ইউরোপীয় ইউনিয়নের তাত্ত্বিক ভিত্তি ১৯৫৭-৫৮ সালে J.E. Meade এবং T. Scitorsky এর Optimum Currency Area Theory থেকে যা পরবর্তীতে Mundell (১৯৬১) এবং Mckinnon (১৯৬৩) এর মাধ্যমে হালনাগাদ হয়। এর তাত্ত্বিক ভিত্তিটার দিকে তাকালেই আজকে যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাওয়ার কারণগুলো খুঁজে পাওয়া যাবে।
যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভবিষ্যতের ব্যাপারে ২০১৬ সালের গণভোটে সামান্য ব্যবধানে ব্রেক্সিটপন্থিরা জয়ী হয়। এরপর দুই জন প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং সর্বশেষ তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী পুনরায় পার্লামেন্ট ইলেকশন দিয়েছেন। ১২ ডিসেম্ব্বরের ইলেকশনে প্রধান দুই দল কনজারভেটিভ পার্টি বনাম লেবার পার্টির লড়াই যেন হয়ে উঠেছিল বেক্সিটের পক্ষে আর বিপক্ষের মতামত জানানোর মাধ্যম। লেবার এবং লিবারেল আরো ৭টি দল, যারা ব্রেক্সিটের বিপক্ষে বা সমঝোতামূলক ব্রেক্সিটের পক্ষে ছিল, ৫২.২ শতাংশ ভোট পেয়েছে, অন্যদিকে যে কোনো অবস্থায় ব্রেক্সিট কার্যকরের পক্ষে থাকা তিনটি দল পেয়েছে ৪৬.৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট পাওয়া সত্ত্বেও নিজেদের মধ্যে বিভাজন থাকায় লেবার এবং লিবারেলরা পেয়েছে ২৭৭টি আসন, ক্ষমতাসীনরা পেয়েছে ৩৭৩টি আসন। ফলাফল নিশ্চিত করেছে, যে কোনো মূল্যে দ্রুতই ব্রেক্সিট কার্যকর হবে।
গণভোট এবং পরবর্তীতে পার্লামেন্টারি ইলেকশনের ফলাফল ব্রেক্সিটের মূল নির্ধারক ছিলেন ভোটাররা। প্রশ্ন আসতেই পারে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে এত দিন থাকার পর যুক্তরাজ্যের জনগণ কেন ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যেতে চাইছে। এর উত্তর রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তাত্ত্বিক ভিত্তি Optimum Currency Area Theory তে।
প্রথমত, Optimum Currency Area Theory এর পূর্বশতগুলোর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহের কাঠামোগত সাদৃশ্যের শর্ত । আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অভিবাসী সমন্বয়, প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, আর্থিক খাত, মানসম্পন্ন শিক্ষাসহ নানাবিধ প্যারামিটারে যুক্তরাজ্য অনেক আগে থেকেই তার প্রতিবেশীদের চেয়ে এগিয়ে ছিল। ২০০৭ সালের মহামন্দার পর থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য দুই জায়ান্ট ফ্রান্স ও জার্মানি কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি পাচ্ছে না, ইটালি ও গ্রিসের মতো দেশগুলো অর্থনৈতিকভাবে দেওলিয়াত্বের মুখোমুখি হচ্ছে। অন্যদিকে ইউনিয়নভুক্ত দেশ ইউক্রেন, সার্বিয়া, রোমানিয়া, কসোভোসহ আরো কিছু দেশ মাথাপিছু আয়, কর্মসংস্থান, শিক্ষায় যুক্তরাজ্য থেকে যোজন যোজন পিছিয়ে পড়েছে। ফলাফল , কাঠামোগত সাদৃশ্য না পাওয়ায় যুক্তরাজ্যর মানুষেরা ইউরোপীয় ইউনিয়নে থেকে বেরিয়ে যেতে চাচ্ছেন।
দ্বিতীয়ত, তত্ত্ব অনুযায়ী, একক বাজার এবং একক মুদ্রার সুবিধা সকল দেশের জন্য সর্বোচ্চ হতে হবে। যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের একক মুদ্রা গ্রহণ করেনি। একক বাজার থাকার যে সুবিধা যুক্তরাজ্য পাচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি অবদান যুক্তরাজ্যকে ইউনিয়নে রাখতে হচ্ছে। ইউরোপের মোট মত্স্য আহরণের অর্ধেকই হয় যুক্তরাজ্য সমুদ্রসীমা থেকে, ইউরোপীয়ান ব্যাংকে যুক্তরাজ্যের শেয়ার ১৬ শতাংশ, এরপরও সর্বশেষ অর্থবছরগুলোতে ইউনিয়নের বাজেটে যুক্তরাজ্যকে এককভাবে গড়ে ১২-১৫ শতাংশ জোগান দিতে হয়েছে।
তৃতীয়ত, তত্ত্ব অনুযায়ী, বিভিন্ন সেবা এবং পণ্যের প্রবাহ হবে বাধাহীন এবং এর ফলে সকল দেশই এ থেকে উপকৃত হতে হবে। সাম্প্রতিক সময়গুলো এই বাধাহীন সম্পদ এবং পণ্যের প্রবাহে যুক্তরাজ্যের দৃশ্যমান খুব বেশি উপকার হয়নি। ইউনিয়নভুক্ত বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মন্থরগতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া, সমাজসেবায় বরাদ্দ কর্তনসহ নানা কারণে ইউনিয়নে থাকা যুক্তরাজ্যর জন্য লাভজনক হচ্ছে না। ভোটের সময় এই ফ্যাক্টরগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছে।
চতুর্থত, তত্ত্ব অনুযায়ী, ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর ইউনিয়নকে সফল করার ব্যাপারে আগ্রহ এবং ইচ্ছা, দুটোই লাগবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা এবং একক মুদ্রা চালুর ব্যাপারে ইউরোপীয় জায়ান্টদের দীর্ঘমেয়াদি চিন্তাভাবনা কাজ করেছে। ফ্রান্স এবং জার্মানি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ রোলপ্লেয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠায় ইউনিয়নের প্ল্যাটফরম ব্যবহার করেছে। যুক্তরাজ্যের এই জায়গা থেকে অর্জন খুব বেশি নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাজ্য আগে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ রোলপ্লে করত এবং ইউনিয়নের প্ল্যাটফরম তার জন্য খুব বেশি ভ্যালু এ্যাড করেনি। ফলে যুক্তরাজ্য ইউনিয়নে থাকার আগ্রহ এবং ইচ্ছা হারিয়েছে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
