সাদা ভাত

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২০, ১৯:২৮

মেঘের কোলে চাঁদ, একবার ডুবছে আবার চাঁদ জাগছে। আতর আলীর কিশোরী মেয়ে কুলসুম চাঁদ দেখছে, আর ছড়া কাটছে। ‘আয়রে খোকন ঘরে আয়/ দুধমাখা ভাত কাকে খায়...।’

দুধমাখা ভাতের ছড়ায় খোকন আরো বেশি করে কাঁদবে এটা বুঝবার মতো বয়স কুলসুমের নয়। ছড়াটির ছন্দ অথবা দুধভাতের ছবি মেয়েটির মনে ধরে থাকতে পারে। কুলসুম আসলে শরতের চাঁদোয়ার নিচে ভাইটিকে নিজের পায়ের ওপর শুইয়ে রেখে ওর বাবার ফিরে আসবার প্রতীক্ষা করছে।

লম্বা করে বিছানো দু’ পা। ছড়া কেটে কেটে আর মাঝে মাঝে ভাইটির মাথা, মুখে হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াচ্ছে কুলসুম। বালিশের বদলে ওর কোলের ওপর খোকনের ঘুমন্ত মাথা নিয়ে ছড়ার তালে তালে ও দুলছে। তবু খোকন থেমে থেমে কাঁদছে। ওর কান্না থামাতে ঘুমজড়ানো চোখ খুলে কুলসুমও পা নাড়িয়ে নাড়িয়ে বার বার ছড়া কাটে। আসলে খোকনের কান্নাই কুলসুমকেও জাগিয়ে রাখতে সাহায্য করছে। কুলসুম জেগে জেগে কিছুক্ষণ পরপর ভাই, আবার চাঁদও দেখে।

গোলগাল চাঁদটা সূর্য ডুবলে পুবদিকে উঠেছিল। তখন সে ছোট ভাইকে নিয়ে উঠোনে চাটাই পেতে বসেছিল। এখন চাঁদটা অনেকখানি ওপরে উঠে গেছে। দেখতে দেখতে ওর মনে হয়, চাঁদটা একটা সাদা ভাতের থালা। কুলসুম একবার ভাবে এতে সাদা ভাত আছে, আরেকবার ভাবে না, থালাটা খালি। এসব ভাবতে গিয়ে ওর খিদের কথা আরো বেশি মনে পড়ছে। সারাদিন সে ভাত খায়নি। ওর বাপ চাল নিয়ে এলে ভাত রান্না হবে, তারপর ওরা সাদা ভাত খেতে পারবে।  

একটা বাদুড় উড়ে যায়। গাবগাছে নিমপাখি ডাকে—‘কু কু কু, কু কু কু।’ কুলসুম তখন মায়ের গলা শুনতে পায়, ‘দূর যা অলক্ষ্মী, দূর যা...।’

অনেকক্ষণ পর কুলসুম মায়ের গলা শুনতে পায়। কুলসুমের মা আম্বিয়াও উনুনের পাড়ে বসে আছে। বিকেল থেকে প্রতীক্ষা ছাড়া তারও কিছুই করার ছিল না। এখন সে অলক্ষ্মী পাখি তাড়াবে। সে মাছ উল্টাবার টাক্কার সুচালো লেজ কুপির শিখায় গরম করবে। তপ্ত খুন্তির তাপে গাবগাছের ঝোপে বসা নিম পাখির লেজ গরম হবে, পাখিটা উড়ে যাবে, বাড়ির অলক্ষ্মী দূর হবে। কিন্তু ঘরে বাতি জ্বলছে না। কুপির তেল আছে কি না সে জানে না। আলোর দরকার না থাকলে এমনিতেও ওর মা বাতি নিভিয়ে রাখে।

আম্বিয়া অলক্ষ্মী তাড়িয়ে চুপচাপ বসে আবার প্রতীক্ষা করতে থাকে। সে অন্ধকারে কান পেতে রাখে। হাটুরে লোকজনের সাড়াশব্দ নাই। তখন সে রশিদের গলা শুনতে পায়, ‘গনি মিয়া একজন কৃষক, তার নিজের জমি নাই, গনি মিয়া ইজ এ...।’ আম্বিয়া ভাবে, আতর আলীর নিজের জমি নাই, পরের জমিনে খাটে। বেপারির জমিন আধি করে। চারমাসের খোরাকি হয়...।

তারপর বসে বসে সংসারের কথা ভাবতে থাকে আম্বিয়া। সারা বছর গতর খাটে রশিদের বাপ। লোকটা কাজ না করে থাকতেই পারে না। খাটতেও পারে। তেঁতুলগাছের মতো শক্ত শরীর তার। আলসেমি করে না, বসে থাকে না। তবু সংসার চলে না। মুনিষ খেটে, গতর খাটিয়ে দিন কি যায়? বুদ্ধিও খাটাতে হয়। চেষ্টা সে করেনি তা-ও নয়। বেপারির কাছ থেকে কর্জ নিয়ে বাবুর হাটের লুঙ্গি-গামছা এনে হাটে হাটে বেচত। তাতে সংসারও চলছিল ভালোই। একদিন ভৈরব স্টেশনে একজনের সাধা পান খেয়ে সব গেল। দেখতে শুনতে পরহেজগার মনে হয়েছিল। টুপি-দাঁড়িওয়ালা লোকটা সেধে সেধে পান খাওয়াল আর তার পর হুঁশ হলো পরদিন, ময়মনসিংহের ট্রেনের কামরায়। বেপারির কর্জ শোধ দিতে আতর আলীর গতরখাটা বাড়াতে হলো। তাছাড়া কী আর করার ছিল? কালো অক্ষর তো বুকে নেই। কালো অক্ষরের কথা আতর আলীই বলে, ‘লেখাপড়া না জানলে গতর খাটা ছাড়া উপায় কী।’ সে রশিদকেও এই কথা বলে, ‘পড়ালেখা ভালো করে কর, না করলে আমার মতন গতর খাটতে হবে।’ তখন আম্বিয়ার কান ঘরের দিকে যায়, রশিদ পড়ছে, ‘লক্ষ আশা অন্তরে / ... মোদের মাঝে সন্তরে...।’

আশা নিয়েই আম্বিয়াও বাঁচে। বাপের আশা পূরণ করবে। মাস্টার সাহেব বলেন, ‘ছেলেটার ব্রেন ভালো, কষ্ট করে পড়াও। একদিন নামডাক হবে। তোমাদের দুঃখ দূর হবে। বৃত্তি পেলে পড়ার খরচ নিয়ে ভাবতে হবে না।’

ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে আতর আলী। তাই সে পাড়াপড়শি এমনকি নিজের ভাইয়ের কথায়ও কান দেয় না। আপন চাচা, সে বলে কি না, ‘পোলাডারে দিয়া দাও ভূইয়া বাড়িতে পেটেভাতে। সংসারের একটা মুখ কমলেও তোর মাথার বোজা হালকা অইব।’

ভাবতে ভাবতে আম্বিয়া দেখে, আসমানে চাঁদের ওপর আবার মেঘ, আর উঠোনে ছাওয়াল দুটি ঝিমুচ্ছে। ঘরে রশিদ পড়ছে, ‘লক্ষ আশা অন্তরে...। রশিদের বাপ মাস্টারের কথা ছাড়া আর কারো কথায় কান দেয় না। আম্বিয়াও তা-ই মনে করে, পেটের পোলাপান কখনো বোঝা হয়?

বিরতি দিয়ে দু’ বার পেঁচা ডাকে। অনেকক্ষণ পর একপাল শেয়াল হাঁকে। আম্বিয়া তারপরও প্রতীক্ষা করতে থাকে। চারদিক স্তব্ধ হয়ে গেলে আতর আলীর গলা।

‘মা কুলসুম। রশিদ...।’

পথ চেয়ে চেয়ে কুলসুম উঠোনে ঘুমিয়ে পড়েছে। রশিদও বাপের গলা শুনতে পায়নি। আতর আলী বুঝতে পারছে, ক্ষুধায় কাতর হয়ে রশিদও নেতিয়ে পড়েছে। আম্বিয়া নীরবে উঠে নীরবেই রান্নার আয়োজন করতে লাগে। ক্ষুধা ওকেও কাবু করে ফেলেছে। আর নিশুতি রাতে আহ্লাদ দেখিয়ে স্তব্ধতা ভঙ্গ করবারও কোনো ইচ্ছা ওর নেই। যত দ্রুত পারে ভাত ফুটিয়ে বাচ্চাগুলোর মুখে তুলে দিতে যা করা দরকার সেদিকে মনোযোগ দেয়। উনুনের মুখে পাটকাঠি আর খড়কুটো যত্ন করে ঠেলে দিয়ে কুপি উল্টিয়ে ক’ফোঁটা কেরোসিন ঢেলে আগুনকে খুশি করে সে। আতর আলী হাত-মুখ আর পা ধুয়ে এসে অহেতুক উনুনের পাড়ে বসে হাত সেঁকতে থাকে। 

রশিদ ততক্ষণে চোখ মেলেছে। সে ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। বাপকে জিজ্ঞেস করে, ‘আব্বা, খাতা আনছ?’

আতর আলীর মনে পড়ে, ছেলেটা অঙ্ক খাতা আনতে বলেছিল। সে আম্বিয়ার মুখের দিকে তাকায়। সে আগে থেকেই রাগ করে আছে। রাগ করবারই কথা। খাতা আনেনি শোনে আরো রাগ বাড়বে। দোষ স্বীকার করে আতর আলী বউয়ের কাছে কৈফিয়ত দেয়, ‘ভুল অয়া গেল। চাউল কেনার সময় খাতা কিনবার কথা মাথায় ছিল না। চাউল একসের কম আনলেই খাতা আনতে পারতাম। ভাবলাম, চাউল থাকলে শাকপাতা দিয়াও পোলাপান মুখে দিতে পারব।’

আম্বিয়া কথা না বলে চুলোয় ভাতের দিকে তাকিয়ে আছে। মাটির হাঁড়িতে ভাত ফুটছে কৈ মাছের ফুট ফেলার মতো। অপরাধী চোখে ছেলের দিক তাকালে বাপের অসহায় দৃষ্টি মনের ভেতর যোগ-বিয়োগ করে রশিদ একটা ফলাফল বের করে নেয়। হাসিমুখে বলে, ‘পরে আইনা দিও।’ ঘরে যায় সে। আবার পড়া মুখস্থ করতে বসে, ‘লক্ষ আশা অন্তরে...।’

আতর আলী উনুনের পেছনে পিঁড়িতে বসে নিশীথের পেঁচার মতো তাকিয়ে আছে। আলো-আঁধারে আম্বিয়ার নাকফুল তারার মতো মিটমিট করে জ্বলছে। তবু ওর হিমশীতল নীরবতা আতর আলীর বুকে ভীষণ লাগছে। সে অযথাই হাত সেঁকতে থাকে এবং মনে মনে কোনো একটা ছুঁতো খুঁজতে থাকে। সহসা ওর কাসেমের কথা মনে পড়ে।

‘কাসেম আইছল?’

কাসেমের প্রসঙ্গে আম্বিয়ার প্রসন্ন হওয়ার কারণ ছিল না। আম্বিয়ার কটাক্ষে আতর আলীও পরক্ষণেই বুঝতে পারে। সে পরিবেশটা হালকা করতে চায়। কিন্তু আর কোনো অছিলা পায় না। আম্বিয়া নীরব আছে সেটাই ভালো, তা না হলে পাড়াপড়শি জেগে উঠতে পারে। সে ভাবে, দিনভর দানাপানি ছাড়া কার মেজাজ ঠিক থাকে?

মাটির চুলায় ভাতের হাঁড়ি, ভাত ফুটছে টগবগ। আর কতক্ষণ! আজ আগুনেরও তাপ নাই। আতর আলী জানে, পোলা-মায়ার পাতে গরমভাত তুলে দিতে পারলে আম্বিয়ার মন ঠান্ডা হবে। ভাত হতে হতে সে বরং কুলসুম আর খোকনের কাছে গিয়ে মশা তাড়াবে।

আতর আলী ঘুমন্ত ছেলে-মেয়ে দুটির মুখের দিকে তাকায়। ওদের ঘুমন্ত মুখে হাত বুলিয়ে দেয়। কুলসুম ঘুমের মধ্যেও ছড়া কাটে, ‘দুধমাখা ভাত কাকে খায়।’ শুনে আতর আলীর হাসি পায়। কষ্টের হাসিটা কেউ দেখতে পায় না। ভাবে সে, সারাদিন খেতে পায়নি তবু মেয়েটা ঘুমের মধ্যে দুধভাতের ছড়া কাটছে। চাঁদের ওপর থেকে মেঘ সরে যায়। তখন মেয়েটা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আরেক রকম ছড়া কাটে, ‘আয় আয় চাঁদ মামা, চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা।’ আতর আলী তখন চাঁদের দিকে তাকায়। চাঁদের কোল ঘেঁষে তুলোর আঁশ। চাঁদের বুড়ি সুতো কাটে। বুড়ির ভুখ নাই, নিদ নাই। তারপর বাচ্চাটার চুপসে যাওয়া মুখ দেখে। তখন ঘরের ভেতর রশিদের গলা শুনতে পায়, ‘চালাও সে-পথে যে-পথে তোমার প্রিয়জন গেছে চলি...।’ বারবার সে একই পড়া পড়ছে।

আতর আলী কান খাড়া করে শুনতে থাকে। আর ভাবে, রশিদ যেন ওকে সন্ধ্যাবেলার ঘটনাটা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

‘অত কষ্ট না কইরা আমরার লগে ল। রাইতের আন্ধারে একবার বার অয়া দেখ, দিনের বেলা আর চক্ষে আন্ধার দেখবি না। যা পামু তার সমান সমান ভাগ। ভাইবা দেখ। রাইতে রেডি থাহিস। ডাকলে বাইর অয়া আহিস।’

রশিদ পড়ছে, ‘যে পথে তোমার চির অভিশাপ/ যে পথে ভ্রান্তি, চির পরিতাপ/ করো না সে পথগামী।’ তখন চাঁদের ওপর থেকে মেঘ সরে গেছে।

তারপর থালাবাটির টংটাং। আম্বিয়ার গলা, ‘রশিদ, তর বাপেরে ক ছোড দুইডারে তুলতো।’

আতর আলী খোকনকে কোলে তুলে নেয়। কুলসুম মায়ের গলা শুনে নিজে থেকেই উঠে পড়ে। চোখ কচলাতে কচলাতে ঘরে আসে।

চাটাইয়ের ওপর অর্ধচন্দ্রের মতো আতর আলীর পুরো সংসার। ঘরের বাতাসে সোঁদা গন্ধ। ঘুমকাতুরে খোকন ড্যাবডেবে চোখে গামলায় সাদা ভাতের দিকে তাকিয়ে আছে। আম্বিয়া এক এক করে থালায় ভাত বেড়ে দিচ্ছে। কুলসুম দুপুরে ডোবায় সাঁতরিয়ে কলমি শাক তুলেছিল। আর খেসারির ডাল রান্না করে রেখেছিল বেলা থাকতেই। হাপুসহুপুস ডালভাত খায় ছেলেমেয়ে দুটো। খোকনকে ওর মা ভাত মাখিয়ে মুখে তুলে দেয়।

ছেলেপুলে খাইয়ে স্বামী-স্ত্রী খেতে বসে। অতক্ষণ পর আম্বিয়া চোখ রাখে আতর আলীর চোখে। ওর ভেতরের বরফ গলে পানি হয়ে গেছে। আতর আলী সাদাভাতে বেগুন ভর্তা মাখিয়ে আম্বিয়ার নাকফুল দেখতে দেখতে খেতে থাকে। ওর সংসারের অন্ধকারে নাকফুল তারার মতো জ্বলছে। কয়েক গ্রাস গলধঃকরণ করে আতর আলী এক চেনা সুবাস পায়। আর মুহূর্তকাল পর রসনায় জ্বলে তৃপ্তির আগুন। চোখ তুলে তাকালে আম্বিয়া রণভঙ্গ দিয়ে হেসে ওঠে। কেমন জব্দ!

আহার শেষ করে স্বামী-স্ত্রী শুয়ে পড়ে। তারা পরস্পর কাছেও আসে। তখন বাইরে কারো গলাখাকারি। স্বামী-স্ত্রী কান পাতে অন্ধকারে।

কাসেমের গলা, ‘আতর আলী, বাইর অ।’

আতর আলী আম্বিয়ার চোখের দিকে তাকায়। ওর মুখে নিষেধের ছায়া। আতর আলী জানে, দু’বেলা দু’মুঠো সাদা ভাত ছেলেমেয়েগুলোর মুখে তুলে দিতে পারলেই আম্বিয়া সুখী। তারপর আলাদা চৌপায়ায় ঘুমন্ত সন্তানের দিকে তাকায় সে। তখন রশিদের গলা ওকে সচকিত করে তোলে—‘যে পথে ভ্রান্তি, চির পরিতাপ করো না সে পথগামী...।’

আবার কাসেম অন্ধকারে দাঁড়িয়ে তাড়া দেয়, ‘কী রে, জলদি বাইর অ। রাইত মেলা অইছে।’ জবাবে আতর আলী স্পষ্ট আর বলিষ্ঠ কণ্ঠে তাকে জানিয়ে দেয়, ‘না, যামু না তরার লগে। আন্ধারের কাম আমি জীবনেও করুম না।’