উৎসবমুখর পরিবেশে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন প্রার্থীরা। মনোনয়নপত্র দাখিলকে কেন্দ্র করে দিনভর উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল দুই রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে। আচরণবিধি ভঙ্গ করে মিছিল, স্লোগান এবং নেতাকর্মীদের বহর নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী অনেক প্রার্থী। আচরণবিধি লঙ্ঘন ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ ছিল না নির্বাচন কমিশনের (ইসি)।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থীসহ অধিকাংশ প্রার্থীরা মঙ্গলবার শেষ দিনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। দুই সিটিতে মেয়র পদে ১৪ জন মনোনয়ন জমা দেন। এর আগে দুই সিটিতে মেয়র পদে মোট ১৮ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। সাধারণ ওয়ার্ড ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন ২০৬০ জন। জমা দিয়েছেন ১০২৫ জন। আগামীকাল ২ জানুয়ারি রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র বাছাই করা হবে। রাজনৈতিক দলের বাইরে এবার স্বতন্ত্রভাবে কেউই প্রার্থী হননি। স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে ৩০০ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষরের কারণে দুই জন মনোনয়ন ক্রয় করলেও শেষ পর্যন্ত জমা দেননি।
শেষ দিনে দুই রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় ছিল প্রার্থী ও সমর্থকদের সরব উপস্থিতি। নিজ প্রার্থীরা পক্ষে এ সময় তারা স্লোগানও দিয়েছেন। নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী একজন প্রার্থীর সঙ্গে ৫ জনের বেশি উপস্থিতির সুযোগ না থাকলেও অধিকাংশ মেয়র প্রার্থী সেটা অমান্য করেছেন। অনেক কাউন্সিলর প্রার্থীও বিপুল সংখ্যক কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে তাদেরকে মৌখিকভাবে সতর্কও করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: হাত-পা বেঁধে স্ত্রীর সামনেই স্বামীকে জবাই করে হত্যা
মেয়র পদে ১৪ জন :দুই রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দুই সিটিতে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ১৪ জন মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে উত্তর সিটিতে ৭ জন এবং দক্ষিণ সিটিতেও ৭ জন। উত্তর সিটিতে মেয়র প্রার্থীরা হলেন—আওয়ামী লীগের আতিকুল ইসলাম, বিএনপির তাবিথ আউয়াল, জাতীয় পার্টি-জাপার জি এম কামরুল ইসলাম, সিপিবির সাজেদুল হক, পিডিপির শাহীন খান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ফজলে বারী মাসউদ, এনপিপির আনিসুর রহমান দেওয়ান। দক্ষিণে আওয়ামী লীগের শেখ ফজলে নুর তাপস, বিএনপির ইশরাক হাসেন, জাতীয় পার্টি-জাপার মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন, ইসলামী আন্দোলন মো. আবদুর রহমান, এনপিপির বাহরানে সুলতান বাহার, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. আকতার উজ্জামান ওরফে আয়াতুল্লা, গণফ্রন্টের আব্দুস সামাদ সুজন।
কাউন্সিলর পদে ১০২৫ জন :উত্তর সিটির ৫৪টি ওয়ার্ডের সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৩৭৪ জন ও ১৮টি সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডের সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৮৯ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। উত্তরে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ৪৬৩ কাউন্সিলর জন। দক্ষিণের ৭৫টি ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৪৬০ জন ও ২৫টি সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডে সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ১০২ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। সবমিলিয়ে এই সিটিতে মনোনয়ন দাখিল করেছেন ৫৬২ জন। দুই সিটিতে কাউন্সিলর পদে ১ হাজার ২৫ জন মনোনয়ন দাখিল করেছেন।
প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা ও বিধিভঙ্গ :রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনের মূল ভবনের সঙ্গে নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে ঢাকা উত্তর সিটির রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়। এখানে মঙ্গলবার সকাল থেকেই ছিল প্রার্থী ও সমর্থকদের উপচে পড়া ভিড়। দুপুর সাড়ে ১২টায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল ইসলাম মনোনয়ন জমা দিতে আসেন। অন্যদিকে দুপুর সোয়া ১২টায় ঢাকা দক্ষিণ সিটির রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে আসেন শেখ ফজলে নূর তাপস। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, প্রস্তাবকসহ পাঁচের অধিক ব্যক্তি নিয়ে প্রার্থীরা রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তরে আসতে পারবেন না। আবার কোনো বহরও নিয়ে যাওয়া যাবে না। তবে আতিকুল ও তাপসের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগে দুই রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে শতাধিক নেতা-কর্মী ভিড় করেন। এ দুই মেয়র পদপ্রার্থী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে শতাধিক নেতাকর্মী তাদের ঘিরে ধরেন। তার আগে ৩০টি ব্যক্তিগত গাড়ি ও মাইক্রোবাস নিয়ে তার গাড়িবহর সেখান থেকে রওনা দেয়। সঙ্গে ছিল একটি পুলিশের গাড়িও। গাড়িগুলো রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের খানিকটা দূরে রাখা হয়। একটি গাড়ি নিয়েই তিনি ইসি কার্যালয়ের সীমানার মধ্যে প্রবেশ করেন। সঙ্গে ছিলেন ঢাকা উত্তর শাখা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক এস এ মান্নান, এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম, বাফুফের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন। আতিকুল উত্তর সিটির রিটার্নিং কর্মকর্তার হাতে মনোনয়নপত্র জমার সময় নেতাকর্মীরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে শুরু করেন। কিন্তু তখন স্লোগান বন্ধ করার জন্য আতিকুল তাদের অনুরোধ জানান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আতিকুল বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে তারা পাঁচ জনই এসেছেন। বাইরে কোনো শোভাযাত্রা হয়নি। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে রাজধানীর সাদেক হোসেন কমিউনিটি সেন্টারে স্থাপিত রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে আসেন ঢাকা দক্ষিণের আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তাপস। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ, বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল, তাপসের ভাই যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশসহ সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়েই তিনি রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা আবদুল বাতেন তাপসের মনোনয়নপত্র গ্রহণ করেন এবং যাতে আচরণবিধি লঙ্ঘিত না হয়, সে বিষয়টি খেয়াল রাখার পরামর্শ দেন তিনি। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তাপস। পাঁচের অধিক লোক নিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রবেশে আচরণবিধি লঙ্ঘন হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে তাপস বলেন, তিনি নির্দিষ্টসংখ্যক লোক নিয়েই এসেছেন। দলের সিনিয়র নেতারা তার সঙ্গে এসেছেন। কিন্তু কার্যালয়ের ভেতরে অন্যান্য কাউন্সিলর প্রার্থী ছিলেন।
বেলা দুইটার দিকে উত্তর সিটির বিএনপি মনোনীত প্রার্থী তাবিথ আউয়াল মনোনয়ন জমা দিতে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে আসেন। এ সময় তার সঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুসহ ১০ থেকে ১২ জন সমর্থক ছিলেন। এ বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা আবুল কাশেম বলেন, ওই সময়ে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক তাদের সঙ্গে এখানে ঢুকেছেন। তাই কে সাংবাদিক; আর কে প্রার্থীর সঙ্গে, তা অনেক সময় চিহ্নিত করা যায় না। তবে তিনি বিএনপির প্রার্থীকে জিজ্ঞাসা করেছেন, তার সঙ্গে কত জন আছেন। তিনি বলেছেন, পাঁচ জন নিয়েই তিনি এসেছেন। অন্যদিকে বেলা পৌনে ৩টার দিকে দক্ষিণ সিটির বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ইশরাক হোসেন মনোনয়নপত্র জমা দেন। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের কাছেই তার বাসভবন। বেলা আড়াইটার দিকে তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ঢাকা সিটির সাবেক মেয়র মির্জা আব্বাস, ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতা আবদুস সালাম ও মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাসকে নিয়ে নিজ বাড়ি থেকে বের হন। মির্জা আব্বাস ও ইশরাক একই গাড়িতে ওঠেন। তাদের গাড়ির পেছনে আরো সাতটি গাড়িতে দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা ছিলেন। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের কাছে এসে সবাই গাড়ি থেকে নেমে পড়েন। তারা প্রায় ৫০ জন সেখানে ছিলেন। মির্জা আব্বাস, আবদুস সালামসহ পাঁচ জনকে সঙ্গে নিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে ঢোকেন বিএনপির প্রার্থী ইশরাক। এ সময় অন্যরা বাইরে অপেক্ষা করতে থাকেন।
গত ২২ ডিসেম্বর ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করে ইসি। তপশিল অনুযায়ী আগামী ৩১ ডিসেম্বর মনোনয়ন জমার শেষ তারিখ, যাচাইবাছাই ২ জানুয়ারি, প্রত্যাহার ৯ জানুয়ারি, প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে ১০ জানুয়ারি এবং ভোটগ্রহণ হবে ৩০ জানুয়ারি। প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিক প্রচারের সুযোগ পাবেন প্রতীক বরাদ্দের পর।
ইত্তেফাক/এসি

