মো. আমিরুজ্জামান
পানি সমুদ্রের মতো নীল নয়, নেই সাগরের উত্তাল ঢেউ, নিম্নচাপের প্রভাবে গর্জে ওঠে না এটি, ভয় নেই জলোচ্ছ্বাসেরও। এরপরও এর নাম সাগর, নীলসাগর। অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে নীলফামারীর ‘নীলসাগর’। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ও অতিথি পাখির কিচিরমিচির শব্দ শুনতে বিভিন্ন স্থান থেকে এখানে ছুটি আসছেন নানা বয়সের দর্শনার্থী। প্রকৃতির শ্বাসত অপরূপ সৌন্দর্যের এই বিনোদন কেন্দ্রটিকে পর্যটন বিভাগের আওতায় আনার দাবি এলাকাবাসীর।
নীলফামারী শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে গোড়গ্রাম ইউনিয়নের ধোপাডাঙ্গায় অবস্থিত নীলসাগর। উত্তর-দক্ষিণে লম্বা এ দীঘিকে ঘিরে রয়েছে বহু উপাখ্যান ও রূপকথা। কথিত আছে, তত্কালীন বিরাট রাজা নামে এক রাজার বসবাস ছিল এখানে। তার বিপুলসংখ্যক গবাদিপশু ছিল। এ গবাদিপশুগুলোকে গোসল ও পানি খাওয়ানোর জন্য একটি দীঘি খনন করেন। রাজার নামানুসারের দীঘির নামকরণ করা হয় বিরাট দীঘি। কালের বিবর্তনে বিরাট দীঘি বিন্নাদীঘি নাম ধারণ করে। ১৯৯৮ সালে এ দীঘির নামকরণ নীলফামারীর নামানুসারে নীলসাগর রাখা হয়।
শীত মৌসুমে সুদূর সাইবেরিয়া থেকে হাজার হাজার অতিথি পাখির আগমন ঘটে নীলসাগরে। এ সময় পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে নীলসাগর। পাখির কিচিরমিচির আর পানিতে ডানা ঝাপটানোর শব্দ নির্জনতা ভেঙে দেয়। সবুজ বৃক্ষরাজিতে চারদিক শোভিত এই নীলসাগরে অতিথি পাখি নৈসর্গিক সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে তোলে। এ সৌন্দর্য উপভোগ করতে বিভিন্ন এলাকা থেকে আগমন ঘটে অনেক দর্শনার্থীর।
পাখি ও পরিবেশ সুরক্ষায় কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেতুবন্ধনের প্রতিষ্ঠাতা আলমগীর হোসেন জানান, প্রতিবছরের ন্যায় এবারো পরিযায়ীরা এসেছে। তারা মার্চের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত থাকবে। অতিথি পাখিদের মধ্যে অন্তত ৬৫টি প্রজাতির পাখি রয়েছে। ৪ মাস অতিথি পাখিদের নিরাপদে রাখতে হবে। তিনি আরো জানান, সেতুবন্ধন সংগঠনের তরুণ সদস্যরা অতিথি পাখিদের আস্তানাসহ বিভিন্ন স্থানে সচেতনতামূলক বিলবোর্ড স্থাপন করে।
নীলফামারী জেলা প্রশাসক নাজিয়া শিরিন জানান, শীতের শুরু থেকে নীলসাগরসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে অতিথি পাখিরা এসে ভিড় করেছে। অতিথি পাখিদের যাতে কেউ শিকার করতে না পারে এ জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে।
জনশ্রুতি
জনশ্রুতি রয়েছে, ১৯৯৩ সালে সংস্কারের সময় দীঘির তলদেশে পাওয়া গিয়েছিল স্বর্ণ, রৌপ্য এবং কষ্টি পাথরের মূল্যবান মূর্তি। তবে মজার ব্যাপার হলো, মাটির তলদেশে মন্দিরের অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও সেখানে বাস করতো বিশাল আকৃতির দুটি মাছ। ডুবুরিরা এই মন্দিরের ভেতরে যেতে পারেননি। কারণ তাদের নাকি অলৌকিকভাবে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছিল। কথিত আছে, এক সময় নাকি নীলসাগরের পানি শুকানোর জন্য অনেকগুলো মেশিন বসানো হয়েছিল। কিন্ত পানির উচ্চতার কোনো পরিবর্তন হয়নি। লোকমুখে শোনা যায়, অতীতে গ্রামের লোকজন বিন্নাদীঘির পানিতে গাভীর প্রথম দুধ উত্সর্গ করতেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই দুধ চক্রাকারে ঘুর্ণায়মান অবস্থায় দীঘির মাঝখানে চলে যেত। তাদের বিশ্বাস ছিল, এতে গাভীর দুধ বেশি হবে এবং অনিষ্টকারীর দৃষ্টি থেকে গাভীটি রক্ষা পাবে। সত্য-মিথ্যা যাই হোক, দিনদিন মানুষের আনাগোনা বৃদ্ধি এবং জনপ্রিয়তা বাড়ায় উন্নয়নের ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে নীলসাগরে। এ ব্যাপারে নীলফামারী জেলা প্রশাসক কার্যালয় সূত্র জানায়, ১৯৯৮-২০০১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে নেওয়া প্রকল্পে ৮০ লাখ ৫ হাজার টাকা ব্যয়ে নীলসাগরের ভূমি উন্নয়ন, সীমানা প্রাচীর, আরসিসি বেঞ্চ, গার্ড শেড, রেস্ট হাউস, টিনসেড ঘরসহ সেড, নলকূপ, অভ্যন্তরীণ সড়ক, পার্কিং এলাকা, আসবাবপত্র, ক্রোকারিজ, বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা, মত্স্য চাষ ও পরিচর্যাসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়েছে।
যাতায়াত ও থাকা-খাওয়া
ঢাকা ছাড়াও দূরবর্তী স্থান থেকে বিভিন্ন পরিবহনের বাস বা রেলওয়ের নীলসাগর আন্তঃনগর ট্রেনে করে নীলফামারী শহরে এসে পৌঁছানোর পর স্থানীয় পরিবহনে নীলসাগরে যাওয়া যায়। নীলফামারী শহর থেকে দেবীগঞ্জগামী বাস ছাড়াও রিকশা-ভ্যান, মাইক্রোবাস ও মোটর সাইকেলে করে অনায়াসে যাওয়া যায় নীলসাগরে। এখানে রাতযাপনের জন্য রেস্ট হাউস রয়েছে। জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিয়ে ভাড়া নেওয়া যায় নীলসাগরের রেস্ট হাউস। এছাড়া জেলা সদরে রেস্ট হাউসসহ বিভিন্ন হোটেল রয়েছে।
