কলকারখানা পরিদর্শনে কঠোর হচ্ছে সরকার

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২০, ২২:৪৯

বিদেশি ক্রেতাসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের নজরদারি থাকায় কয়েক বছর ধরে গার্মেন্টস কারখানার কমপ্লায়েন্সসহ (কর্মপরিবেশ) শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিদর্শনে গুরুত্ব দিয়ে আসছে সরকার। তবে এর বাইরে অন্যান্য খাত যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। ফলে ঐসব খাতে দুর্ঘটনায় শ্রমিকের ব্যাপক প্রাণহানি হচ্ছে। সর্বশেষ কেরানীগঞ্জ ও গাজীপুরে দুটি কারখানায় দুর্ঘটনায় প্রায় ৩০ শ্রমিকের প্রাণহানির পর টনক নড়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের। এখন সব ধরনের শিল্পকারখানায় কর্মপরিবেশসহ শ্রমিক নিরাপত্তার বিষয়টিতে কঠোর হচ্ছে শ্রম মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ লক্ষ্যে সম্প্রতি মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলোকে কড়া বার্তা দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। চিঠিতে বলা হয়, পোশাকশিল্প ছাড়াও ট্যানারি, চা, শিপব্রেকিং, ইমারত নির্মাণ, বয়লার, কেমিক্যাল, প্লাস্টিক কারখানা যথাযথভাবে পরিদর্শন করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নোটিশ প্রদান, সংস্কারকাজ বাস্তবায়ন এবং সময়সীমা অতিক্রান্ত হলে মামলা দায়ের করতে হবে। পরিদর্শকদের আওতাধীন এলাকায় উপযুক্ত পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায়দায়িত্ব পরিদর্শককে বহন করতে হবে। শুধু তাই নয়, ঐ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া পরিদর্শনের হালনাগাদ পরিস্থিতিও জানতে চাওয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে কারখানা পরিদর্শনে কঠোর এ বার্তার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ছাড়াও সংশ্লিষ্ট       মন্ত্রণালয় ও বিভাগকেও অবহিত করা হয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে ডিআইএফইর মহাপরিদর্শক শিবনাথ রায় ইত্তেফাককে বলেন, মাঠ পর্যায়ে যারা পরিদর্শন করছেন, অনেকক্ষেত্রে তার ফলাফল দৃশ্যমান হয় না। কারখানাগুলোকে নোটিশ করার পর তাগিদপত্র বা মামলা করা হলে তার ফলোআপ কী—ঐ রিপোর্ট আমাদের কাছে সবসময় আসে না। ফলে যথাযথ আইনিব্যবস্থা নেওয়া যায় না। এছাড়া পরিদর্শন কার্যক্রমের হালনাগাদ পরিস্থিতি নিয়ে কারখানার তালিকাও জানতে চাওয়া হয়েছে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশে কলকারখানাসহ অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে ৭৮ লাখ। এর মধ্যে গ্রামগঞ্জের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শ্রম নিরাপত্তাসহ কর্মপরিবেশ তদারকের দায়িত্ব ডিআইএফইর। এর মধ্যে গার্মেন্টস কারখানা প্রায় ৫ হাজার। তাজরীন ফ্যাশন ও রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় প্রায় ১ হাজার ৩০০ শ্রমিকের মৃত্যুর পর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগে এ খাতের শ্রম নিরাপত্তায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে গত প্রায় ছয় বছরে গার্মেন্টসে কিছু দুর্ঘটনা ঘটলেও বড়ো আকারের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।

কিন্তু গার্মেন্টস খাত ছাড়া অন্যান্য কারখানার শ্রম নিরাপত্তা রক্ষায় এখনো যথাযথ উদ্যোগের অভাব রয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিল্স) জরিপ অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০১৯ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ১ হাজার ১৭৫ জন, যা ২০১৮ সালের চেয়ে ১৫৫ জন বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গার্মেন্টসের বাইরে অন্যান্য খাতে যথাযথ পরিদর্শনের ঘাটতির কারণে দুর্ঘটনা কমানো যাচ্ছে না। পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর পরিচালক ফজলে শামীম এহসান ইত্তেফাককে বলেন, গার্মেন্টস খাতে মোটামুটি ঠিকঠাকভাবে পরিদর্শন হলেও অন্যান্য খাতের শিল্পে তা যথাযথভাবে হচ্ছে না। এক্ষেত্রে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। অন্যথায় এসব খাতে শ্রম নিরাপত্তা ও জানমালের বিষয়টি অরক্ষিত থেকে যাবে।

এক্ষেত্রে ডিআইএফইর সক্ষমতা অপ্রতুল কি না, সে প্রশ্ন তুলেছেন বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, কারখানার নিরাপত্তা রক্ষায় ডিআইএফইর উদ্যোগে সহায়কের ভূমিকা পালন করবে বিজিএমইএ।

এদিকে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিদর্শনের জন্য লোকবলের অভাবের বিষয়টি জানা গেছে। অন্যদিকে কমপ্লায়েন্সে ব্যর্থ শিল্পকারখানা বন্ধ করার বিষয়ে আইনে বলা থাকলেও বাস্তবায়নে তাদের হাতে যথাযথ ক্ষমতা নেই বলেও তারা জানিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাঠ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, শ্রম নিরাপত্তায় ব্যর্থ কারখানার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে প্রয়োজনে তা বন্ধ করে দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে উচ্চপর্যায় থেকে অনুমতি পাওয়া যায় না। আবার দুর্ঘটনা ঘটলে দায়ভার আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে।