আবুল কাসেম ফজলুল হক
দেশ এবং রাষ্ট্র এক নয়। দেশ প্রকৃতির সৃষ্টি, রাষ্ট্র মানুষের। আমাদের রাষ্ট্র না থাকলে কেবল দেশ থাকলে, আমরা কি ভালো থাকব? নিজেদের রাষ্ট্র না থাকলে আমরা কি স্বাধীন থাকব? ১৯৭১ সালে কেন আমরা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিলাম? ছয় দফা আন্দোলনে কেন আমরা যোগ দিয়েছিলাম? কেন আমরা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করেছিলাম? কেন আমরা ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হতে চেয়েছিলাম? বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র রূপে গড়ে তোলার লক্ষ্য বাদ দিয়ে চললে এসব চাওয়া অর্থহীন হয়ে যায়।
ভৌগোলিক বাস্তবতা ও বাঙালি চরিত্র লক্ষ করে ১৯৭৩ সাল থেকেই কোনো কোনো চিন্তাশীল ব্যক্তি বলে আসছেন বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার মতো (viable) নয়। তারা জোর দিয়েছেন বাঙালি চরিত্রের নিকৃষ্টতায়। তাদের যুক্তি ও মত কখনো আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তারা অনেকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় নাগরিকত্ব নিয়েছেন এবং প্রায় সবাই তাদের সন্তানদের ওইসব রাষ্ট্রে নাগরিক করেছেন। আমি সব সময় বাঙালি চরিত্রের উন্নতি সম্ভব বলে মনে করেছি। আমি সব সময় মনে করেছি এবং এখনো মনে করি, বাংলাদেশকে অবশ্যই বাংলাদেশের জনগণের প্রগতিশীল রাষ্ট্র রূপে গড়ে তোলা যাবে। সে লক্ষ্যেই আমাদের চিন্তা ও কাজ। জাতীয় হীনতাবোধ বাংলাদেশের ধনী গরিব, শিক্ষিত শিক্ষাবঞ্চিত ক্ষমতাবান ক্ষমতাবঞ্চিত সব মানুষকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। জনসাধারণ ঘুমন্ত।
নবচেতনা ও নবউত্থান
এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নতুন রেনেসাঁস ও তার ধারাবাহিকতার নতুন গণজাগরণ সৃষ্টি করে, সেই সঙ্গে উন্নত চরিত্রের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সৃষ্টি করে, বাংলাদেশের জনগণ অবশ্যই বাংলাদেশকে নিজেদের প্রগতিশীল রাষ্ট্র রূপে গড়ে তুলতে পারবে। জনগণ ঘুমিয়ে আছে বটে তবে জাগবে। অভীষ্ট নেতৃত্বের জন্য অবশ্যই উন্নত চরিত্রের রাজনৈতিক দল গড়ে তুলতে হবে। বর্তমান দলগুলোও চাইলে তাদের রাজনৈতিক চরিত্র উন্নত করতে পারে। নেতৃত্বের জন্য রাজনৈতিক দল অপরিহার্য। দলের চরিত্রই নেতৃত্বের চরিত্র। উন্নত চরিত্রের বৌদ্ধিক নেতৃত্বও লাগবে। রাষ্ট্র গঠনের ও রাষ্ট্রীয় উন্নতির সঙ্গে রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত ও উন্নত করার সার্বিক আয়োজন লাগবে। রাজনীতির উন্নতির জন্য বাংলা ভাষায় উন্নত রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনৈতিক দলে তার অনুশীলন লাগবে। ১৯৮০-র দশকের শুরু থেকে নিঃরাজনীতিকরণের যে প্রক্রিয়া বাংলাদেশে চালানো হচ্ছে তার জায়গায় উন্নত নতুন রাজনীতির সূচনা করতে হবে।
সদর্থক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ব্রিটিশ শাসিত বাঙলার জাগরণ, ইতালির সিনকুয়েসেন্টু, ব্রিটন ও ফ্রান্সের রেনেসাঁস জার্মানির রিফর্মেশন, ফ্রান্সের এনলাইটেনমেন্ট ইত্যাদির নবমূল্যায়ন দরকার। ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯) থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলোপ (১৯৯১) পর্যন্ত কালের গণজাগরণে ও গণআন্দোলনেরও নবমূল্যায়ন দরকার। অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দিতে হবে। ক্লাসিকের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে এবং নতুন ক্লাসিক সৃষ্টি সম্ভব করতে হবে। উন্নত ভবিষ্যত্ সৃষ্টির প্রয়োজনে ইতিহাস থেকে শিক্ষাগ্রহণ অপরিহার্য।
জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজনে শিক্ষা খাতে শর্তযুক্ত সবরকম বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্য পরিহার করতে হবে। প্রচলিত শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার অপরিহার্য। প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যসূচি পাঠক্রম ও পাঠ্যপুস্তক উন্নত করতে হবে। কথিত সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতির জায়গায় অনুসন্ধিত্সামুখী জ্ঞানমুখী পরীক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তন করতে হবে। ইংলিশ ভার্সন বিলুপ্ত করতে হবে। বাংলাদেশে বিদেশি সরকার কর্তৃক পরিচালিত সব স্কুল বন্ধ করতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে বিতর্ক এড়িয়ে চলতে হবে। সর্বজনীন কল্যাণে প্রথমে মূল ধারার বাংলা মাধ্যমের শিক্ষাকে উন্নত করতে হবে। বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটাতে হবে। অনেকে বিশ্বমান অর্জনের কথা বলেন। তারা যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্য প্রভৃতি রাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী কর্মনীতি নির্বিচারে অনুসরণ করে চলার কথা বলেন। এটা ঠিক নয়। উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য ও নীতি বিধি সংস্কার করতে হবে। চলমান শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে জাতি ও রাষ্ট্র গড়ে উঠছে না, উঠবে না।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যত্ নিয়ে ভাববার সময় চলে যাচ্ছে। সময় থাকতে চিন্তা ও কাজ করতে হয়, সময় চলে গেলে সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়। আজকের মূল প্রশ্ন—বাংলাদেশকে আমরা রাষ্ট্র রূপে গড়ে তুলব কি তুলব না। যদি সিদ্ধান্ত হয় গড়ে তুলব তাহলে সময় নষ্ট না করে কাজ আরম্ভ করতে হবে। রাষ্ট্র গঠনের জন্য চেষ্টা লাগবে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাষ্ট্র গঠিত হয় না। বাংলাদেশের জনগণের চেতনায় নিজেদের রাষ্ট্র গঠনের মহান লক্ষ্য দরকার। আমি মনে করি যে অবস্থা চলছে তাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষকদের দায়িত্ব অনেক। জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য নির্ধারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ অগ্রণীর ভূমিতা পালন করতে পারে।
কেউ কেউ বলে থাকেন—এখন বিশ্বায়নের কাল, বাংলাদেশকে রাষ্ট্র রূপে গঠন করা এখন গুরুত্বপূর্ণ নয়। সিভিল সোসাইটি অরগেনাইজেশনগুলো নানা কৌশলে এটা প্রচার করছে। আমার ধারণা এই দৃষ্টিভঙ্গি ও মত বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর। বিশ্বসরকার গঠিত হলেও জাতীয় সরকার থাকবে, বিশ্বসরকার হবে জাতীয় সরকারসমূহের ঊর্ধ্বতন এক সরকার। তার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ থাকবে আন্তঃরাষ্ট্রিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে। তা হবে জাতিসংঘের মতো।
বাংলাদেশকে বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীন রাষ্ট্র রূপে গড়ে তোলার এবং বাংলা ভাষাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা রূপে প্রতিষ্ঠা করার পথে বিরাজিত অন্তরায়গুলো দূর করতে হবে। এর জন্য নতুন সংকল্প দরকার। যারা দ্বৈত নাগরিক, যাদের স্ত্রী অথবা স্বামী অথবা সন্তান দ্বৈত নাগরিক কিংবা বিদেশি নাগরিক, তারা যাতে বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি, উপমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী, উপসচিব থেকে সচিব ইত্যাদি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হতে কিংবা অধিষ্ঠিত থাকতে না পারেন, সংবিধানে তার সুস্পষ্ট বিধান রাখতে হবে। বিধান এমন হবে যে কারো অন্য রাষ্ট্রে গিয়ে নাগরিকত্ব গ্রহণে বাধা থাকবে না; কিন্তু অন্য রাষ্ট্রের নাগরিক হলে (দ্বৈত নাগরিক) কিংবা স্ত্রী বা স্বামী বা সন্তান অন্য রাষ্ট্রের নাগরিক বা দ্বৈত নাগরিক হলে কেউ বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হতে কিংবা অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন না।
‘আদিবাসী’দের চিরকালের জন্য ‘আদিবাসী’ রূপে রাখার সাম্রাজ্যবাদী নীতি পরিহার্য। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় রেড ইন্ডিয়ানদের এবং অস্ট্রেলিয়ায় আদিবাসীদের শত শত বছর ধরে যেভাবে রাখা হয়েছে তা অন্যায় এবং তা গোটা পৃথিবীর আদিবাসীদের কিংবা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীসমূহের জন্য কার্যকর নীতি রূপে থাকা উচিত নয়।
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পর্যায়ে এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরে প্রথম দুই দশকে বাংলা ভাষার উন্নতি এবং রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলা ভাষার প্রচলন অনেকটুকু হয়েছে। কিন্তু ১৯৯১ সাল থেকে বিদেশি সহায়তায় রাজনীতি যে রূপ নিয়েছে, তাতে রাষ্ট্রব্যবস্থায় বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিতকতা বজায় রাখা হয়নি। বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র রূপে এবং বাংলা ভাষাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা রূপে প্রতিষ্ঠা করার প্রশ্নে সিভিল সোসাইটি অরগানাইজেশনগুলোর এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মনোভাব এখন শিথিল। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র—এটাই আর মনে করা হয় না।
রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের এবং রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার বিবেচনা বাদ দিয়ে বাংলা ভাষার পক্ষে যে প্রচারকার্য চালানো হয়, তা গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি ঢালার মতো ব্যাপার। নতুন রেনেসাঁস ও নতুন গণজাগরণের লক্ষ্যে চিন্তা ও কাজের মর্মে দরকার উন্নত চরিত্রবল ও প্রগতিচেতনা। জ্ঞান চর্চার সঙ্গে উন্নত চরিত্রবল ও কর্মমুখিতা না থাকলে রেনেসাঁস ও গণজাগরণ হয় না।
আগেকার রেনেসাঁসের লক্ষ্য ছিল মধ্যযুগের গর্ভ থেকে আধুনিক যুগকে মুক্ত করা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য ও রাজনীতি-অর্থনীতিকে প্রগতির ধারায় বিকশিত করে চলা। এখন নতুন রেনেসাঁসের লক্ষ্য হবে আধুনিক যুগের ভ্রান্তি ও অনাচার থেকে মুক্তি এবং নতুন সভ্যতা ও প্রগতির ধারায় অভিযাত্রা। নতুন রেনেসাঁসের অভাবে চলছে ইতিহাসের পশ্চাদ্গতি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ এবং সকল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগগুলো রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে এবং রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে ও উন্নত করতে চেষ্টা চালালে অবশ্যই জনসমর্থন পাবে এবং এগুলো রক্ষা পাবে ও উন্নত হবে।
দীর্ঘ জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের ও স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে আজ আমাদের কেন্দ্রীয় কর্তব্য স্বাধীন রাষ্ট্র রূপে বাংলাদেশকে গড়ে তোলা, রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করার এবং বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র রূপে গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা জাতীয় মুক্তি ও জনমুক্তির আকাঙ্ক্ষায় রূপ নেবে। মুক্তি মানে পরাধীনতা থেকে মুক্তি, সমস্যা থেকে মুক্তি।
n লেখক :সাবেক অধ্যাপক ও রাষ্ট্র চিন্তক
