আবদুশ শাকুরের লেখার বিষয় যেমন বিচিত্র, সেই সঙ্গে তাঁর লেখা বহুবিধ তথ্য ও তত্ত্বের ভান্ডার। ফলে এসব লেখার বিশ্লেষণ, বোধ পাঠককে দারুণভাবে টানে। এ সময়ের জন্য প্রাসঙ্গিক অগ্রন্থিত লেখাটি সাময়িকীতে পত্রস্থ হলো
লেখাটা আগাগোড়াই বাজারে, মানে বাজার সংক্রান্ত। তবে অন্তে আমার ‘প্রাচীন শিখা’র সঙ্গে— কী আর থাকবে বর্তমান বয়েস এবং বিন্যাসে— কিছু ভঙ্গিম উক্তিই থাকবে!
দেশের লোকপ্রিয় লেখকদের জনৈক শীর্ষস্থানীয়কে রসুন-পিঁয়াজের খদ্দের হিসেবে মুদি দোকানের অন্তস্থলে দেখে আমার অনভ্যস্ত চোখে কিছুটা বেখাপই ঠেকলো। ‘দৈনন্দিন’-নামের দোকানটি অবশ্য সমৃদ্ধ-শপারদেরই। পার্কিং সুবিধায় পাকাবাজার-কাঁচাবাজার সবই পাওয়া যায় বিধায় এখানে আমাকে প্রায়শই লিঙ্গবৈষম্যের শিকার হতে হয়— সময়-সময় গলদ্ঘর্ম বিক্রয়িকদের আপা-খালাম্মা ডাকে সাড়া দিয়েও কাজ হাসিল করতে হয়।
তবে কোনো সম্বোধনই আমার কানে ‘আংকেলে’র চেয়ে বেশি শ্রুতিকটু নয়। এদেশে এ এক গবেষণাযোগ্য সামাজিক বৈশিষ্ট্য যে ক্রেতা হোন কি বিক্রেতা, বাজারে আপনি নির্বান্ধব হলেও আত্মীয়হীন নন কখ্খনো। অথচ এ-দোকানটি সেকেলে গ্রোসারিও নয়, একেলে মার্কিনি গ্রোসেটেরিয়া— পণ্য তুলে নেবেন শপারগণ নিজে, ওদেশের মতো; তবে শপিং ব্যাগটি বাহনে তুলে দেবে কোনো শিশুশ্রমিক, এদেশের মতো।
বন্ধুবর বশিরকে অবশ্য তার পণ্য নিজ হাতে তুলে নিতে দেয়নি দোকানী— বদলে লেখকের হাত থেকে তিনি অন্য কিছু নিচ্ছেন বলেই মনে হল। ঝুঁকি নিয়ে নারীগণের হেভি পরশ কুড়িয়ে কাছাকাছি গিয়ে যা দেখলাম তার জন্যে আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না— মুদি দোকানটির ‘উট’ মার্কা সর্ষের তেল আর ‘ধনুক’ মার্কা বাংলা সাবানের মধ্যের খোপটিতে-রাখা বশিরের উপন্যাসগুলিতে সে অটোগ্রাফ দিয়ে যাচ্ছে।
(বন্ধুর বইয়ের কাটতি এত বেশি যে পশ্ মুদি দোকানী তো বটেই, শাহী পানদোকানীও তার কিছু বই বরাবরই হাতের কাছে রাখে)। পরে জেনেছি, সুবর্ণ সুযোগটি পেয়ে গিয়ে, শপিং-লিস্টে না থাকলেও, গত তারিখে উপস্থিত তরুণ-তরুণী লেখকের অটোগ্রাফ সমৃদ্ধ বইগুলি কিনে সব সাফ করে দিয়েছিল।
তাই বিচক্ষণ দোকানী মহান খদ্দেরটির পরবর্তী পদার্পণের সদ্ব্যবহারকল্পে অনেক বেশি বই এনে রেখেছিল বলেই লেখকের পরিশ্রমটা আজ বেশি হচ্ছিল (বশির অবশ্য বলেও থাকে যে অটোগ্রাফের মতো শ্রম তার লেখাতে লাগে না বিধায় পড়তাটা ওর হয়েই যায়)। লেখক তার কলম গুটিয়ে মাথা তুলতেই আমি আমার চোখ কপালে তুলে বললাম :
‘বাজারে এলি তুই! ভাবী গেল কই?’
‘বাসাতেই আছে— এবং থাকবে। বাজারে নাকি আমাকেই আসতে হবে এখন থেকে— যেহেতু এখন পর্যন্ত তাকেই আসতে হয়েছিল।’
‘সে কি! ওঁদের সাম্প্রতিক ‘শরীর আমার সিদ্ধান্ত আমার’-ব্যানারবাহী র্যালির করোলারি নাকি?’
‘জানি না। তবে ওটা তো ধনাত্মক ব্যাপার। উনি পড়ে আছেন ঋণাত্মক হয়ে। কদিন থেকেই বিমর্ষ, বীতরাগ— বিবাগিনী হয়ে যাবার লক্ষণ প্রবল।’
‘আরে রাখ্, বিবি হবেন বিবাগিনী! সাময়িক মন খারাপের ব্যাপার কোনো। আসলে সমানাধিকারের আদর্শের বেদিতে বাজারে ঘোরার আধা সময় হাতছাড়া হয়ে যাবার কারণেই ঘরে বসে বিরক্ত হচ্ছেন। তোর নিজের কথা বল। হপ্তা দুয়েক তো হচ্ছে, কেমন লাগছে গেরস্তিটা?’
‘গেরস্ত তো আমি স্বভাবতই এবং সর্বকর্মেই। কিন্তু এখানে আমার জয়েনিং-ডেট্টা তুই জানলি কী করে? দেখা তো এই প্রথম।’
‘দিলাম একটা ব্লাইন্ড্ ছেড়ে।’
কোথায় কি একটা প্রধান-না-বিশেষ অতিথিগিরির বায়না আছে বলে ত্বরা করে চলে যাচ্ছিল বশির। হঠাত্ কি ভেবে দোর থেকে ফিরে এসে বিপণিনির্বাহীদের বললো :
‘সরি, পরিচয় না-করিয়েই চলে যাচ্ছিলাম। আমার বন্ধু— ইনিও একজন বড় লেখক।’
বলেই মুদিখানার পণ্যসামগ্রী কেনার ক্ষুদ্রতর পারিবারিক দায়িত্বটুকু সেরে বন্ধু চলে গেল তার সভাসমিতিঘটিত বৃহত্তর সামাজিক দায়িত্ব পালনে।
জনপ্রিয় এই দোকানটির তিন দশকের প্রাচীন খদ্দের আমি। ফোনের ফরমাশে এরা পণ্য পাঠায় বাসায়, কণ্ঠ শুনেই চিনে ফেলে কার বাসা। তাই এতটা কাল আমার লেখক-পরিচয়টা না-জানার লজ্জায় বিব্রত বোধ করছিল সকলেই। শরম সরিয়ে একজন জানতেই চাইল কোথায় পাওয়া যায় আমার লেখা।
আমিও নির্দ্বিধায় জানিয়ে দিলাম— পলিথিনের ঠোঙা চালু হবার পরে আর কোথাও পাওয়া যায় না। আগে চকবাজারেই পাওয়া যেতো। এখন মৌলভী বাজারে কারো গুদামে খোঁজা যেতে পারে— যেহেতু ওরা কাগজের ঠোঙার যুগে আমার লেখা মণদরে কিনতো।
আসলে দোকানটিতে বশিরের জয়েনিং-উইকটি আমি আন্দাজে বলিনি। ‘দৈনন্দিন’ থেকে মলি ভাবীর রিজাইনিং-উইকটি আমার জানা ছিল। বস্তুত এ-দোকানে সেদিন তাঁর বাজারদরঘটিত বিপর্যয়টির জনৈক নেপথ্য সাক্ষী হিসেবে আমিও হাজির ছিলাম। ভেবে আমার হাসিই পেয়েছিল। এই বাজারদর-বিষয়টি নিয়েই মল্লিকার সঙ্গে আমার মতের অমিল গভীরভাবে দেখা দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের শেষ বর্ষে।
মতের অমিলটা মনের অমিলে গড়িয়ে গেল বলেই আমাদের প্রেমটা ছিটকে গিয়ে বিয়ে থেকে বিচ্ছেদে গড়িয়েছিল। হায় রে ষাটের দশক! আদর্শই তখন শাসন করতো সকল খেলার মধ্যমাঠ, এমনকি লীলাখেলারও— রায় দিয়ে দিত গোলটা কার পক্ষে হবে, আর কারই বা বিপক্ষে। ওটা অবশ্য বশিরের পক্ষেই হয়ে গিয়েছিল। ফলে আমার মল্লিকা সেন হয়ে গেলেন আমার মলি ভাবী।
কী ছিল সেই বাজারে ব্যাপারটি? বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাইতাম। আমার গান মলি পছন্দ করলেও মিলনায়তনের শ্রোতৃবর্গ পছন্দ করতো না। অন্যদের বেলায় হাততালি থামতেই চাইতো না। আর আমার বেলায় তা পড়তেই চাইতো না। আমার এই নাছোড় অবমূল্যায়নে ব্যথিত মল্লিকা বলতে লাগলো :
‘ওরা যে-গান চায় সে তো তুমিও গাইতে পারো ইচ্ছে করলে। বরং অনেকের চেয়ে ভালোও। গাও না কেন চটুল কিছু আধুনিক গান— ’
‘কী বললে? আমি গাইবো ওই ব্বা-জ্জা-রে গান? তাদের আবদারে আমাকে হতে হবে ব্বা-জ্জা-রে শিল্পী? ছিঃ ছিঃ ছিঃ!’
আজো মনে পড়ে আমার অশেষ যত্নে গড়ে তোলা কলাশাস্ত্রীয় ভাবমূর্তিটির গায়ে আঁচ লেগে যাওয়াতে রাগের বশে আমি ‘ব’-টাকে দুই ঠোঁটের ফাঁকে আর ‘জ’-টাকে জিভ-তালুর মাঝে ধৃত পেয়ে গিয়ে অতি নির্মম জাঁতিকলে ধরে, জাঁতা দিয়েই উচ্চারণ করেছিলাম— ‘বাজারে’।
কিন্তু ‘র’-টাকে রগড়াতে পারিনি মোটেই— হরফটা জিভের ডগায় লাফায় ব’লে। তবে সে উষ্মা উশুল হয়ে গিয়েছিল পরক্ষণেই। ‘ছ’-টাকে জিভ আর তালুর মাঝখানে পেয়ে গিয়ে ওটাতে বিসর্গের বারুদ পুরে দিয়ে মর্টারের মতো তিন-তিনটি বার উদ্গার করেছিলাম— ছিঃ ছিঃ ছিঃ, যেন কামানের গোলাই ছুড়েছিলাম।
কিন্তু ওই সব উচ্চারণ আর উদ্গীরণের পরিণতি যে কী আত্মঘাতী হয়েছিল সে তো বলেছি। তবে মলিকে বেশি দুষতে আমি পারি না। ও ছাড় দিয়েছিল অনেক। আদর্শের দাসানুদাস, আমিই মানিনি। বিচিত্রানুষ্ঠানের পাঁচমিশেলী কানে আমার রবীন্দ্রসংগীত রোচে নি বলাতে সে মেনে নিয়েছিল। কিন্তু বর্ষবরণ, বর্ষাবরণ, বসন্তোত্সবের মতো রবীন্দ্রসংগীতকেন্দ্রিক আসরেও যখন সকলের হাততালি মেলে গমগমে, আর আমার করতালি জোটে এলোমেলো— তখন ব্যাখ্যা না চেয়ে মল্লিকা আর পারলো না। বোঝাতে চাইলাম :
‘ওরা করেছে কেবল নারীপ্রেমকেন্দ্রিক গান। আর আমি করেছি প্রকৃতিপ্রেমকেন্দ্রিক, ঈশ্বরপ্রেমকেন্দ্রিক— যেহেতু এই তিন ধারার প্রেমই একাকার রবীন্দ্রনাথে— ’
‘তাহলে নারীপ্রেমকেন্দ্রিক সম্পর্কই বা করা কেন—’
‘তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক তো প্রেমকেন্দ্রিকই নয় মলি— ওটা মূলত পূজাকেন্দ্রিক। তুমি তো আমার পূজা!’
‘তাহলে হিন্দী গানটিই গাও— তুম্ হি তো মেরি পূজা হো!’
হেসে দিয়েছিল মল্লিকা।
তবে আরেক আসরের পরে কথাটা সে আবার তুললো :
‘আজ তো তোমার গান আমারও রোচেনি।’
‘আশ্চর্য কী! তোমরা তো রবীন্দ্রনাথের ইমোশনাল গানের ভাবেই ভাসো। আমি মজি কবির ঈসেথটিক গানের রূপে। সহজসরল ভাবের গানের চেয়ে চারুচিক্কন রূপের গানকে রবীন্দ্রনাথ নিজেও শ্রেয় বলেছেন ইন্দিরা দেবীর কাছে লিখিত এক পত্রে।’
আদর্শের লড়াইটা অবশেষে বেধেই গিয়েছিল। যুদ্ধ ঘোষণা করলো অর্থনীতিবিদ্যার ছাত্রী ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রের বিরুদ্ধে :
‘দ্যাখো, তোমার এই প্রগতিবাদী উন্নাসিকতা আর তার আনুষঙ্গিক রসিকতার উত্পাতে কিছুদিন ধরে তোমাকে আমার কেবলি কম আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে— ’
‘ওই পুঁজিবাদী বাজারে-রুচি আর তার আনুষঙ্গিক স্থূলতা-রুগ্ণতার কারণে তোমাকেও আমার অনেক দিন ধরেই বেশ অসহনীয় বোধ হচ্ছে।’
‘এখন আমার প্রান্তে ব্যাপারটি আর জীবনানন্দীয় ‘বোধে’ পড়ে নেই— অবাধ বাজারের সমস্যায় পরিণত হয়েছে।’
‘বেশির ভাগ সমস্যার সমাধান বোঝাপড়ার মধ্যেই থাকে। বলো, সমস্যাটা কী?’
‘পুস্তক প্রকাশক একদিকে তোমার গল্পগ্রন্থটির সব কপিই মণদরে বিক্রি করে দেবার অনুমতি, আরেকদিকে বশিরের গল্পগ্রন্থটির দ্বিতীয় সংস্করণ অবিলম্বে ছেপে ফেলে তাড়াতাড়ি বাজারে ছেড়ে দেবার অনুমতি— দুটোই আদায় করে দেবার জন্য ধরেছে আমাকে। কারণ তিনি জানেন যে দু’জনের সাহিত্যকর্মের ইন্ধন জোগায় অসাহিত্যিক এই একজনই।’
‘দিলাম অনুমতি আমার বইটি এক পয়সা দরে বিকিয়ে দেবার— যাতে এই দেশ এই কালের রসেটি-সুইন্বার্ন-নর্টনগণ খৈয়ামের সেই রোবাইগুলির মতো অমর করে তুলতে পারে আমার এ গল্পগুলিকে।’
‘কিন্তু তার আগে তোমাকে বলতে হবে— বাজারদর তুমি মানবে না কেন?’
‘বাজারকে মেনে নিতে আমার সংস্কৃতিতে বাধে। ওটা হল বেচাকেনার জায়গা। জীবনের উচ্চতর মহলের সঙ্গে তার ব্যবধান এককথায় অসেতুসম্ভব। বাজার হল ভুঁইফোঁড়, অনভিজাত, অনধিকারী— ’
‘আর কিছু?’
‘ওটা একটা প্রতিক্রিয়াশীল প্রতিষ্ঠান। তাই যা কিছু বাজারে— তা-ই বাজে, নগণ্য, জঘন্য— ’
‘প্রথম দৃষ্টিভঙ্গিটি সামন্ততান্ত্রিক, যা টেকেনি। আর দ্বিতীয়টি সমাজতান্ত্রিক, যা টিকবে না।’
‘কেন টিকবে না?’
‘তিরিশের দশকের বিতর্কটিতে কে বিজয়ী হচ্ছে, ভেবে দ্যাখো। ব্যক্তিবাদে বিশ্বাসী ফ্রেডিরশ হায়েক্ বলেছিলেন— উত্পাদন ও উপভোগ বিষয়ে সঠিক সিগন্যাল একমাত্র অবাধ বাজারই দিতে পারে— ’
‘সমাজবাদে বিশ্বাসী অস্কার লাং বলেছিলেন— কম্পিউটার-কেন্দ্রিক তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে কেন্দ্রায়িত কমিশন পূর্ণ তথ্য পাবে এবং উত্পাদন-উপভোগ-বিপণনের ব্যাপারে অবাধ বাজারের চেয়ে শ্রেয়তর নির্দেশনা দিতে পারবে।’
‘দিতে পারছে না। পূর্ণ তথ্যের অভাবে উল্টাপাল্টা সিগন্যালই দিচ্ছে। আজ তারই উদাহরণ পাওয়া যাচ্ছে খোদ রাশিয়ার ‘ক্রোকোডিল’-নামী ব্যঙ্গ পত্রটিতে ’
‘যেমন?’
‘ব্যালকনিসমৃদ্ধ ফ্ল্যাট তৈরি হয়েছে, পরিকল্পিত হয়নি ওতে প্রবেশের দরোজা। ছুরি তৈরি হয়েছে প্রচুর, বিলকুল তৈরি হয়নি কাঁটা। টুথব্রাশ আছে বাজারে, টুথপেস্ট নেই। ডান পায়ের জুতো চলে এসেছে দোকানে, বাম পায়ের জুতো প্রোডাকশন-লাইনেও যায়নি। অথচ এসবের জন্য ব্যক্তিবিশেষকে দায়ী করাও যাচ্ছে না, যেহেতু সেখানে সামগ্রিকভাবে দায়ী কেবল সিস্টেম। তাই ব্যক্তিবিশেষ বলতে পারে— আসি যাই মাইনে পাই, কাজের জন্য ওভারটাইম চাই। ‘রেলগাড়ি জাতীয় সম্পত্তি’-লেখাটির পাশেই পাঙ্খা চোরের লেখা পাওয়া যেতে পারে— ‘জনৈক নাগরিক হিসেবে আমি আমার অংশটি বুঝিয়া লইলাম।’
অর্থশাস্ত্রের সম্মানসহ ডিগ্রীধারিণীর সঙ্গে এ-বিষয়ে তর্কে টেকার মতো উপাত্ত আমার সঞ্চয়ে ছিল না। তাই আমি মিইয়ে এসেছিলাম এবং বিশেষ অঙ্গনটি ছেড়ে সাধারণ প্রাঙ্গণে এসে বলেছিলাম :
‘এই রাশিয়া সম্পর্কেই বার্নার্ড শ বলেছেন— আই হ্যাভ্ সিন্ দ্য ফিউচার অ্যান্ড ইট ওয়ার্ক্স্।’
মল্লিকার উত্তর ছিল রেডিমেড :
‘বার্নার্ডের নাতি বলবে— আই হ্যাভ্ সিন্ দ্য পাস্ট্ অ্যান্ড ইট ডিডিন্ট্ ওয়ার্ক্।’
অবশেষে রণে ভঙ্গ দিয়ে আমাকে বলতে হয়েছিল :
‘এরপর তুমি বলবে— ক্যাপিট্যালিজম মেক্স্ সোশ্যাল মিসেটক্স্, বাট্ সোশ্যালিজম মেক্স্ ক্যাপিটাল্ মিসেটক্স্। আমি বলবো ক্যাপিটাল্ মিসেটক্ যাতে না করতে হয়, তার জন্য আমাকে তোমার সঙ্গে ক্যাপিটাল সম্পর্কটাই ছিন্ন করতে হচ্ছে— মানে সদূরপ্রসারী রিশতাটা।’
দোকানটি থেকে স্মৃতিচারণ করতে করতে দেখছি একরকম অজান্তে বশিরের বাাসায় পৌঁছে একেবারে মল্লিকাবনেই হানা দিয়ে ফেলেছি। আসলে হূদয়ের গভীর ভিতরে হিংস্র প্রতিহিংসাটাই কাজ করে গিয়েছে— মোক্ষম লগ্নটি বয়ে না যেতেই বান্ধবীবধ পর্বটি সেরে ফেলার উদ্দেশ্যে। তাই সপাং দুটি পাল্লা খুলতেই আমি সটান আক্রমণ করে বসলাম সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত মল্লিকাকে :
‘আজ তোমাকেই বলতে হবে— বাজারদর তুমি মানবে না কেন।’
ভিরমি খেয়ে মলি আমার চোখে চোখ গেঁথে নিশ্চল নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল প্রায় পুরো একটি জনমই যেন। অতঃপর স্খলিত কণ্ঠে কেবল বলতে পারলো :
‘হঠাত্ তুমি কী করে? এতদিন পরে? আর তোমাকে অমন অবন্ধুসুলভ দেখাচ্ছে কেন বন্ধু?’
‘এজন্যে যে প্রশ্নটি বাজারে। যে-প্রশ্নটির খপ্পরে পড়েই, অত্যন্ত সফল টেস্ট-রান্-করা, প্রেমোত্পাদন কারখানার সকর্মক পার্টনারটা হয়ে পড়েছিল নিতান্ত নিষ্ফল অকর্মক বন্ধুটি, তিরিশটি বছর আগে। তাই তোমাকে আজ বলতেই হবে— নিজের বাজারদরটি তুমি মানবে না কেন।’
‘আহা, একটু বুঝিয়েও কি বলবে না?’
‘সেদিন ‘দৈনন্দিন’-দোকানটিতে যখন তোমার সর্বশেষ বাজারদরটি উচ্চারিত হচ্ছিল, মানে দোকানের নবযুবাটি যখন তোমাকে ভক্তিভরে ‘নানী’ সম্বোধন করছিল, তখন আমি— ’
‘তুমি একটা খুনী!’
আটানব্বই সালের ‘মলি বশির’ পলকে আটষট্টি সনের ‘মল্লিকা সেন’টি হয়ে আমার হাতখানি ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে আমাকে সোফার উপর ফেলে নিজে দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সোফাটির পাশের হতলে হেলান দিয়ে :
‘ছিলাম আপা-দিদি, থাকতে পারলাম না। হয়ে গেলাম খালা-মাসী— খবরদার, হাসবে না বলছি! একমাত্র খালারাই বোঝেন খালা হবার কী জ্বালা! সে-কষ্টও কবুল করলাম। তা-ও থাকতে দেবে না পাজিগুলি? ডেকে বসবে নানী-দাদী?’
‘তুমিই তো আমাকে শেখাতে যে মুক্তবাজার পাজিও নয়, হাজীও নয়, ও বড়জোর অন্ধ। সেখানে দর নির্ধারণ করে অবাধ প্রতিযোগিতা। সেদিনের প্রতিযোগিতায় তোমার দর নির্ধারিত হয়েছিল ‘নানী’র। দরটি শুনে তুমি তো ফুঁসতে ফুঁসতে তোমার মুটকি বান্ধবী মুনিরাকে নিয়ে বেরিয়ে গেলে বিড়বিড় করতে করতে— ‘না রে না, নানী-দাদীর ভূমিকায় মঞ্চে উঠবো না কখনো, বরং বাজারেই আর আসবো না’।
আমি সন্ধানী দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলাম— তোমার চারপাশে ছিল পনেরো বছরের খুকী, পঁচিশ বছরের দিদি, পঁয়ত্রিশ বছরের আপা, পঁয়তাল্লিশ বছরের খালা। এসব মণিমালার মধ্যে পঞ্চান্ন বছরের মল্লিকাকে কেউ নানী না-ডেকে, আন্টি ডাকবে কেন?’
‘রিপোর্ট তো সব ঠিকই দিচ্ছো। কিন্তু ছিলেটা কোথায় শুনি?’
‘ঈদের ওই জবর ভিড়েও তোমার ঠিক পিছনেই— ’
‘পেছনে লাগার রোগটা বুঝি আর গেল না?’
‘তবেই বোঝ, বাজারদরটা নানীর হলেও কারো কাছে আজো তুমি সেই আপা-দিদি-ভাবী-বৌদি। মানে বাজারদর না-মানা ক্রেতাও থাকে বাজারে এবং ক্রেতা থাকলে বিক্রেতাও থাকে।’
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মলি বললো :
‘এখানেও তোমাদেরই সুবিধে— পুরুষের বাজারদর অতটা বদলায় না— ’
‘বদলায় না মানে? ওই দোকানটিতেই আমি ছিলাম ‘স্যার’, হয়ে গেলাম ‘বস্’, তারপর ‘আংকেল’, অবশেষে ‘মুরুব্বি’— মানে আংকেলের পিতা কার্বাংকেল আর কি! আচ্ছা তুমিই বলো তো মলি, আমার মতো একটা চিরফাজিলও আজকাল না কি মুরুব্বি। মানে যাকে বলে বুজুর্গ?’
‘আমার কাছে তো আজো তুমি একটা ফাজিলেশ্বর ফাজিল— ’
‘এ-জন্যেই তো দুজনের কথাই বললাম : বাজারদর না-মানা ক্রেতা এবং বিক্রেতা।’
মল্লিকার নিঃশ্বাসটি এবার দীর্ঘতর, স্বরও গভীরতর :
‘সেটা আজ নয়, অনেক কাল থেকেই অনুভব করে আসছি আমি। পাশাপাশি দাঁড়ালে দশজন অটোগ্রাফশিকারীর দশটা অটোগ্রাফই বশিরকে দিতে হয়, তোমাকে একটাও নয়। কিন্তু সুধীমহলে লেখক হিসেবে নামটা উচ্চারণ কখনো-সখনো তোমারই হয়, বশিরের কক্খনো নয়।’
‘মাঝেমধ্যে দেখছি আজব গুজবও শোনা মন্দ নয়।’
মলিন হয়ে চললো মল্লিকা। মলিনতর কণ্ঠে বললো ও:
‘কথাটাকে নেহাত কথার কথা ভাবার কারণ নেই। এখন বরং ভাবের-হাওয়ায়-ভাসা-সেদিনকার-আমার ভালো-না-লাগা এবং রূপের-রসে-মজা সেদিনকার-তোমার ভালো-লাগা গানটা একটু ভাঁজো না শুনি— আমি জানি ওটা আজ তোমার মতো আমারও ভালো লাগবে!’
‘লাগলে তুমি মন দিয়ে শোনো, আমি প্রাণ দিয়ে গাই :
খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি আমার মনের ভিতরে।
কত রাত তাই তো জেগেছি, বলব কী তোরে
