কাজের সন্ধানে শহরে ছুটছে গারো মেয়েরা

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২০, ২১:৫৭

মধুপুর-টাঙ্গাইল সড়কের পঁচিশ মাইল বাজার থেকে ডানে নামলেই গজারি বনের সর্পিল রাস্তা। ঘন বৃক্ষলতায় ছাওয়া কাঁচা সড়ক যেখানে ঠেকেছে, সে গ্রামের নাম জাঙ্গালিয়া। এটি মধুপুর বনাঞ্চলের একটি গারো গ্রাম।

এ গ্রামের বিউটিশিয়ান মেরিনা পাথাং (২৪)। বাবা বিশেন্দ্র মাংসাং। মা ফ্রনিতা পাথাং। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে মেরিনা দ্বিতীয়। মা ফ্রনিতা জানান, বাল্যকাল থেকেই মেরিনা ছিল মেধাবী। ক্লাসে সব সময় প্রথম হতো। পড়ালেখা শিখে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ছিল মেয়ের। কিন্তু দিনমজুর বাবার সংসারে লেখাপড়ার স্বপ্ন ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পর স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। অনটনের মুখে কলা-আনারস বাগানে বাবা-মার সঙ্গে দিন মজুরি শুরু। কিন্তু শিশু শ্রমিক বিধায় খুব একটা মজুরি জুটত না। পরে ফুফি অর্থাত্ বিউটিশিয়ান রুণি সাংমার হাত ধরে রাজধানী মগবাজারের এক বিউটিপার্লারে খাওয়া-পরার চুক্তিতে কাজ পায় । সেখানেই কাজ করে ১৪ বছর ।

মেরিনা এখন একজন অলরাউন্ডার বিউটিশিয়ান। কাজ করেন গুলশানের একটি পার্লারে। বেতন মাত্র ১০ হাজার। থাকেন অফিস সংলগ্ন মেসে। খাবার নিজের। খরচ বাদে যা থাকে পাঠান অসুস্থ বাবা-মাকে। মেরিনার বাবা বিশেন্দ্র জানান, একসময় পুরো গ্রাম ছিল গজারি বনে ঢাকা। বন থেকে মধু, বনআলু, ভেষজ ওষুধ, ফলমূল এবং প্রাকৃতিক খাবারসহ জীবিকার সব উপকরণ মিলত। আশির দশক হতে বহিরাগতরা অবৈধভাবে জঙ্গল পরিষ্কার করে গ্রামে বসতি গাড়তে থাকে। বন উজাড় করে আবাদি জমির প্রসার ঘটায়। আনারস আর কলাবাগান তা গ্রাস করে। বহিরাগত মহাজনরা এখানে উদ্যানভিত্তিক ফল আবাদ করলেও স্থানীয় গারোরা কাজের সুযোগ পায় না। শ্রমিক আনে বাইরে থেকে। ফলে নিজ গ্রামেই বেকার দরিদ্র গারোরা।

মাতৃতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে পরিবারে মায়ের ভূমিকাই যেহেতু মুখ্য সেজন্য আয় রোজগারের জন্য মেরিনা বিউটি পার্লারে কাজ নিয়েছে বলে জানায় বিশেন্দ্র। মেরিনার ছোটো বোন শিলেনা পাথাং (১৯) ও এক বছর ধরে কাজ করছে সিলেটের মৌলভীবাজারের এক পার্লারে। বেতন মাত্র ২ হাজার। একইভাবে ধরাটি গ্রামের পূর্ণিমা রিছিল, রাজঘাটের শিলা ম্রং, থানারবাইদের সুষমা রিছিল, জালিচিরার সুবন্তী নকরেক, জাঙ্গালিয়ার চম্পা মাংসাং ও পলি নকরেক, গাছাবাড়ীর রীতা দফো, পেগামারির মৈত্রী চিরান, জালাবাদার রিংচি সাংমা প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পার না হতেই দারিদ্র্যতার কষাঘাতে জীবিকার সন্ধানে শহরে পাড়ি জমান। কাজ করছেন বিউটিপার্লারে।

বেসরকারি সংস্থা ‘সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউমেন ডেভেলপমেন্ট’  (সেড) এর জরিপে বলা হয়, মধুপুর বনাঞ্চলের ৪৪টি গ্রামে প্রায় ১৭ হাজার গারো বাস করে। এদের মধ্যে ৯ হাজার ৩৩১ পরিবারের ১ হাজার ১৩১ যুবতি ও তরুণী ঢাকা, সিলেট, রাজশাহী, চট্টগ্রামের বিভিন্ন পার্লারে কাজ করেন। এরা সবাই বিউশিয়ান বলে পরিচয় দিতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। সেডের পরিচালক ফিলিপ গাইন জানান, গারো নারীদের শহরে অভিবাসন হওয়ার মূল কারণ দারিদ্র্যতা ও বেকারত্ব। শহরের কর্মস্থল অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ না হওয়ায় গারো রমণীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অভিবাসিত হওয়ায় এদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষা ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে।

বিউটিশিয়ান রীতা দফো জানান, পার্লারে সব বিউটিশিয়ান একই ধরনের কাজ করেন না। কেউ বউ সাজান। কেউ চুল ছাঁটেন। কেউ মেহেদি, রিবন্ডিং, ফেসিয়াল বা হেয়ার কালার করেন। বউ সাজাতে সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। কাজের সময় সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা। ঈদ, পূজা বা উত্সবে টানা ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টার খাটুনি চলে। কিন্তু ওভারটাইম বা বোনাস নেই। বড়োজোর বেতন ২০/২৫ হাজার। থাকা-খাওয়ার পর তেমন কিছু থাকে না। কোনো কারণে পার্লার বন্ধ হয়ে গেলে বকেয়া বেতন মিলে না। মৈত্রী চিরান জানান, সারা দিন কতো সৌখিন মানুষকে সাজিয়ে থাকি। সাজগোজের পর হূষ্টচিত্তে তারা বিদায় হন। আর নিজেরা ক্লান্ত শরীর নিয়ে ফিরে আসি মেসে। গাদাগাদি করে, গিঞ্জি পরিবেশে থাকি। পুষ্টিকর খাবারও জোটে না।

সুবন্তী নকরেক জানান, বিউশিয়ান পেশা নিয়ে অনেকেরই ভুল ধারণা রয়েছে। তারা মনে করেন, পার্লারে কাজ করলেই মেয়েরা নষ্ট হয়ে যায়। তারা বাঁকা চোখে দেখেন। কটূক্তি করেন। সুযোগ পেলে খারাপ প্রস্তাব দেন। যৌন হয়রানি করেন। অনেক সময় পার্লারের ম্যানেজার বা মালিকরা মন্দ কাজে প্ররোচিত করেন। গারোরা স্বভাবগতভাবে শান্তিপ্রিয়। তাই অনেক সময় নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হলেও নীরবে সহ্য করে। সুষমা রিছিল জানান, অধিকাংশ পার্লার লাভজনক হলেও মালিকরা বিউটিশিয়ানদের শ্রম শোষণ করেন। তাদেরকে ওভারটাইম বা বোনাস দেওয়া হয় না। স্বল্প বেতনে চাকরি করতে না চাইলে পাতানো ফাঁদে আটকিয়ে কাজ করতে বাধ্য করেন।

মধুপুর বনাঞ্চলে গারো নারীদের একমাত্র সংগঠন আচিকমিচিক সোসাইটির প্রধান সুলেখা ম্রং জানান, মধুপুরে ৮ হাজার একরে রাবার, ১০ হাজার একরে বিদেশি প্রজাতির গাছের বাগান করা হয়েছে। এতে অনেক গারো পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ৪৫ হাজার গজারি বন প্রায় উজাড়। অরণ্যানি গারোদের পারিপার্শ্বিক জীবনযাপন আজ বিপন্ন। পেটের তাগিদে তারা শহরে ছুটছে। মেয়েরা দল বেঁধে কাজ করছে পার্লারে। কিন্তু তাদের কর্মক্ষেত্র নিরাপদ নয়। বেতনভাতা নামেমাত্র। প্রলোভনে পড়ে অনেক গারো মেয়ে সভ্রম হারাচ্ছে। তাদের পারিশ্রমিক ও নিরাপত্তার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহবান জানান।