পুলিশ সপ্তাহ ২০২০ ও কিছু কথা

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২০, ২১:৪০

এ কে এম শহীদুল হক

এ বছরের ৫ জানুয়ারি থেকে পুলিশ সপ্তাহ শুরু হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মাঠে বার্ষিক পুলিশ কুচকাওয়াজে অভিবাদন গ্রহণ এবং কৃতী অফিসারদের মধ্যে পদক প্রদান শেষে পুলিশ সপ্তাহের শুভ উদ্বোধন করেন।

পুলিশ সপ্তাহ পুলিশের একটি ঐতিহাসিক বার্ষিক অনুষ্ঠান। সব পুলিশ সদস্য বছর শেষে পুলিশ সপ্তাহের অপেক্ষায় থাকে। সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় বেশ কয়েকটি বিষয় থাকে। বার্ষিক পুলিশ কুচকাওয়াজ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ভাষণ, মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সভা, অন্যান্য মন্ত্রীদের সঙ্গে সভা, আইজিপির সঙ্গে একাধিক সভা, পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে সভা ও নির্বাচন, ইত্যাদি ইত্যাদি।

পুলিশ সপ্তাহ মূলত মাঠ পর্যায়ের সব কর্মকর্তা, যেমন—জেলার পুলিশ সুপার, রেঞ্জ ডিআইজি, পুলিশ কমিশনার, বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটের প্রধানগণের সম্মেলন। ঐ সম্মেলনের বিগত বছরের অপরাধচিত্র, ভবিষ্যত্ কর্মকাণ্ড, প্রশাসনিক বিষয়াবলি, সমস্যা, সংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা ও দিক নির্দেশনামূলক সিদ্ধান্ত হয়। যদিও এসব অনুষ্ঠান অনেকটা আনুষ্ঠানিকতা ও গতানুগতিকতার মধ্যে আবদ্ধ থাকে। তবুও পুলিশ সপ্তাহের একটা বিশেষ প্রভাব (impact), কার্যকারিতা এবং প্রয়োজনীয়তা আছে। আইজিপির এখতিয়ারভুক্ত বিষয়গুলোতে আইজিপি সিদ্ধান্ত দেন আর মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়গুলো মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে থাকে।

পুলিশ সদস্যরা প্রতীক্ষা ও প্রত্যাশায় থাকে যে, পুলিশ সপ্তাহে সরকার পুলিশের কিছু দাবিদাওয়া পূরণ করবে অর্থাত্ পুলিশ কিছু পাবে। পদোন্নতি, পদ সৃষ্টি ও স্ট্যাটাস ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি বা প্রত্যাশায় অগ্রাধিকার পায়। অপরপক্ষে অধস্তন সদস্যদের দাবিতে আর্থিক সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত থাকে। সপ্তাহ শেষে যোগ-বিয়োগ কষে হিসাব মিলায়—কী পেল, কী পেল না।

২০১৮ সালের পুলিশ সপ্তাহ থেকে মাঠ পর্যায় থেকে অনেক দাবিদাওয়া এসেছিল। বাছাই কমিটি কর্তৃক কতিপয় দাবি সরকারের কাছে পেশ করার সিদ্ধান্ত হয়।

 যেমন, কোনো সরকারি কর্মচারী চাকরিরত অবস্থায় মারা গেলে এককালীন ৮ লাখ টাকা আর্থিক সাহায্য পান। এটা শুধু প্রশাসন ক্যাডারে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা পান। অন্য কেউ পান না। পুলিশের কোনো সদস্য কর্মরত অবস্থায় মারা গেলে বা দুষ্কৃতকারী কর্তৃক আক্রমণে জীবন হারালে এককালীন ৫ লাখ টাকা আর্থিক সাহায্য পান। অধস্তন সদস্যদের দাবি ছিল প্রশাসনের কর্মরত কর্মচারীদের মধ্যে চাকরিরত কোনো সদস্য মারা গেলে তাকেও ৮ লাখ টাকা এককালীন আর্থিক সহায়তা দেওয়া হোক এবং কর্তব্যরত অবস্থায় মৃত্যু হলে বা দুর্বৃত্ত কর্তৃক নিহত হলে আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি করা হোক।

বর্তমানে ঝুঁকিভাতা কনস্টেবল থেকে সাব-ইন্সপেক্টর/সার্জেন্ট পর্যন্ত পদবির অফিসাররা পেয়ে থাকেন। ইন্সপেক্টর ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা ঝুঁকি ভাতা পাওয়ার দাবি করেছিলেন।

অবসর যাওয়ার পর পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তাদের দুই সদস্যর রেশনের সুবিধা চেয়েছিল। কোনো কোনো বাহিনীতে এ সুবিধা আছে।

বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে এবং দেশে পুলিশের কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্য ও সংশ্লিষ্টতা আছে, এমন বিভাগ বা অধিদপ্তরে ডেপুটেশনে পুলিশ কর্মকর্তাদের পদায়ণের দাবি।

প্রশাসন ক্যাডারে কর্মকর্তারা ডেপুটি সেক্রেটারি হতে তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা গাড়ি কেনার জন্য বিনা সুদে এককালীন ৩০ লাখ টাকা ঋণ পান এবং রক্ষণাবেক্ষণ এর জন্য মাসে ৫০ হাজার টাকা পান। ঐ সুবিধা কেবল প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারাই পেয়ে থাকেন। পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি ছিল এ সুযোগ তাদেরও দেওয়া হোক। ইত্যাদি কতিপয় দাবিদাওয়া।

এসব দাবিদাওয়া বা আবদার নিয়ে আমি যখন সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে সপ্তাহ শুরুর পূর্বে আলোচনা করি তখন ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। তার পরও কিছু কিছু দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।

পরবর্তী পুলিশ সপ্তাহেও একই ধরনের কিছু কিছু দাবি উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু প্রাপ্তি তেমন একটা ছিল না।

পুলিশ সপ্তাহে কী পেলাম, কী পেলাম না—এটা বড়ো কথা নয়। দেশ ও জনগণের প্রতি পুলিশের যে অবশ্যকরণীয় কর্তব্য ও অঙ্গীকার তা কতটুকু পালন করা হচ্ছে তার মূল্যায়ন, কোথায় প্রতিবন্ধকতা তা শনাক্তকরণ এবং কীভাবে পুলিশি সেবা জনগণের প্রত্যাশা মোতাবেক জনগণের কাছে পৌঁছানো যায় সে ব্যাপারে কর্মকৌশল প্রণয়নই পুলিশ সপ্তাহের মুখ্য কাজ। সে কাজটি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা করবেন—এটাই সরকার ও জনগণের প্রত্যাশা।

পুলিশ সপ্তাহের একটি প্রতিপাদ্য থাকা প্রয়োজন। এটা আমিই চালু করেছিলাম ২০১৭ সাল থেকে। ২০১৭ সালের প্রতিপাদ্য ছিল ‘জঙ্গি মাদকের প্রতিকার, বাংলাদেশ পুলিশের অঙ্গীকার’। ২০১৭ সালে এ প্রতিপাদ্যকে ভিত্তি করে পুলিশি কার্যক্রম পরিচালনা করে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালিয়ে জঙ্গি দমন সম্ভব হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধেও ব্যাপক কাজ হয়েছে। ২০২০ সালের পুলিশ সপ্তাহের প্রতিপাদ্য হলো ‘মুজিব বর্ষের অঙ্গীকার, পুলিশ হবে জনতার’। এ প্রতিপাদ্য বা স্লোগান সামনে রেখে পুলিশ জনগণের পুলিশ হবে এটাই লক্ষ্য। কমিউনিটি পুলিশের প্রতিপাদ্য বা স্লোগান হলো ‘পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ’। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের স্লোগান সামনে রেখে পুলিশ জনগণের সঙ্গে সেতুবন্ধ তৈরি করে জনগণের প্রত্যাশা মোতাবেক সেবা প্রদানের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে ২৫ জানুয়ারি রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে পুলিশ সপ্তাহে পুলিশের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘তোমরা ইংরেজের পুলিশ নও, তোমরা পাকিস্তানিদের পুলিশ নও, তোমরা স্বাধীন দেশের পুলিশ, তোমরা জনগণের পুলিশ।’ মুজিব বর্ষ উপলক্ষ্যে পুলিশের সব সদস্যকে জাতির পিতার সেই অমোঘ বাণী শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হবে এবং এ বাণীকে মনে প্রাণে ধারণ করে সেবা প্রক্রিয়ায় তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। শুধু স্লোগানের মধ্যে সেবার কথা সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখাতে হবে। থানায় কোনো সাহায্যপ্রার্থী বা অপরাধের শিকার কেউ গেলে তার সঙ্গে মানবিক আচরণ করতে হবে এবং ত্বরিত গতিতে তাকে আইনগত সাহায্য প্রদান করতে হবে। এজন্য পুলিশ সদস্যদের মন-মানসিকতার পরিবর্তন এনে গণমুখী ও সেবামুখীসম্পন্ন হতে হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০০৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বেশ কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জনবল বৃদ্ধি, নতুন নতুন বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট গঠন, যেমন—শিল্প পুলিশ, টুরিস্ট পুলিশ, নৌ পুলিশ, স্পেশাল সিকিউরিটি ও প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন, পিবিআই, অ্যান্টি টেরোরিজম  ইউনিট, সাইবার ক্রাইম ইউনিট ইত্যাদি। আইজিপি, ইন্সপেক্টর, সাব-ইন্সপেক্টর ও সার্জেন্টদের পদমর্যাদা বৃদ্ধি, পুলিশের বাজেট অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী না চাইতেই পুলিশকে অনেক কিছু দিয়েছেন। তিনি সিদ্ধান্ত দেওয়ার পরও প্রশাসনিক জটিলতায় তা পদে পদে বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তখন আবার প্রধানমন্ত্রীর শরণাপন্নই হতে হয়েছে। তাকে বারবার বিরক্ত করেছি। কিন্তু তাকে কখনো বিরক্ত হতে দেখেনি। শুধু এবার আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি কেবল একটির পর একটি দাবি নিয়ে আসো। দাবি পূরণ করতে টাকা লাগে না। এ টাকা পাব কোথায়?’ পরবর্তী সময়ে আবার দাবিদাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনার আশ্বাসও দিয়েছিলেন।

পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে তাদের অনেক অর্জনও আছে। ২০১৫ সালে পুলিশ  পেট্রোল বোমা ও আগুন-সন্ত্রাস সফলভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৬ ও ২০১৭ সালে জঙ্গিদের আস্তানা খুঁজে বের করে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অনেকগুলো সফল  অভিযান  করা হয়েছিল। এতে জঙ্গিদের গজিয়ে ওঠা শক্তি ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। জঙ্গি দমনে বাংলাদেশ পুলিশের এ সফলতা দেশ বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে।  ৯৯৯ জাতীয় সেবা কার্যক্রমের মাধ্যমে পুলিশ জনগণের প্রত্যাশিত সেবা দিয়ে তাদের আস্থা অর্জন করতে পারছে।  

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  সব সময় পুলিশের কাজের প্রশংসা করেন এবং পুলিশকে অনুপ্রেরণা দেন। এ প্রশংসা ও অনুপ্রেরণা পুলিশকে কাজ করতে শক্তি জোগায়। তিনি জনগণের আশা পূরণের একমাত্র আশ্রয়স্থল। প্রত্যেক পুলিশ সদস্যের প্রত্যাশা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাদের মনের আকুতি উপলব্ধি করে ২০২০ সালের পুলিশ সপ্তাহে পুলিশের দাবিদাওয়ার আলোকে পুলিশকে অবশ্যই কিছু দেবেন। তারা সে আশায় প্রাপ্তির অপেক্ষায় আছে। একই সঙ্গে দেশবাসীও প্রত্যাশা করে,  দেশের  উন্নয়ন ও জনকল্যাণে প্রধানমন্ত্রীর চলমান কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে সহযাত্রী হিসেবে পুলিশ তার পাশে থাকবে এবং পুলিশ জনগণের বন্ধু হবে—এ অঙ্গীকারও পুলিশ করবে।

n লেখক :সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ