দেওয়ালের ওপাশে একমাত্র সন্তান আগুনে পুড়ছে। বাঁচার জন্য আশ্রয় নিয়েছে ১০ তলার ফ্ল্যাটের বারান্দায়। আর এপাশে বাবা-মা প্রাণপণ চেষ্টা করছেন দরজা ভাঙার। একসময় দরজা খুলতে সক্ষমও হন। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ !
বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও গ্লোবাল টেলিভিশনের অপরাধ বিভাগের প্রধান মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নুর একমাত্র ছেলে তরুণ উদ্যোক্তা স্বপ্নীল আহমেদ পিয়াসের (২৪) এভাবেই মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। ২৪ বছরের টগবগে এক তরুণ। দুই চোখ ভরা যার হাজার স্বপ্ন ছিল। সদ্য বিবিএ পাশ করেছে। পড়াশোনাতেও ছিল ভালো। তাকে ঘিরে ছিল বাবা-মার অনেক স্বপ্ন। এক নিমিষেই সব শেষ হয়ে গেল !
ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর আফতাবনগরে। বৃহস্পতিবার ভোর ৫টার দিকে নিজ বাসায় রুম হিটার বিস্ফোরণে অগ্নিদগ্ধ হয় পিয়াস। উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর দায়িত্বরত চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। গতকাল বাদ জোহর স্থানীয় মসজিদে নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বিকালে মরদেহ নড়াইল সদর উপজেলার ভাংঙ্গুরা গ্রামে নানার বাড়িতে নেওয়া হলে সেখানে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে যশোরের নওয়াপাড়ায় গ্রামের বাড়িতে নিয়ে তাকে দাফন করা হয়।
সাংবাদিক নান্নু জানিয়েছেন, রাত ৪টার দিকে ছেলের চিত্কার শুনে ঘুম থেকে উঠে দেখেন পুরো বাসা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। তিনি বারান্দায় গিয়ে দেখেন ছেলের গেঞ্জিতে আগুন জ্বলছে এবং সে বারান্দায় ‘বাবা বাঁচাও’ বলে চিত্কার করছে। তিনি ছেলেকে গেঞ্জি খুলে ফেলে দিতে বলেন। গেঞ্জি খোলার পরও পিয়াসের শরীরে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছিল। এক পর্যায়ে সেখানেই সে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, ছেলের রুমে প্রবেশের জন্য দরজা খোলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। দরজায় অটো লক ছিল। যা বাইরে থেকে খোলা কঠিন। তিনি ফায়ার এক্সটিংগুইশার দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরে ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি ইউনিট আধা ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। কিন্তু ততক্ষণে আর বাঁচানো যায়নি পিয়াসকে।
নিহত পিয়াস একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ শেষে ব্যবসা করছিল। প্রোভেন্স লিমিটেড নামে তার একটি কোম্পানি রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সিসি ক্যামেরাসহ ইলেক্ট্রিক্যাল বিভিন্ন যন্ত্রপাতি আমদানি ও বিক্রির ব্যবসা করত। বাসায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পিয়াসের কক্ষসহ বাসার প্রতিটি আসবাবপত্র পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। ছেলেটির রুমে পোড়ার মতো কোনো কিছু অবশিষ্ট নাই।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা রাসেল সিকদার বলেন, ‘ভোর রাত সাড়ে ৪টার দিকে তারা আফতাবনগর বি ব্লকের তিন নম্বর সড়কের ৪৪ এবং ৪৬ নম্বর বাড়িতে আগুন লাগার খবর পান। তাদের পাঁচটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ১১ তলা বাড়ির ১০ তলার ঐ ফ্ল্যাটের আগুন নেভায়। রুম হিটার থেকে আগুনের সূত্রপাত।’
আগুনে নান্নুর ছেলের মৃত্যুর খবরে দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও ক্রাইম রিপোর্টাররা গতকাল হাসপাতালে ছুটে যান। পিয়াসের লাশ দেখে তাদের কান্নায় সেখানে হূদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। নান্নু-শাহীনা আহমেদ পল্লবী দম্পতির একমাত্র ছেলে পিয়াসের মৃত্যুতে কোনো কিছুতেই সান্ত্বনা দিতে পারছিলেন না স্বজনরা।
পিয়াসের মৃত্যুতে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ ও সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ চৌধুরী এবং বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) সভাপতি আবুল খায়ের ও সাধারণ সম্পাদক দীপু সারোয়ার গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ এবং মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন।
