রোকসানা সুইটি
সবাই চায় তার সন্তান শিক্ষিত হয়ে মানুষের মতো মানুষ হবে। আসলেই কি সবাই তা হতে পারে? আমার মতে শিক্ষিত হওয়া এক জিনিস আর মানুষ হওয়া আরেক জিনিস। শিক্ষিত হওয়া খুবই সহজ। তবে মানুষ হওয়া খুবই কঠিন। ভালোভাবে পড়াশোনা করে সার্টিফিকেট পেলেই তো আমরা তাকে শিক্ষিত হিসেবে ধরে নিই। যে যত বড়ো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা শেষ করে সার্টিফিকেট পাবে, সে তত শিক্ষিত মানুষ হিসেবে জানি।
তাদের সবাই কি আসলে শিক্ষিত হতে পারে? তাদের শিক্ষাটাকে কি আসলেই তারা ব্যক্তিগত জীবনে কাজে লাগাতে পারে? যদি পেরেই থাকে, তাহলে কেন জরিপে দেখা যায় যে সমাজে শিক্ষিত পরিবারগুলোতে ডিভোর্সের হার এত বেশি? শিক্ষিত পরিবারগুলোর মধ্যে কেন এখনো নারী নির্যাতিত হয়? এখনো কেন কন্যাসন্তান জন্ম নিলে অনেকে সব দোষ মায়ের উপর ফেলতে দ্বিধা করে না। ঘরে কাজ করে যে মেয়েটি, সে কেন তুচ্ছ কারণে নির্যাতিত হয়? তাও আবার কোনো কোনো উচ্চশিক্ষিত পরিবারে? বর্তমানের জরিপে দেখা যায় যে বড়ো বড়ো চাকরিজীবী ঘুষ নামক দুর্নীতিতে এমনভাবে লিপ্ত যে তাদের বেতনের চেয়েও ঘুষের পরিমাণ এত বেশি হয়ে থাকে, যার হিসাব তাদেরও হয়তো জানা নেই। তাদের কী নামে ভূষিত করব ভেবে পাই না। তাদের সবাই উচ্চশিক্ষিতই বটে।
বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে ঘুরে এলে আমরা দেখি সেখানকার বেশির ভাগ বাবা-মায়ের সন্তান উচ্চশিক্ষিত। তারাও তাদের সেরাটা দিয়েই সন্তানকে বড়ো করেছেন। কিন্তু কতটুকু তাদের ‘মানুষ’ করতে পেরেছেন তা তো ভেবে দেখার বিষয়। সবাই কি মানুষ হতে পারে? তাদের কেউ কেউ শুধুই শিক্ষিত মানুষ। প্রকৃত শিক্ষা তাদের আচরণে বোঝা যায়। তাদের মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ যদি কাজ না করে, তাহলে তো তাদের পশু হিসেবে গণ্য করা যায়।
কিছুদিন আগে বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাকে যারা হত্যা করেছে, তারাও সেই বুয়েটেরই শিক্ষার্থী। কতটা মেধা থাকলে বুয়েটে পড়াশোনা করার সুযোগ পায় তা আমাদের সবারই জানা। তাকে যারা হত্যা করেছে, তারাও তো আবরারের মতোই মেধাবী। এখানে একটি মাত্র উদাহরণ দিলাম। এরকম ঘটনা আমাদের দেশে এই প্রথম তা কিন্তু নয়।
শুধু সার্টিফিকেট থাকলেই সব মানুষ শিক্ষিত হয় না। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। কারণ মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্ব, বিবেকবোধ, ব্যক্তিত্ব সৃষ্টিকর্তা দিয়েছেন, যেন তারা তা কাজে লাগাতে পারে। এর কোনো একটির কমতি হলেই কিন্তু তাকে আর ‘মানুষ’ বলা যাবে না। সে যত বড় শিক্ষিতই হোক না কেন।
আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কথা চিন্তা করলে দেখব যে তারা কতটুকু মানুষ হতে পারবে তা নিয়ে অভিভাবকেরা কতটুকু সচেতন হয়েছেন! তা ভাবনার বিষয়। ধরা যাক, তাদের অভিভাবকেরা সচেতন। কারণ কোনো বাবা-মা চান না তার সন্তান খুনি বা সন্ত্রাসী হোক।
বর্তমানে প্রতিযোগিতার এই যুগে বাবা-মায়েরা পড়াশোনার জন্য তাদের যেভাবে পথ দেখান বা চাপ প্রয়োগ করেন, সেভাবে কি সব বাবা-মা সন্তান মানুষ হওয়ার জন্য কী কী করা উচিত তা কি তারা করে থাকেন? আমি মনে করি ধর্মীয় ও পারিবারিক শিক্ষাই পারে তাদের সঠিক পথের সন্ধান দিতে। সে যে ধর্মেরই হোক না কেন।
কোনো ধর্মেই ভুল পথে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া নেই। যার যার ধর্মকে তারা যদি আঁকড়ে ধরে রাখে, তাহলে কেউই ভুল পথে যাবে না এবং পারিবারিক সম্পর্কগুলো যদি বন্ধুসুলভ হয়, তবে সেই পরিবারের সন্তানদের হয়তো খারাপ হওয়ার সুযোগ কম থাকবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বলব, সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত মানুষ না হয়ে আমরা ‘মানুষ’ হতে চেষ্টা করব। শুধু শিক্ষিত হলেই সব ক্ষেত্রে মানুষ তাকে বলা যাবে না। তবেই তো আমাদের সমাজ হবে মনুষ্য বসবাসের উপযোগী। যে সন্তানেরা উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেট পাওয়ার পর নিজের দরিদ্র বাবা-মায়ের পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করে, বাবা-মাকে সবার সামনে আনতে তাদের কারো কারো বিবেক বাধা দেয়, সে কি আসলেই শিক্ষিত মানুষ?
n লেখক :সাবেক শিক্ষার্থী,
নোয়াখালী সরকারি মহিলা কলেজ
