে রাখা ভালো যে চীন-মার্কিন এই বাণিজ্য আলাপ-আলোচনা একটি দীর্ঘমেয়াদি বিষয় এবং আলোচনা অব্যাহত থেকেছে সব সময়। এ বছরের মে মাসে ট্রাম্প নতুন করে চীনা পণ্যদ্রব্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেন। তবে জুন মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও চীনা নেতা শি জিন পিং একমত হন যে বাণিজ্য আলোচনা জোরদার করা হবে। জি-২০ শীর্ষ বৈঠকের সময় ২ নেতা এসিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সক্ষম হন। কিন্তু শিগিগরই এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। আগস্টে তিনি চীনা পণ্যসামগ্রীর ওপর ৩০০ বিলিয়নেরও বেশি মার্কিন ডলারের শুল্ক আরোপ করেন। এরপর তিনি স্বইচ্ছায় প্রণোদিত হয়ে ডিসেম্বরের ১৫ তারিখ পর্যন্ত ঘোষিত শুল্কের পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনেন। বিগত ১১ অক্টোবর উভয় পক্ষ ‘অধ্যায়-১’ নামে মোটামুটি একটি চুক্তিতে পৌঁছায়। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষই উপনীত চুক্তিতে বিজয়ী বলে দাবি করছে।

মধ্য আমেরিকার অভিবাসী সংকট : বছর জুড়ে পৃথিবীর মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে মধ্য আমেরিকা তথা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রমুখী অভিবাসী জনস্রোত। অভিবাসী-সংকট যুক্তরাষ্ট্রের জনমনে দারুণ প্রভাব সৃষ্টিকারী একটি বিষয়। পৃথিবীর স্বর্গরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাতে চায় তামাম দুনিয়ার মানুষ। মধ্য আমেরিকার ছোটো ছোটো দরিদ্র ও দুর্বল দেশগুলো থেকে এ বছর অভিবাসীদের মিছিল ছিল উল্লেখ করার মতো। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে এ সময় অনেক মর্মস্পর্শী ও বিব্রতকর ঘটনা ঘটে। এরা সীমান্তে সহিংসতা ঘটায়। নদী-সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণ হারায়। কিন্তু মার্কিন প্রশাসন ঢালাওভাবে তাদের আশ্রয় দিতে অস্বীকার করে। ইতিমধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প ছয়টি মুসলিম দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাত্রা নিষিদ্ধ করেন।

মার্কিন-ইরান উত্তেজনা : এ বছর সবচেয়ে উত্তেজনাকর থেকেছে মার্কিন-ইরান সম্পর্ক নিয়ে। মে মাসে হরমুজ প্রণালির মুখে যখন চারটি বাণিজ্যিক জাহাজ আক্রান্ত হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্র এই আক্রমণের জন্য ইরানকে প্রত্যক্ষভাবে দায়ী করে। ৬ জুন ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা যুক্তরাষ্ট্রের একটি ড্রোনকে ভূপাতিত করে। পরবর্তীকালে ইরান একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করে। ইরান দাবি করে যে ঐ ড্রোন ইরানের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছিল। তবে উভয় পক্ষই এসব আক্রমণ-প্রতি আক্রমণে তাদের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে। জুলাই মাসের ১৮ তারিখে মার্কিন নৌবাহিনী একটি ইরানি ড্রোনকে বিধ্বস্ত করে। সেপ্টেম্বরের ১৪ তারিখে দুটি সৌদি তৈল শোধনাগারে ড্রোন আঘাত হানে। হুতি বিদ্রোহীরা এর দায় স্বীকার করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও তার পাশ্চাত্যের মিত্ররা এই হামলাসহ সব হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করে। উল্লেখ্য, সৌদি-ইরান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালির অদূরে মার্কিন ষষ্ঠ নৌবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। উপরোক্ত হামলাগুলোর প্রতিটি পর্যায়ে গোটা বিশ্ব চরম উত্তেজনায় কাটায়। মার্কিন-ইরান যুদ্ধ অত্যাসন্ন মনে করা হয়। চরম উত্তেজনা ও বাগাড়ম্বরতা সত্ত্বেও প্রত্যক্ষ যুদ্ধের ঘটনা ঘটেনি।

আমাজনে আগুন : পৃথিবীর ফুসফুস বলে পরিচিত আমাজন গভীর অরণ্যে ব্যাপক অগ্নি উত্পাতের ঘটনা ঘটে। ব্রাজিল সরকারের প্রশ্রয়ে সেদেশের কৃষক ও অন্যরা আগুন দিয়ে ক্রমশ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে আমাজন অরণ্যকে। ধারাবাহিকভাবে চলে আসা এসব অগ্নি সংযোগের ঘটনা ২০১৯ সালে প্রবল আকার ধারণ করে।

সিরীয় সংকট : ২০১৯ সাল ১১ বছর ধরে চলে আসা সিরীয় সংকটের কোনো সমাধান দেয়নি। বরং দেশটির জনগণের জন্য দুর্দশা বৃদ্ধি করেছে। এ বছর চলে আসা যুদ্ধের ক্ষেত্রে যে ব্যতিক্রমী ঘটনাটি সবাইকে অবাক করেছে তা হচ্ছে সিরীয় কুর্দিদের ওপর থেকে মার্কিন প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার। যুক্তরাষ্ট্র ২০১৪ সালে কথিত ইসলামি রাষ্ট্রের মোকাবিলায় সিরীয় কুর্দিদের ব্যবহার করে আসছিল।

ভেনিজুয়েলা সংকট : ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণ আমেরিকার ভেনিজুয়েলায় সাংবিধানিক সংকট দেখা দেয়। এ সময় পার্লামেন্টারি স্পিকার জুর্য়ান গাইদো নিজেকে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট বলে ঘোষণা করেন। যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতি সমর্থন ঘোষণা করে। কিন্তু ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানান। এ নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে বিভেদ দেখা দেয়। পক্ষ-বিপক্ষে আন্দোলন-সংগ্রাম ভেনিজুয়েলার জনজীবনকে বিধ্বস্ত করে দেয়।

এ ছাড়াও ২০১৯ ছিল আন্দোলনের বছর। সারা বছরই হংকংয়ের জনগণের আন্দোলন পৃথিবীর গণমাধ্যমকে ব্যস্ত করে রাখে। এপ্রিল মাসে সুদানে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট ওমর হাসান বশীরের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূচনা ঘটে। অবশেষে বশীর পদত্যাগ করেন। আলজেরিয়ার জনগণ প্রেসিডেন্ট আবদুল আজিজ বোথফালিকার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামলে ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন। অক্টোবর মাসে চিলিতে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে উত্থিত আন্দোলন অবশেষে আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। লেবাননে ইন্টারনেটের ট্যাক্স আরোপের প্রতিবাদে উত্থিত আন্দোলন সরকার পতনের আন্দোলনে পরিণত হয়। গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত ইরাকে বেকারত্ব ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে যুবকেরা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়। এতে ক্ষমতাসীন সরকারের পতন হয়। নভেম্বর মাসে ইরানে জ্বালানি সাবসিডি প্রত্যাহারের প্রতিবাদে জোরদার আন্দোলন গড়ে ওঠে। মার্চ মাসে একজন খ্রিস্টান মৌলবাদী নিউজিল্যান্ডের ক্রিস্টচার্চের দুটি মসজিদে হামলা চালায়। এতে ৪১ জন মুসল্লি নিহত হয়। সেপ্টেম্বর মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প তালেবানদের সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তিতে উপনীত হওয়ার প্রাক্কালে আলোচনা বন্ধ করে দেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী অক্টোবরে তথাকথিত ইসলামি রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আবু বকর আল বাগদাদীকে হত্যা করে।  এবং বছরের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর এবং সর্বশেষ সংবাদ হচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিশংসন প্রক্রিয়া। ইতিমধ্যে মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অভিশংসিত হন।

n লেখক :অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়