রাজধানীর কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় ধর্ষককে গ্রেফতার করেছে র্যাব। গতকাল বুধবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে শেওড়া এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার নাম মজনু (৩৫), বাড়ি নোয়াখালীর হাতিয়ার জাহাজ্জ্যার চরে।
তার কাছ থেকে ধর্ষণের শিকার ঐ ছাত্রীর মোবাইল ফোন ও ভ্যানিটি ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে। ১০ বছর আগে মজনু নোয়াখালী থেকে ঢাকায় এসে ভবঘুরে জীবন যাপন করতেন। তিনি মাদকাসক্ত ও ‘সিরিয়াল ধর্ষক’। এর আগে প্রতিবন্ধী ও ভিক্ষুকদের তিনি ধর্ষণ করেছেন। তার মুখের সামনের দুই দাঁত ভাঙা। এর আগে ভিকটিম ধর্ষকের সামনের দুই দাঁত না থাকার তথ্য জানিয়েছিলেন।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ভিকটিম ধর্ষককে শনাক্ত করেছেন। মজনুকে গ্রেফতার করার আগে র্যাব অরুণা বিশ্বাস (৪৫) নামে একজন নারী এবং খায়রুল ইসলাম (৩৮) নামে এক রিকশাচালককে আটক করে। এদের মধ্যে অরুণার কাছে ধর্ষক ভিকটিমের মোবাইল ফোনটি ৫০০ টাকায় বিক্রি করেন। অরুণা ধর্ষককে ৪০০ টাকা দেন। মোবাইল ফোনটি বন্ধ ও এর মনিটরের কাচ ভাঙা ছিল। অরুণা ঐ মোবাইল ফোনটি রিকশাচালক খায়রুলের কাছে দেন মেরামত করতে। খায়রুল মোবাইল ফোনটি ঠিক করে সেটি ব্যবহার করতে থাকেন। এরপর এই মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে খায়রুল ও অরুণাকে আটক করার পর ধর্ষক মজনুর তথ্য পাওয়া যায়।
রবিবার রাতে মজনু ধর্ষণ করে ট্রেনে করে নরসিংদী যান। নরসিংদী রেল স্টেশনে দুই রাত থাকার পর মঙ্গলবার সকালে তিনি ঢাকা ফিরে আসেন অরুণার কাছ থেকে ১০০ টাকা নিতে। এরপরই র্যাব বুধবার ভোরে তাকে গ্রেফতার করে। গতকাল কাওরান বাজারে র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া শাখায় প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে এসব তথ্য জানান র্যাব পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার-বিন-কাশেম।
জিজ্ঞাসাবাদে ধর্ষকের দেওয়া তথ্য
মজনু বলেন, ১০ বছর আগে হাতিয়ায় তার স্ত্রী মারা যায়। এরপর তার দুই সন্তানকে ফেলে রেখে ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় এসে ভবঘুরে জীবন যাপন করতেন। ছিনতাই ও চুরি করে যা টাকা পেতেন, তা দিয়ে ড্যান্ডি, ফেনসিডিল সেবন করতেন। কমলাপুর রেল স্টেশনসহ রেললাইনের আশপাশের ঝুপড়ি ঘরগুলোতে তার বিচরণ ছিল। কখনো ভিক্ষুক কখনো প্রতিবন্ধীকে তিনি ধর্ষণ করতেন। থাকতেন ক্যান্টনমেন্ট রেল স্টেশনে পড়ে থাকা ফাঁকা ও পরিত্যক্ত ওয়াগনে। ট্রেনে যাতায়াত করতে গিয়ে বছর তিনেক আগে ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে তার মুখের সামনের দুই দাঁত ভেঙে যায়। মাদকাসক্তের কারণে তিনি দিন দিন অসুস্থ হয়ে যান।
ঘটনার দিন রবিবার সন্ধ্যায় চিকিত্সককে দেখানোর জন্য তিনি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে যান। সেখানে চিকিত্সা নিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর শেওড়ার দিকে ফুটপাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় তার সামনে পাতলা দেহের অধিকারী একজন হেঁটে যাচ্ছিলেন। তার ঘাড়ে ব্যাগ ছিল। তাকে তিনি অনুসরণ করতে থাকেন। একটা পর্যায়ে তিনি তাকে পেছন থেকে গলা চেপে ধরে হ্যাঁচকা টান দেন। এ সময় ঐ মেয়ে তাকে চড় মারার চেষ্টা করেন। তখন মজনু মেয়েটিকে পাজাকোলা করে ফুটপাতের পাশের ঝোপঝাড়ের ভেতর নিয়ে যান। সেখানে কিছু সময় ধরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে মেয়েটি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। ঘণ্টা খানেক সময় ধরে তিনি ধর্ষণ করেন। এর কিছু সময় পরে জ্ঞান ফিরে এলে মেয়েটি চিত্কার করতে থাকেন। এক পর্যায়ে ঝোপঝাড় থেকে দৌড় দিয়ে বের হয়ে রাস্তা পাড় হওয়ার চেষ্টা করেন। সড়কের একপাশ অতিক্রম করে মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে আবার ফিরে এসে ফুটপাত ধরে দ্রুত হাঁটতে থাকেন। শেওড়া ওভারব্রিজ দিয়ে তিনি ওপারে চলে যান।
মজনু ফুটপাত থেকে ঝোপঝাড়ে ফিরে এসে দেখেন, মেয়েটির ভ্যানিটি ব্যাগ পড়ে আছে। ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে তিনি কাগজপত্র ফেলে দেন। মোবাইল ফোন ও ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে তিনি ক্যান্টনমেন্ট রেল স্টেশনের কাছে অরুণার কাছে চলে আসেন। তার কাছে মেয়েটির মোবাইল ফোনটি ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রির কথা হয়। অরুণা ৫০০ টাকায় মোবাইল ফোনটি কিনতে চান। ১০০ টাকা বাকি রেখে ৪০০ টাকা নিয়ে চলে যান। যাওয়ার আগে ভ্যানিটি ব্যাগটি স্টেশনের ফাঁকা ওয়াগনের ভেতর রেখে দেন।
র্যাবের ব্রিফিং
র?্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার-বিন-কাশেম বলেন, গত রবিবার সন্ধ্যায় কুর্মিটোলায় ধর্ষণের শিকার হন ঢাবির ঐ ছাত্রী। তার দেওয়া চেহারার বর্ণনা অনুযায়ী, ধর্ষকের একটি স্কেচ আঁকা হয়। সেই স্কেচ ধরে অনুসন্ধানে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ছাড়া ঘটনাস্থলের আশপাশের কয়েকটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গ্রেপ্তার মজনুকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় যে এই ঘটনা ঘটানোর পরে ভিকটিমের মোবাইল ফোন অরুণা নামের এক নারীর কাছে বিক্রি করে আত্মগোপনে চলে যান। প্রথমে এয়ারপোর্ট রেল স্টেশন এলাকায় চলে যান। এরপর সেখান থেকে নরসিংদী রেল স্টেশনে চলে যান। পরে আবারও ঢাকায় এসে বনানী রেল স্টেশনে আত্মগোপনে থাকেন। সর্বশেষ তিনি বনানী থেকে শেওড়াতে ঐ নারীর কাছ থেকে মোবাইল বিক্রির বাকি ১০০ টাকা নিতে যান। আর সেখান থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করে র?্যাব।
তিনি বলেন, ‘শুধু এই প্রথম নয়, এর আগেও সে বিভিন্ন সময়ে প্রতিবন্ধী ও ভিক্ষুক নারীদের নিয়ে এসে একই জায়গায় এই ধরনের অপকর্মগুলো করেছিল। যে জায়গাটি মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এটা কিন্তু একটু আড়ালেই। ঐ সময় এখানে মানুষের আনাগোনা কম থাকে। যার কারণে সে দীর্ঘক্ষণ ধরে সেখানে অবস্থান করে এই অপকর্মগুলো করতে পেরেছিল।’
র্যাবের এই কর্মকর্তা জানান, ‘র্যাপিস্ট আমাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, তার টার্গেট থাকত মানসিক প্রতিবন্ধী ও ভিক্ষুক মেয়েদের ওপর। সে বলেছে, কমলাপুর রেল স্টেশনসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করে ওই জায়গায় আনত। ঐ জায়গায় কিছু ঝোপ বা গুল্মজাতীয় গাছ দিয়ে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর আড়ালে খুব বেশি জঙ্গল নেই। আবার খুব বেশি আড়ালও নেই। তবে সন্ধ্যা থেকে রাতের দিকে ঐ জায়গায় মানুষের আনাগোনাটা কম থাকে। এই প্রথম সে প্রতিবন্ধী বা ভিক্ষুক শ্রেণি ছাড়া অন্য মেয়েকে ধর্ষণ করেছে। তবে এক্ষেত্রে সব সময় যে সে একই জায়গা ব্যবহার করেছে তা সে স্বীকার করে নেয়নি।’
এক প্রশ্নের জবাবে র্যাব কর্মকর্তা বলেন, ‘মজনু ক্লোরোফর্ম ব্যবহার করেনি। মূলত সে মেয়েটাকে ফলো করছিল। আর আপনারা দেখেছেন যে আমাদের ভিকটিম কিন্তু ক্ষীণকায়। তাকে সে পাঁজাকোলা করেই নিয়ে যায়।’
রবিবার রাত ১০টার দিকে জ্ঞান ফিরলে ঐ শিক্ষার্থী রিকশায় করে বান্ধবীর বাসায় যান। সেখান থেকে বান্ধবীসহ অন্য সহপাঠীরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সোমবার সকালে অজ্ঞাত এক ব্যক্তিকে আসামি করে ঐ শিক্ষার্থীর বাবা ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলাটি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করছে।
