পিলখানা হত্যা মামলার ২৯ হাজার পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়

‘পেছনের ঘটনা’ উদ্ঘাটনে কমিশন গঠনের সুপারিশ

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২০, ২২:২৮

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায়ের পাতায় পাতায় উঠে এসেছে সেনা কর্মকর্তাদের ওপর বিডিআর জওয়ানদের ভয়াবহ নৃশংসতার চিত্র। সেই চিত্রে বিদ্রোহীদের সর্বগ্রাসী জিঘাংসা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, বিডিআর জওয়ানরা ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ও ইতিহাসের জঘন্যতম অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সশস্ত্রবাহিনীর ৫৭ জন দেশপ্রেমিক মেধাবী কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিরস্ত্র মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। শুধু তাই নয়, তারা নারী, শিশু ও গৃহকর্মীর ওপর অমানবিক নির্যাতন করে দেশের আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। এই নারকীয়, নৃশংস ও বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) জওয়ানরা এক    কলঙ্কজনক অধ্যায় সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেদেরকে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করেছে। এই কলঙ্কের চিহ্ন তাদেরকে বহুকাল বহন করতে হবে। রায়ে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিশন গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে আরো ১০টি সুপারিশ করা হয়।

বিচারপতি মো. শওকত হোসেনের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এমন পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। বেঞ্চের অপর দুই বিচারক হলেন:বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার। তিন বিচারপতির স্বাক্ষরের পর গতকাল বুধবার এ রায় প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত রায়টি ২৯ হাজার পৃষ্ঠার। আইনবিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচার বিভাগের ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে বড়ো ভলিউমের রায়। এর আগে কোনো মামলার রায়ই হাজার পৃষ্ঠা অতিক্রম করেনি।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তত্কালীন বিডিআরের সদর দপ্তর পিলখানায় এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটে। এ ঘটনায় করা হত্যা মামলার রায়ে ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর নিম্ন আদালত ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ২০১৭ সালে নভেম্বর মাসে হাইকোর্ট এর মধ্যে ১৩৯ বিডিআর জওয়ানের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। যে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়নি, তাদের মধ্যে চার জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। আর মৃত্যুদণ্ড হ্রাস করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে আট জওয়ানকে। হাইকোর্টে আপিল বিচারাধীন থাকাবস্থায় বাকি একজনের মৃত্যু হয়। ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ আসামিদের আপিল খারিজ করে ডেথ রেফারেন্স বহাল রাখে। দুই বছর পর ডেথ রেফারেন্সের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হলো। এদিকে এই মামলায় নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন পাওয়া ১৬০ জনের মধ্যে ১৪৬ জনের সাজা বহাল রেখেছে আদালত। তবে নিম্ন আদালতে খালাস পাওয়া ৩১ জওয়ানকে নতুন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে হাইকোর্ট। এখন মোট যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৮৫ জনে। এ ছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডপ্রাপ্ত আরো ২০০ জনের সাজা বহাল রয়েছে। এ রায় প্রকাশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম বলেছেন, পূর্ণাঙ্গ রায় পর্যালোচনা করে যারা খালাস পেয়েছেন তাদের ব্যাপারে আপিল করা হবে। আসামিপক্ষের আইনজীবী এম আমিনুল ইসলাম বলেন, রায় পর্যালোচনা করে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করা হবে।

রায়ের উল্লেখযোগ্য অংশ

হাইকোর্ট রায়ে বলেছে, বিডিআর বিদ্রোহের ভয়াবহ ঐ ঘটনা সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত ধৈর্য, সাহসিকতা, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে বিদ্রোহ দমনে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি জাতিকে ভয়াবহ সংকটের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। মামলার নথি পর্যালোচনায় ও তদন্তের কোনো অংশে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে অন্তঃকলহ বা পদোন্নতি সংক্রান্ত বিভেদের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

রায়ে আরো বলা হয়, এই হত্যাকাণ্ডের ‘পেছনের ঘটনা’ উদ্ঘাটন করে জাতির সামনে প্রকৃত স্বার্থান্বেষী মহলের চেহারা উন্মোচনের জন্য সরকার জনস্বার্থে প্রয়োজন মনে করলে আইনসম্মতভাবে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের দ্বারা তদন্ত কমিশন গঠন করে এই মামলাসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য মামলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে বেঞ্চের দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী বলেন, ঐ হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা এতই ভয়াবহ ছিল যে এর সঙ্গে পৃথিবীর অন্য কোনো ঘটনার সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় না। যারা এই ঘৃণ্য পৈশাচিক ও নির্মম অপরাধ করেছে তারা কি ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য?

কনিষ্ঠ বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের ফলে জাতি বেশ কিছু প্রতিশ্রুতিশীল, বুদ্ধিদীপ্ত এবং প্রতিভাবান সেনা কর্মকর্তাকে হারিয়েছি। এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার পেছনে বিশেষ চক্রান্তকারী মহলের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দেশকে রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল করা এবং দেশের গণতন্ত্রের ক্ষতি করা। রায়ে আরো বলা হয়, ডিএডি তৌহিদের নেতৃত্বে ডিএডি নাসির, ডিএডি মির্জা হাবিবুর রহমান, ডিএডি জলিল, ডিএডি রহিম, সিপাহী সেলিম রেজাসহ অন্য বিদ্রোহীরা পরস্পরের যোগসাজশে এবং ষড়যন্ত্র করে অন্য আসামিদের সঙ্গে একে অপরের সহায়তায় পূর্ব পরিকল্পিতভাবে এই বিদ্রোহের ঘটনা ঘটান। রায়ে বলা হয়, পৃথিবীর অনেক দেশ মৃত্যুদণ্ডের বিধানকে নিরুত্সাহিত করেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এটার বিরোধিতা করছেন। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখার মাধ্যমে নাগরিকদের কাছে এই বার্তা দেওয়া হয় যে তোমরা আইন অনুসরণ করে চল। ভয়ংকর খুনিদের হাত থেকে সমাজকে রক্ষা করতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। এ কারণে এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় সর্বোচ্চ শাস্তি প্রাপ্য।