ডিপ্রেশন ও কিছু করণীয়

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৫১

পৃথিবীর কঠিনতম এক জগতের অধিবাসী প্রত্যেকটা মেডিক্যাল স্টুডেন্ট। ডিপ্রেশন এই জগতের সবচেয়ে শক্তিধর ও নিকৃষ্টতম প্রতিদ্বন্দ্বী। একে পরাজিত করে আপনাকে জয়ী হতেই হবে।

পড়ালেখাবিষয়ক আবশ্যিক যোগ্যতার উচ্চ মানদণ্ড, সময়সীমা নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রবল দাবি, সামাজিক সমন্বয়সাধন, বৃহদায়তনের কাজের পরিমাণ, সময়ের সঙ্গে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকা, পরীক্ষা কিংবা সার্বিক মূল্যায়নের সংখ্যাধিক্য, অপ্রত্যাশিত রাতজাগা এবং সর্বোপরি ক্লিনিক্যাল জগতের মাত্রাধিক্য চাপ সব মিলিয়ে মেডিক্যাল লাইফে ডিপ্রেশন আসাটা খুবই স্বাভাবিক একটা বিষয়। কিন্তু তাকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। ডিপ্রেশনকে প্রতিহত করতে হবে। ডিপ্রেশনের ফিজিওলজিক্যাল ও সাইকোলজিক্যাল দুই ধরনের কারণই আছে। এবং দুই ধরনের উপসর্গও রয়েছে।

প্রথমত আপনার জানতে হবে এই ডিপ্রেশনটা আপনার একার নয়। পৃথিবীর প্রত্যেকটা মেডিক্যাল স্টুডেন্ট এই একই পদ্ধতির মধ্য দিয়েই বের হয়ে এসেছে। কারোর হয়তো একটু বেশি, কারোর একটু কম। কারোর মধ্যে শেয়ার করার প্রবণতা বেশি, কারোর ভীষণ কম। যিনি কখনো শেয়ার করেন না তিনি ডিপ্রেশড নন—এই ধারণা ভুল। কমবেশি ডিপ্রেশন প্রত্যেকটা মেডিক্যাল স্টুডেন্টের ওপরই ভর করে। ‘আপনি একা নন’—এই ভাবনাটাকে নিজের ভেতর বেড়ে উঠতে দিন। আপনাকে শিথিল করবে এই ভাবনা। যে রাস্তায় যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষ হেঁটে এসেছে, এখনো হাঁটছে সেই দুরূহ রাস্তাটা আপনার একার নয়। আপনি আমাদেরই একজন। চোখ বন্ধ করে এই সত্যকে স্বীকার করে নিতে হবে। শান্ত থাকতে হবে।

বুঝে পড়ার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। একটা বাক্যও না বুঝে পড়বেন না। কঠিন বিষয়টাকে সহজ করার চেষ্টা করতে হবে। মনে রাখবেন, আপনাকে মানুষের জীবন নিয়ে লড়তে হবে, কোনো মেশিন নয়। রেজাল্টের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিন ব্যাসিককে। রেজাল্ট এমনিই ভালো হবে। পরীক্ষার আগের রাতে পড়েও রেজাল্ট ভালো করা যায়, কিন্তু সেটা আপনার দীর্ঘস্থায়ী কৃতিত্বের নির্ণায়ক নয়। আপনার যদি ব্যাসিক দুর্বল থাকে জীবনের লম্বা রাস্তায় আটকে যেতে হবে। পড়া যত কঠিন হতে থাকবে ডিপ্রেশন তত বাড়তে থাকবে। আপনার যদি ব্যাসিক দৃৃৃৃৃৃৃঢ়তা থাকে তাহলে কঠিন বিষয় সহজ হতে থাকবে। পারদর্শিতা বৃদ্ধি পাবে। পরীক্ষার হলে মনোবল বৃদ্ধি পাবে। এই দৃঢ়তা আর মনোবল ডিপ্রেশনের সঙ্গে যুদ্ধ করবে। না বুঝে পড়ার অভ্যাস আজ থেকে বন্ধ করে দিন। আপনাকে জানতে হবে। প্রচুর জানতে হবে। প্রচুর সময় দিন ব্যাসিকে। পড়ালেখায় নিজেকে স্মার্ট করে তুলুন, যাতে করে ডিপ্রেশন ব্যাপারটাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে দূরে ঠেলে দেওয়া যায়।

পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে হবে। আপনাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে এমন মানুষ প্রয়োজন যে আপনার মস্তিষ্ক চেনে, আপনার মস্তিষ্কের ক্ষুধা সম্বন্ধে নিখুঁত বিশ্বাস ও ধারণা বহন করে। তারাই আপনার পরিবার। ডিপ্রেশনের অনেক ক্যাটাগরি রয়েছে। তবে প্রথম পাঁচ বছরে ‘মেজাজের ওঠা-নামা কিংবা অস্থিরতা’ এই সমস্যাই সর্বাধিকভাবে নিরীক্ষিত হয়েছে। সেই ক্ষেত্রে আপনাকে প্রচুর কথা বলতে হবে। এমন মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হবে, যারা আপনার মেজাজের সুরকে আন্দোলিত করার ক্ষমতা রাখে। আধাঘণ্টা পরিবারের সঙ্গে ফোনে বকবক করুন প্রাণ খুলে। এতে করে অবিলম্বে আপনার মেজাজের অবস্থান্তর ঘটবে এবং পুনরায় পড়ায় নিবিষ্ট হওয়া সহজলভ্য হয়ে উঠবে।

যারা অতিরিক্ত ডিপ্রেশনে ভুগছেন তারা মেডিটেশন কিংবা যোগব্যায়ামের অভ্যাস করুন একটু একটু করে। প্রচণ্ড ভালো ফলাফল পাবেন। অবসর সময়ে ভালো কাজ করুন। রান্না করুন। বন্ধুদের খাওয়ান। পছন্দের কাজ করুন। ছবি আঁকুন। নিজের আঁকা ছবিগুলো মাঝে মাঝে দেখুন। নিজের ইচ্ছাগুলোকে প্রায়োরিটি দিন। নিজের মধ্যে সামাজিকতার বিকাশ ঘটান। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীলতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনুন। নিজেকে যতটুকু পারবেন শৃঙ্খলিত ও কর্মক্ষম রাখার চেষ্টা করুন।

সর্বশেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত রাখার প্রবণতা বাড়ান। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে আবিষ্ট রাখুন নিজেকে। এর তাত্পর্য গভীর। সংস্কৃতি আপনার স্বাস্থ্যকর, পরিষ্কার ও সফল জীবন নিশ্চিত করে। সংস্কৃতি দিয়ে ডিপ্রেশনকে খুন করুন।

আজ থেকে বদলে যান। আবার নতুন করে শুরু করুন। জয় আপনারই হাতে আসবে। ডিপ্রেশনকে দূর করুন। সুস্থ থাকুন। ভালো থাকুন।

n লেখক :চিকিত্সক