ভোরবেলায় গ্রামে একদল মুক্তিযোদ্ধা এসেছে। সাত-আটজন মুক্তিযোদ্ধার দলটির ঠাঁই হয়েছে হাইস্কুলের সাদা চুনকাম করা দালানের একাংশে। মুক্তিযোদ্ধা দলে একজন কিশোর আছে । এই কনিষ্ঠজনের নাম নজু । নজু শহরের ছেলে। সে শুরু থেকেই গ্রামের কয়েকজন কিশোর ও উঠতি বয়সী তরুণকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে ঘুরে গ্রামটি দেখছে ।
বিন্নাবাইদ গ্রামে মুক্তিবাহিনীর কয়েকদিন অতিক্রান্ত হলো। এই মুহূর্তে স্কুলের মাঠের একপাশে চলছে আগ্রহী কিছু ছোট ছেলেদের নিয়ে বিশেষ মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং। ফরিদ, রফিক, রতন, বাচ্চু, জসুমদ্দী, আলম, নুইরা, হারেস, হাইক্কা ও আরও কয়েক খুদে মুক্তিযোদ্ধা এই গ্রামের দুরন্ত ছেলে মুসার একাত্তরের সাথী। মুসা ওদের দলপতি।
রৌদ্রোজ্জ্বল নদীর উন্মুক্ত প্রান্তর। দূরে একটি সবুজ মাঠের হাতছানি। যেন তেপান্তরের মাঠ। একাত্তরের শিশুরা এসব দেখেও দেখে না। পাটকাঠির বন্দুক দিয়ে তারা দৌড়ে দৌড়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলে। মুসা ও তার বন্ধুদের নিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা খেলছে। কখনো নদীর ধারে, কখনো ধান ও পাটখেতে, কখনো বা চেয়ারম্যান বাড়িটিকে ঘিরে। পাটকাঠির বন্দুক নিয়ে খেলতে খেলতে তারা একদিন জোট বেঁধে আক্রমণ করে স্কুলের দুটি শ্রেণিকক্ষে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধা তারেক বাহিনীর ওপর। তারেক তাদের ধমকে বিদায় করে। দুষ্ট ছেলের দল হাসতে হাসতে আবার অন্য জায়গায় চলে যায়।
কয়েকদিন পর। স্কুলের বারান্দার সামনে গ্রামের অনেক মানুষ এসে জড়ো হয়েছে। তারা নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। চেয়ারম্যান মাসুদ ভূঁইয়া তারেকের মুখোমুখি বসে আছেন। কমান্ডার তারেক কিছুক্ষণ আগে জানিয়েছে, তাদের বিন্নাবাইদ গ্রাম ছেড়ে চলে যাবার সময় হয়ে গেছে। বেলা বারোটার দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের একজন তার থ্রি নট থ্রি রাইফেলের পেটের পাঁচটি গুলি গুনতে গিয়ে দেখে যে তাতে একটি গুলি কম। শুরু হয় গুলি খোঁজাখুঁজি। এক রাউন্ড গুলি কোথায় উধাও হলো!
বিকেল হয়ে এসেছে। সূর্যের তীর্যক আলো সবার চোখে এসে পড়ছে। স্কুলের চিলেকোঠার একটি বড় ছায়া এসে পড়েছে সিঁড়ির সামনের বাগানে। সেখানের নরম ঘাসের ওপর একে একে দণ্ডায়মান—মুসা, ফরিদ, রফিক, রতন, বাচ্চু, জসুমদ্দী, আলম, নুইরা, হারেস ও হাইক্কা। তারেক ভীষণ রেগে আছে। তারেক তাদের সবার উদ্দেশে বলল, বল, তোরা কে গুলি চুরি করেছিস? গুলির খবর না বেরোলে কিন্তু আমি সবকটাকে গাছে ঝুলাব। চেয়ারম্যান বাড়ির গরুর দুধ খাওয়ার মজা বুঝাব। বারান্দায় পড়ে থাকা একটি ডাংগুলির ডাণ্ডা নিয়ে তারেক মুসার কাছাকাছি এসে তাকে বলে, এতবড় সাহস। গুলি চুরি! মুসা মৃদুকণ্ঠে বলে, আমি গুলি নেই নাই। তারেক বিস্ময়ে দৃষ্টি ভাসিয়ে বাজখাঁই গলায় বলল, একটি গুলি তাহলে এমনিতেই হাওয়া হয়ে গেল?
তারেক ও কিশোর মুক্তিযোদ্ধা নজু এসে দাঁড়ায় খুদে মুক্তিযোদ্ধাদের বানানো বাংকারের সামনে একটি মেশিনগান সদৃশ বন্দুক দিয়ে সজ্জিত বাংকারটি দেখিয়ে নজু বলে, তারেক ভাই, এটিই গতকাল দুপুরে মুসার দল বানিয়েছে। নদীর দিকে তাক করা বাঁশের বন্দুকটির নকশা অবিকল একটি মেশিনগানের মতো। বন্দুকটির দুটি পা আছে। বন্দুকের মাঝামাঝি অংশে একটি টিনের বড় কৌটা বাঁধা। তারেক সেই কৌটার ভিতরে হাত ঢুকিয়ে কিছু একটি জিনিসের খোঁজ পায়। তারপর যা কৌটার ভিতর থেকে বের করে এনে নজুকে দেখায়, সেটি একটি তাজা থ্রি নট থ্রি রাইফেলের গুলি। তারেক গুলিটি তার বাঁ হাতে নিয়ে বন্দুকটি ডান হাতে নদীর দিকে তাক করে চিত্কার করে বলে, এই একটি গুলিতে একটি পাকিস্তানি মিলিটারির মরণ লেখা আছে। নিশ্চয় আছে।
মুক্তিযোদ্ধা দলটি বাজারের আবদুল হাই খলিফার দোকান পেরিয়ে চলে গেল। এই দর্জি দোকানি মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাধীন বাংলার একটি ছোট পতাকা বানিয়ে উপহার দিয়েছে। মুসা ও তার একাত্তরের সাথীরা মলিন মুখে দাঁড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সেই চলে যাওয়া প্রত্যক্ষ করল। চেয়ারম্যান মাসুদ ভূঁইয়া মুসা ও তার সাথীদের বললেন, মিলিটারির স্পিডবোট প্রায়ই আসে-যায়। তরা সবাই আমার বাইত খাইবি আর গাং পাহারা দিবি। তরারে প্রত্যেকদিন আমার কালা গাইয়ের দুধ খাওয়াইয়াম। কালা গাইয়ের দুধের কথা শুনে ছেলেগুলো একটু খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে।
মুসা একা একা এসে দাঁড়ায় নদীরধারে তাদের বানানো নতুন বাংকারের সামনে। আগের বাঁশ ও বেড়ার তৈরি বাংকারটি মিলিটারি একদিন এসে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। নতুন বাংকারের বালুর বস্তার ওপর মেশিনগানটি তার আগের মতোই ঠিক আছে। হয়তো মেশিনগানটির কৌটার ভিতর গুলিটিও ঠিক আছে। নদী প্রান্তের কম্পমান বাতাসে তার পরিহিত ছোট্ট বস্ত্রখানি উড়ছে। বাঁশের বন্দুকটি শূন্যে তুলে সে একটু নাড়া দেয়। বন্দুকের পেটে বাঁধা কৌটার ভিতর থেকে শব্দ হয়। আজকের শব্দটি একটু অন্যরকম। তবুও কৌটার ভিতরের সেই শব্দ শোনার আনন্দে শরতের শিশুর মলিন মুখটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
