সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক রাজ্যের সিনেটে ২৫ সেপ্টেম্বরকে ‘বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট ডে’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ও বাংলা ভাষার এই উজ্জ্বল দিনেই বাংলায় দেওয়া বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মাধ্যমে পৃথিবীর সবগুলো দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে পারে বাংলা ভাষার কথা, জানতে পারে বাংলা ভাষাভাষী বাঙালি জাতির জন্য রয়েছে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ! ‘বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট ডে’ ঘোষণা নিউ ইয়র্ক রাজ্যের সাধারণ আনুষ্ঠানিকতা মাত্র নয়। এর তাত্পর্য আরো গভীর। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্য দিয়ে নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশি আমেরিকানদের এক ধরনের অগ্রাধিকার সূচিত হলো; আমেরিকায় অন্যান্য অগ্রসর জাতির ইমিগ্র্যান্টদের সঙ্গে উজ্জ্বল পঙিক্তভুক্ত হলো বাংলাদেশিরাও। উল্লেখ্য, নিউ ইয়র্ক রাজ্যের সিনেটে একটি সেশনে আলোচনার পর এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
স্মরণীয় যে, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি আধুনিক রাষ্ট্র যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ এসে বসতি গড়েছে। এ কথাও সকলেরই জানা যে, দীর্ঘ হানাহানি থেকে মুক্ত হয়ে শান্তিপূর্ণ বসবাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্র বের করে নিয়েছে গণতান্ত্রিকতার কিছু নিজস্ব রীতি। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় ভাষণ দেওয়ার দিনটিকে ‘বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট ডে’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের সেই উদার গণতান্ত্রিকতারই একটি স্বতন্ত্র নিদর্শন। দিনটির তাত্পর্যকে এমনভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশি জনসমাজের পরিচিত মুখ বিশ্বজিত সাহার অন্তর্দৃষ্টির কারণে। যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিকতাকে অনুধাবন করে এর তাত্পর্যের সঙ্গে বাংলাদেশি জনসমাজকে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করা বিশ্বজিত সাহারই কৃতিত্ব! স্মরণীয় যে, বছর দুয়েক আগেও তার উদ্যোগে বাংলাদেশিদের এই প্রস্তাব সিনেটে আলোচনার পর রিপাবলিকান সিনেটরদের বিরোধিতায় বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু ‘বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট ডে’ ধারণার স্রষ্টা বাংলাদেশি জনসমাজের পরিচিত মুখ নানা ব্যতিক্রমী কাজের উদ্যোক্তা বিশ্বজিত সাহা এতে দমে যাননি। এখন থেকে ২৮ বছর আগে তিনি যেমন বাংলা বই নিয়ে ‘মুক্তধারা বইমেলা’ আয়োজন করার কথা কল্পনা করেছিলেন, যেমন বেশ কয়েক বছর আগে ২১ ফেব্রুয়ারির দিনে জাতিসংঘের সামনে শহিদ মিনার স্থাপনের কথা ভেবে সেটাকে বাস্তবায়ন করে ছেড়েছেন, তেমনিভাবেই তার উদ্যোগ ও উদ্যমে নিউ ইয়র্ক রাজ্যে সম্প্রতি ‘বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট ডে’ও বাস্তবায়িত হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের আজ বিভিন্ন দেশে অভিবাসী হওয়া একটি বাস্তব বিষয়। আবার এটাও সত্য যে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা তাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের প্রতিটি চিহ্ন শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে বসবাসরত বাঙালিদেরই শক্তি ও সামর্থ্যের পরিচায়ক। বিশ্বজিত সাহা তার তত্পরতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশিদের এমন একটি সাংস্কৃতিক চিহ্নকে নিউ ইয়র্কের মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করলেন। কেতাদুরস্ত পোশাক পরে মঞ্চে উঠে বড়ো বড়ো কথা বলেন না এমন একজন ‘সাধারণ’ মানুষ বিশ্বজিত সাহার আত্মনিবেদনেই এটা সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি মানুষ আজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইমিগ্র্যান্ট! যত দিন যাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক রাজ্যে ২৫ সেপ্টেম্বরকে ইমিগ্র্যান্ট ডে ঘোষণায় বিশ্বজিত সাহার এই অবদানের তাত্পর্য আরো বাড়বে। জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় ভাষণ দেওয়াকে প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশে দিনটিকে ‘জাতীয় অভিবাসী দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে আরো বেশি তাত্পর্যপূর্ণ করে তুলতে পারে! এর মধ্য দিয়ে সরকার বাংলাদেশের উন্নয়নে বাংলাদেশি অভিবাসীদের উন্নত বা ভিন্ন অভিজ্ঞতাকে আরো বেশি করে সমন্বিত করতে পারবে; বাংলাদেশের সুশাসনে, জাতীয় পর্যায়ে রাষ্ট্রব্যবস্থার উত্কর্ষে, সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ও অন্যান্য দেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বাড়ানোর লক্ষ্যে অভিবাসীদের পারবে আরো জোরালো ও গভীরভাবে সম্পৃক্ত করতে। উল্লেখ্য, বিশ্বজিত সাহার নেপথ্য উদ্যোগে ২০১৯ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কের পিএস ৬৯-এ আগের বছরের মতো ‘বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট ডে’ ও ‘বাংলাদেশ ট্রেড ফেয়ার ২০১৯’-এর উদ্বোধন হয়ে নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে ২৯ সেপ্টেম্বর সফলভাবে শেষ হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশ্বজিত সাহা তার সম্পাদনায় ‘Global Business’ নামের একটি সংকলনও প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা এ ধরনের কোনো সংকলন বের করলে সাধারণত সেগুলো ভাবনাহীন ও রুচিহীন উপস্থাপনে কিছু লেখার এলোমেলো সংকলন হয়ে ওঠে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলো দেখলে বোঝা যায় যে, আমাদের ব্যবসায়ীরা এখনো জাতির সাংস্কৃতিক রুচির চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো আর্থিকতার দাপটে তারা সাংস্কৃতিক রুচিকে পেছনে সরিয়ে দেওয়ায় তাদের নিম্ন রুচিমানই সমাজে প্রভাব রাখছে! এই দিক থেকে বিবেচনা করলে ‘Global Business’ নামের সংকলনটিও বিশ্বজিতের আরেক উত্কৃষ্ট উপহার!
নিউ ইয়র্কে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট ডে পালন অনুষ্ঠানে রাজ্য সিনেটের সিনেটর জন ল্যু অভিবাসী বাংলাদেশের মানুষের গৌরবগাথা যেভাবে উচ্চারণ করে গেলেন তা ছিল নিউ ইয়র্ক প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে এক উজ্জ্বল ও স্মৃতিময় মাইলফলক। অনুষ্ঠানের শুরুতে দিনটির তাত্পর্য ব্যাখ্যা করে নিউ ইয়র্ক রাজ্যের অ্যাসেম্বলি সদস্য ক্যাটালিনা ক্রুজের সাইটেশন হস্তান্তরও ছিল গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। নিঃসন্দেহে আমেরিকার মূলধারার আইনসভার দ্বারা এই গুরুত্বপূর্ণ দিনটিকে পালন করা বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা। বাংলাদেশের প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত দিনটির গুরুত্ব অনুধাবন করে বলেছেন, ‘মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের কাজ অনেক গভীরে প্রোথিত। এটি যে শুধু জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন তা নয়, আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশিদেরও বিজয়ের এক বার্তা!’
আমেরিকার কোনো রাজ্যের সিনেটে বা কংগ্রেসে কোনো আইন পাশ করতে হলে বা কোনো ধারা যুক্ত করতে হলে আইন পরিষদ সে দেশের অভিবাসী সমাজের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততাকে প্রধান বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। আমেরিকার মূলধারার আইন পরিষদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ২৫ সেপ্টেম্বর বাংলায় প্রদত্ত ভাষণকে যুক্ত করেছেন বিশ্বজিত সাহা তার গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও দূরদর্শিতা দিয়ে। এই দিনটিতে জাতিসংঘের মতো বিশ্বসভায় বঙ্গবন্ধুর প্রথম বাংলায় ভাষণ প্রদানের ঘটনাটি নিউ ইয়র্কেই ঘটেছিল। সেই সূত্রেই দীর্ঘকালের নিউ ইয়র্কবাসী বিশ্বজিত সাহার মনে দিনটির তাত্পর্য স্বতন্ত্রভাবে ধরা দেয়। বিষয়টি একেবারে সহজ ছিল না। বাংলাদেশি জনসমাজের সঙ্গে নিউ ইয়র্ক সিনেটের এই যোগসূত্র তৈরি করতে বিশ্বজিত সাহাকে দীর্ঘকাল ধরে প্রয়োজন অনুসারে নানান তথ্য-উপাত্ত সিনেটের কাছে সরবরাহ করতে হয়েছে।
দিনটির তাত্পর্য বিবেচনা করে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনের লগ্নে বাংলাদেশ সরকার ২৫ সেপ্টেম্বরকে ‘জাতীয় ইমিগ্র্যান্ট ডে’ হিসেবে ঘোষণা করতে পারেন। এর মাধ্যমে ইমিগ্র্যান্টদের জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে। এই দিনের তাত্পর্যে উজ্জীবিত সম্ভাবনার স্পর্শে যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশি অভিবাসীরা বাংলাদেশের উন্নয়নে আরো দ্রুত ও গভীর অবদান রাখতে পারবেন। বাংলাদেশের বাণিজ্যিকতার জয়গানের জন্য বিশ্বজিতের এই আয়োজন বাঙালি মাত্রকেই স্বপ্নে উজ্জীবিত করে তোলে।
n লেখক : প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য-গবেষক
