নীতি-আদর্শ নিয়ে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২০, ২২:৩১

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমি ছাত্রলীগের হাতে কাগজ ও কলম তুলে দিয়েছিলাম, আর খালেদা জিয়া ছাত্রদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছিলেন ক্ষমতায় টিকে থাকতে। জিয়া-এরশাদ-খালেদা জিয়া—সবাই ছাত্রদের হাতে অস্ত্র, অর্থ তুলে দিয়ে অবৈধ ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে তাদের লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করেছে; কিন্তু আমরা চাই, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা নীতি-আদর্শ নিয়ে নিজেদের গড়ে তুলবে, তাদের জনগণের আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করতে হবে।’

গতকাল শনিবার রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘গৌরব, ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও সাফল্যের ৭২ বছর’ শীর্ষক ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সততা, নিষ্ঠা ও নীতি নিয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নিজেদেরকে গড়ে তুলতে হবে। কারণ সততা-নীতি ও আদর্শ ছাড়া কোনো নেতা গড়ে উঠে না। সততা-আদর্শ ছাড়া সফলতা আসবে না। তিনি বলেন, দেশের যে কোনো ক্রান্তিলগ্নে ছাত্রলীগ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। সারাদেশে একটা সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগের যে ঐতিহ্য ও অবদান রয়েছে, সেটা প্রতিটি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীর মনে রাখা উচিত। সেটা মনে রেখেই ছাত্রলীগের একজন কর্মী হিসেবে তাদের আচরণ, কথাবার্তা ও রাজনীতি সেভাবেই করা উচিত, যাতে এ সংগঠন মর্যাদাপূর্ণ হয় এবং দেশ ও জাতির কাছে আস্থা অর্জন করে চলতে পারে।

শেখ হাসিনা বলেন, ছাত্ররাই আমাদের ভবিষ্যত্। আগামীতে তারাই দেশের নেতৃত্ব দেবে। আমরা চাই না কোনো ছাত্র আর কোনো দিন বিপথে চালিত হোক। আমি চাই, ছাত্রলীগ যেন সবসময় নীতি বজায় রেখে রাজনীতি করে। জাতির পিতার স্বপ্নের বাংলাদেশকে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ছাত্রলীগকে কাজ করে যেতে হবে।

ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়ের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টচার্যের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ১৯৬৮-৬৯ সালে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকারী প্রবীণ নেতা খালেদ মোহাম্মদ আলী, ৬৯-৭০ সালে ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালনকারী, তত্কালীন ডাকসু ভিপি জননেতা তোফায়েল আহমেদ এবং ৭৫ পরবর্তী চরম দুঃসময়ে ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালনকারী বর্তমানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ছাত্রলীগের নেতৃত্বদানকারী সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। তাদের সবাইকে পরিচয় করিয়ে দেন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমানে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক। তবে শুদ্ধি অভিযানের সময় নানা বিতর্কে জড়িত থাকায় অব্যাহতিপ্রাপ্ত সদ্য সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানীকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, এমনকি তাদের পরিচয়ও করিয়ে দেওয়া হয়নি। অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগের সাংস্কৃতিক উপ-কমিটির উদ্যোগে পরিবেশিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২০ সাল আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সালের ৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন করছে। এই বছরের ১৭ মার্চ জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী আমরা পালন করব। ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত এক বছর আমরা ‘মুজিববর্ষ’ ঘোষণা করেছি। ছাত্রলীগ হচ্ছে জাতির পিতার হাতে গড়া সংগঠন। বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলার। একমাত্র আওয়ামী লীগই যে পারে, ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে, তা আমরা জাতির সামনে প্রমাণ করেছি। তাই ছাত্রলীগকে সেভাবেই নিজেদের গড়ে তুলতে হবে, কাজ করে যেতে হবে।

এ সময় যারা রাজনৈতিক নেতা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করেন, স্বপ্ন দেখেন—তাদের প্রত্যেকেরই বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ পড়া উচিত মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের প্রথম প্রতিবাদ এই ছাত্রলীগের ছেলেরাই করেছিল। ছাত্র ইউনিয়নসহ আরো কিছু সংগঠন একসঙ্গে প্রতিবাদ করে। সেই সময় আমরা দুই বোন শরণার্থী হিসেবে বিদেশে ছিলাম, আমাদেরকে দেশে ফিরে আসতে দেওয়ার দাবিও ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে করা হয়। তাই সারা বাংলাদেশে একটা সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগের যে ঐতিহ্য ও অবদান সেটা প্রতিটি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীর মনে রাখা উচিত।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, বঙ্গবন্ধু যেদিন ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেদিনই বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ তিনি বপন করেছিলেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু বলতেন ছাত্রলীগ হচ্ছে আমার অগ্রগামী রাজনৈতিক সৈনিকদের সংগঠন। বঙ্গবন্ধু তার অনেক না বলা কথা ছাত্রলীগকে দিয়ে বলাতেন। 

ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে হবে : কাদের

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ছাত্রলীগ আমাদের শৈশবের ভালোবাসা, কৈশোরের উচ্ছ্বাস, যৌবনের প্রেম। এই মিলনমেলায় দাঁড়িয়ে আজ বারবার মনে পড়ছে—বঙ্গবন্ধুর সব সাফল্যের কেমিস্ট্রি কী ছিল? সেই কেমিস্ট্রি ছিল সাহস। বঙ্গবন্ধুকন্যার রসায়ন হলো, সাহস ও সততা। সংগঠনের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমাদের সেই ছাত্রলীগ কর্মীর প্রয়োজন নেই, যে আবরার হত্যায় জড়িত। সেই ছাত্রলীগ কর্মীর প্রয়োজন নেই, রাজশাহীতে অধ্যক্ষকে অপমান করে যে। ছাত্রলীগের হারিয়ে যাওয়া ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ছাত্রলীগের শ্রদ্ধা

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে শনিবার সকাল ৭টায় ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে রক্ষিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ। এরপর সকাল ৮টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে কেক কাটা হয়। এর আগে সকাল সাড়ে ৬টায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সব সাংগঠনিক কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। পরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন নেতাকর্মীরা।

এছাড়া প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আগামীকাল ৬ জানুয়ারি সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলাসংলগ্ন বটতলায় স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি, ৭ জানুয়ারি সকাল ১০টায় শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, বিকাল ৪টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বরে শীতবস্ত্র বিতরণ কর্মসূচি পালন করবে ছাত্রলীগ।