মধ্যপ্রাচ্যে কি আরেকটা সংঘাত আসন্ন!

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২০, ২১:৪৮

মো. শহীদুল ইসলাম

ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরান-সমর্থিত একদল মিলিশিয়ার রকেট হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের দুই জন ঠিকদার নিহত হন। আর তখনই এর পালটা প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ঘোষণা অনুযায়ী উক্ত গ্রুপের ওপর বিমান হামলা চালিয়ে প্রায় ২৭ জন সদস্যকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। তারপরই শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভ। বাগদাদে যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষিত দূতাবাসের সামনে ব্যাপক বিক্ষোভ চালানো শুরু হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা দূতাবাসে হামলা চালায়। বিক্ষোভে ইরানের মদত রয়েছে বলে বারবার অভিযোগ করে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। তাছাড়া ঠিকাদার নিহত হওয়ার ঘটনায় ইরানের হাত রয়েছে বলেছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং এর সমূচিত জবাব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছিল দেশটি। কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার মাধ্যমে কি যুক্তরাষ্ট্র সেই ঘোষণারই বাস্তবায়ন করল?

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের শুরু যদি আমরা খুঁজতে যাই, তাহলে আরো একটু পেছনে যেতে হবে। ১৯৭৯ সালে ইমাম খোমেনির নেতৃত্ব যে ইসলামি বিপ্লব হয়েছিল আর ঐ বিপ্লবের ফলে ক্ষমতা হারিয়ে দেশচ্যুত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত শাসক রেজা শাহ পাহলবি। আর বিপ্লবের পর একদল বিক্ষোভকারী তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে হামলা চালায়। আর এ ঘটনার কারণে উভয় দেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। মূলত সংঘাতের শুরু হয় ঐখান থেকে।

যু্ক্তরাষ্ট্র তখন থেকে ইরানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকমের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে শুরু করে। তাদের মিত্র হিসেবে পাশে পেতে শুরু করে আরেক আঞ্চলিক শক্তি সৌদি আরবকে। আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা জরুরি, সৌদি আরব ও ইরান উভয়েই মুসলিম প্রধান দেশ হলেও তাদের মধ্যে শিয়া-সুন্নির দ্বন্দ্ব রয়েছে। শিয়াপ্রধান ইরান এবং সুন্নিপ্রধান সৌদি আরবের মধ্যে আদর্শগত দ্বন্দ্ব ইরানে বিপ্লবের আগ পর্যন্ত তেমন প্রকট  আকার ধারণ করেনি।

কিন্তু বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে দেশ দুটির মধ্যে যে আঞ্চলিক সংঘাত, এর পূর্ণ ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র। আর এই সুযোগে ইসরাইলও নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রকে নিষেধাজ্ঞা আরোপে উত্সাহিত করে।  

২০১৫ সালে ছয় পরাশক্তির সঙ্গে ইরানের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির আগ পর্যন্ত প্রায় চার দশকব্যাপী ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপিত ছিল। ইসরাইল ও সৌদি আরব শুরু থেকেই এই চুক্তির বিরোধিতা করে আসছিল। যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনের সময়েই ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছিলেন। অবশেষে ২০১৮ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করেন। মূলত এ ঘটনার পরই দেশ দুটির মধ্য উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় প্রকট আকার ধারণ করে। কাসেম সোলেইমানি  নিহত হওয়ার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাবেদ জারিফ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে টুইট করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে এর মূল্য দিতে হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি জেনারেল সোলেইমানিকে শহিদ হিসেবে উল্লেখ করছেন এবং তাকে হত্যার সঙ্গে জড়িতদের কড়া জবাব দেওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করছেন।

সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশেই তাকে উদ্দেশ করে হামলা চালানো হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য এটি একটি বড়ো সাফল্য। নিঃসন্দেহে তিনি এই পুঁজিকে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কাজে লাগাবেন। ইরানের জন্য সুলাইমানির মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ জেনারেলের মৃত্যুর ঘটনার ফলাফল যে আরো সংঘাতের জন্ম দেবে, এটা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সংঘাতে জর্জরিত মধ্যপ্রাচ্যে যদি আরো একটি সংঘাতের সূত্রপাত হয়, তা অনেক বেশি বিপর্যয় নেমে আসবে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হবে। যে কোনো সংঘাতই প্রাণহানি ঘটায়। সুতরাং, সব দিক বিবেচনা করে উভয় দেশকেই অনেক সংযত হতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো সংঘাত সমগ্র অঞ্চলের ওপরই প্রভাব ফেলবে। শহরে আগুন লাগলে দেবালয় কি রক্ষা পায়? এমন অবস্থায় দাঁড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেরই উভয় পক্ষের মধ্য দ্বন্দ্ব নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে যে কোনো সংঘাত পুরো অঞ্চলের তো বটেই, বিশ্বব্যাপীই সংঘাত সৃষ্টি করবে না তো?

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়