ইরানের সবচেয়ে প্রভাবশালী সেনা কমান্ডার কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সৃষ্ট উত্তেজনায় বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগ শুরু হয়েছে। ইরান চরম প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছে।
দেশের বাইরে ইরান যে তার সামরিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে চলেছে তার পেছনে মূল ব্যক্তি ছিলেন এই কাসেম সোলেইমানি। লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেনের মতো দেশে তেহরানপন্থি যে শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো এখন শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, তিনিই ছিলেন এর রূপকার। এ কারণে বহুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের এক নম্বর টার্গেট ছিলেন সোলেইমানি।
বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ বুশ এবং তারপর বারাক ওবামা পর্যন্ত তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেও পরিণতির কথা ভেবে পরে পিছিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু হঠাত্ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন তাকে হত্যার পদক্ষেপ নিলেন? পেন্টাগনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়েছে, সোলেইমানি ইরাকে মার্কিন কূটনীতিক এবং সেনাদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করছিলেন, সুতরাং আগে থেকেই তাকে হত্যা করে সেসব পরিকল্পনা নস্যাত্ করা হলো। তবে এমন সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই হত্যাকাণ্ড ঘটালেন যখন তিনি মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হয়েছেন এবং এক বছরের কম সময়ের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন।
বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা তার এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি দেখতে শুরু করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানের সাংবাদিক জুলিয়ান বার্গারের মতে, নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে সোলেইমানিকে হত্যার এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার ঘটনা বারাক ওবামার দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের প্রচারণায় প্রধান একটি বিষয় হয়ে উঠেছিল, ট্রাম্প হয়তো সেরকমই কিছু করতে চেয়েছেন। বিবিসির মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সম্পাদক জেরেমি বোয়েনের মতে, হয়তো ট্রাম্প মনে করেছেন, এই হত্যাকাণ্ডের যে ঝুঁকির মাত্রা তার চেয়ে সুবিধার পাল্লা ভারি। অব্যাহত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় ইরান দুর্বল ও একঘরে হয়ে পড়েছে। এ কারণে ইরান বড়ো কোনো হুমকি তৈরি করতে পারবে না।
তবে বাস্তবে এমনটা হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বিবিসির জেরেমি বোয়েন। তার মতে, কূটকৌশল বা পরিকল্পনাকারী হিসেবে সোলেইমানি ছিলেন খুবই ক্ষুরধার। সুতরাং তাকে কখনো হত্যা করা হলে, কী করতে হবে তেমন পরিকল্পনাও হয়তো তিনিই করে গেছেন। ইরান যে তার হত্যার একটা জবাব দেবে, তা নিশ্চিত।
ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যেতে পারে, এই শঙ্কা গত বছরখানেক ধরে চলছিল। কিন্তু সেই সঙ্গে যুদ্ধ এড়ানোর একটা চেষ্টাও ছিল। ফ্রান্স এই দুই বৈরী দেশের একটা মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করছিল। বিবিসির প্রধান আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা লিস ডুসেট মনে করছেন, সোলেইমানি এবং ইরাকি শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীর প্রধান আবু মাহদি আল মোহানদিসকে হত্যার পর যুদ্ধ এড়ানোর সেই চেষ্টা ধসে পড়বে।
কিন্তু কীভাবে ইরান প্রতিশোধ নেবে—সেটা অনুমান করা কঠিন। লিস ডুসেট মনে করেন, প্রতিশোধ নেওয়ার নানা রাস্তা এবং উপায় ইরানের রয়েছে। ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক একজন সদস্য কার্সটেন ফনটেনরোজকে উদ্ধৃত করে গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, ইরানের এই প্রতিশোধ হয়তো দীর্ঘমেয়াদি এবং নানামুখী হবে। তিনি বলছেন, ইরাকে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়ারা হয়তো তাত্ক্ষণিকভাবে কিছু হামলা চালাবে, কিন্তু ইরান হয়তো উপযুক্ত সময় এবং স্থানের জন্য অপেক্ষা করবে। ইরাকে অবস্থানরত পাঁচ হাজার মার্কিন সেনা স্পষ্ট সম্ভাব্য টার্গেট।
তিনি বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় এমনকি পশ্চিম আফ্রিকা বা দক্ষিণ আমেরিকাতেও মার্কিন স্বার্থ এবং নাগরিকরা হামলার মুখে পড়তে পারে এবং এই ঘটনা বছরের পর বছর ধরে চলতে পারে। ইরান এমন একটি বার্তা দিতে চাইবে যে মার্কিনিরা কোথাও নিরাপদ নয়।
নিউ ইয়র্ক ম্যাগাজিনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের ‘প্রক্সিরা’ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরব থেকে ইসরায়েলে হামলা চালাতে পারে। ওবামা প্রশাসনের সময় হোয়াইট হাউজের মধ্য প্রাচ্যবিষয়ক সমন্বয়ক ফিলিপ গর্ডন বলেন, এই হত্যা ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রকারের যুদ্ধের ঘোষণা।
