কোটি কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ ভুঁইফোঁড় এনজিওর

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২০, ২১:৫৯

সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধভাবে গ্রাহকদের প্রায় ১০ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করেছে আল-কারীম ফাউন্ডেশন নামের একটি ভূঁইফোড় এনজিও। বিভিন্ন মসজিদের ঈমাম-মুয়াজ্জিনদের সামনে রেখে ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে এই বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ ও জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ওই  প্রতিষ্ঠান থেকে পাঁচ কর্মকর্তাকে আটক করেছে। এদের মধ্যে আছেন শ্যামনগর উপজেলার কৈখালি গ্রামের আব্দুল গফুরের ছেলে রহমতউল্লাহ, সহকারি হিসাব রক্ষক কর্মকর্তা আব্দুল খালেক এবং সদর উপজেলা জামে মসজিদের ইমাম ইহসানুর রহমান। গ্রাহকের কাছ থেকে বেশি টাকা আদায়কারি সদর উপজেলা জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন বেলাল হোসেন পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যান।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক, সমবায় অধিদপ্তর, এমনকি সমাজসেবা অধিদপ্তরের কোনো অনুমতি না নিয়েই কোটি কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করছে এই এনজিও। বিষয়টি জানার পর টাকা লগ্নিকারি গ্রাহকরা আশংকা করছেন তাদের কষ্টার্জিত অর্থ নিয়ে যেকোন মুহুর্তে উধাও হয়ে যেতে পারে প্রতিষ্ঠানের লোকজন। কোটি কোটি টাকা আমানত নিলেও গ্রাহক সন্তুষ্টির জন্য সামান্য কিছু ঋনও প্রদান করে মানুষের বিশ্বাস ধরে রাখে প্রতিষ্ঠানটি।

গ্রাহকরা জানান, প্রতিষ্ঠানটির মূল দায়িত্বে রয়েছেন যশোরের আলহাজ্ব সাজ্জাদ হোসেন নামের এক ব্যক্তি। প্রথমে তারা তেমন কোনো সাড়া না পেলেও সাতটি উপজেলায় ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের মাঠকর্মী নিয়োগ দিয়ে গ্রাহককে উচ্চ মুনাফার লোভ দেখিয়ে আমানাত সংগ্রহ শুরু করে। ঈমাম-মুয়াজ্জিনদের দেখে সাধারন মানুষ সহজেই তাদের বিশ্বাস করে টাকা আমানত করতে শুরু করে। মানুষ সাড়া দিচ্ছে দেখে সাতটি উপজেলায় ৫০ জন মাঠকর্মী নিয়োগ দেয়া হয়।

গ্রাহকদের অভিযোগ, আল—কারীম ফাউন্ডেশনের নামে সাতক্ষীরার কোনও ব্যাংকে হিসাব নেই। আছে তার চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত নামে যশোরে। প্রতিদিন যে টাকা আদায় হয় তা চেয়ারম্যানের ওই একাউন্টে পাঠাতে হয়। কোনো গ্রাহক সঞ্চয়ের টাকা বা কোনো ঋন চাইলে চেয়ারম্যান যশোর থেকে তার প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা ম্যানেজারের ব্যক্তিগত একাউন্টে চাহিদার অর্ধেক টাকা পাঠান। সদর উপজেলা পরিষদ জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন বেলাল হোসেন একাই সংগ্রহ করেছেন প্রায় আড়াই কোটি টাকা।

শ্যামনগর উপজেলার দাউদ গাজীর ছেলে আইয়ুব গাজী জানান, তিনি প্রায় আড়াই লাখ টাকা আমানত রেখেছেন এই এনজিওতে। এর বিপরীতে মাত্র ৫০ হাজার টাকা লোন পেয়েছেন। বাকী টাকা চাইতে গেলে বেলাল হোসেন বলেন ‘আপনি ৫ লাখ টাকা ঋন নিয়েছেন।  বাকী টাকা পরিশোধ করুন অন্যথায় আপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এভাবে তারা গ্রাহকদের সাথে প্রতারনা করে চলেছে।’ আল-কারীম ফাউন্ডেশনের জেলা কর্মকর্তা রহমত উল্লাহ জানান, তাদের গ্রাহক সংখ্যা ৮ হাজার ৫০০ জন। এর মধ্যে সাধারন গ্রাহকের টাকা আছে ৩ কোটি ৬৩ টাকা ও এফডিআর আছে ২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। কিভাবে এত বিপুল অংকের টাকা লেনদেন করেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পাশ বই ও মানি রিসিটের মাধ্যমে।  সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ছাড়া কিভাবে এত বিপুল  টাকা সংগ্রহ করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, যশোরের সাজ্জাদ সাহেব জানেন।

এ বিষয়ে আল-কারীম ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন মোবাইল ফোনে বলেন, আমি যখন শুরু করি তখন এতো আইন-কানুন দেখা হয়নি। আইনগত সমস্যা থাকলে আমি ২০২০ সালের মধ্যে গ্রাহকের সব টাকা ফেরত দেবো। নিজের একাউন্টে টাকা রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সদুত্তোর দিতে পারেননি।

এ ব্যাপারে জেলা সমবায় কর্মকর্তা হাসান মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া কোনো ভাবেই এ ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান চালানো সম্ভব নয়।  জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক দেবাশীষ সরদার বলেন, সপ্তাহখানেক আগে সমাজসেবা থেকে তারা একটি নিবন্ধন নিয়েছে। তবে ওই নিবন্ধনের আলোকে আমানত সংগ্রহের সুযোগ নেই। এটা সম্পূর্ণ বেআইনী।

এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান জানান, এ ঘটনায় আয়ূব আলী নামের একজন গ্রাহক বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছে। গ্রাহকরা যাতে তাদের টাকা ফেরত পায় সেজন্য অভিযোগ পেলে পুলিশ সার্বিক সহযোগিতা করবে।