কোনো ধরনের পূর্বশর্ত ছাড়াই ইরানের সঙ্গে ‘সিরিয়াস’ আলোচনায় বসতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘে দেওয়া এক চিঠিতে ইরানের জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার যুক্তি তুলে ধরে এই অবস্থানের কথা জানিয়েছে দেশটি। তবে ইরান জানিয়েছে, অর্থনৈতিক অবরোধের মধ্যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা সহযোগিতায় যাবে না তেহরান, বরং আরো হামলা হবে। খবর বিবিসি ও আল জাজিরার।
গত শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে ইরাকে ড্রোন থেকে হামলা চালিয়ে কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে মার্কিন সামরিক বাহিনী। এর বদলা হিসেবে মঙ্গলবার ইরাকে অবস্থিত দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। ঐ হামলায় ৮০ জনের বেশি মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে দাবি করে ইরান।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার জানান, ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় কোনো সেনা মারা যায়নি। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা বাদ দিলে শান্তি স্থাপনে তিনি প্রস্তুত আছেন। শিগিগরই ইরানের ওপর আরো শাস্তিমূলক অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হবে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র আপাতত সামরিক হামলা করছে না।
জাতিসংঘ সনদের ৫১ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো রাষ্ট্র যদি নিজেদের রক্ষার জন্য পদক্ষেপ নেয় তাহলে সেটি দ্রুত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে অবহিত করতে হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে দেওয়া এক চিঠিতে জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত কেলি ক্র্যাফট বলেন, ইরানের দ্বারা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা যাতে হুমকির মুখে না পড়ে এবং উত্তেজনা যাতে বৃদ্ধি না পায় সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় বসতে প্রস্তুত আছে। চিঠিতে বলা হয়, সোলেইমানি হত্যাকাণ্ড সঠিক পদক্ষেপ ছিল। মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সেনা এবং স্বার্থ রক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেবে।
অন্যদিকে জাতিসংঘ সনদের ৫১ ধারা উল্লেখ করে ইরানও চিঠির মাধ্যমে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার যৌক্তিকতা তুলে ধরেছে। জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত মাজিদ তখত রাভানচি এক চিঠিতে জানিয়েছেন, ইরান কোনো যুদ্ধ কিংবা উত্তেজনা বাড়াতে চায় না। মার্কিন ঘাঁটিতে সুনির্দিষ্ট এবং যথাযথ সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরান আত্মরক্ষার চেষ্টা করেছে। এই অভিযান ছিল সুনির্দিষ্ট সামরিক পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে সামরিক ছাড়া কোনো বেসামরিক মানুষ এবং তাদের সম্পদের কোনো ক্ষতি হয়নি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনার খবরে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা সহযোগিতায় যাবে না ইরান। জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত রাভানচি ট্রাম্পের বক্তব্যের পর এ কথা জানিয়ে দিয়েছেন। এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভুল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হুমকি দিয়ে বলেছে, ইরান শিগিগরই আরো কঠোর প্রতিশোধ নেবে। আইআরজিসির বিমান বাহিনীর প্রধান আমিরালি হাজিজাদেহ বলেছেন, ইরাকে মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে হামলা আমেরিকান সেনা হত্যার উদ্দেশে ছিল না। বরং যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করা ছিল মূল উদ্দেশ। আর ঐ হামলা ধারাবাহিক হামলার শুরু মাত্র। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনাদের বিতাড়িত করাই হবে সোলেইমানি হত্যার যথাযথ প্রতিশোধ। ইরানের শত শত ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত রয়েছে।
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে গতকাল এক ফোনালাপে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে ব্রিটেন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন এবং বৈরিতার ইতি টানতে আহ্বান জানান।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট চার্লস মিশেলও ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলাপ করেছেন। তিনি ইরানকে অপরিবর্তনযোগ্য পদক্ষেপ পরিহার করে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির শর্ত মানতে আহ্বান জানিয়েছেন। ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে উত্তেজনা পরিহার করে সংলাপ ও আত্ম সংযমের পথ অনুসরণ করতে আহ্বান জানিয়েছেন। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ালেও জাপান সরকার দুই পক্ষকে সংযত আচরণ করার আহ্বান জানিয়েছে।
অন্যদিকে ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার পর কোয়ালিশন বাহিনীতে থাকা সেনাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেছে বিভিন্ন দেশ। কানাডা জানিয়েছে, সেনাদের নিরাপত্তার স্বার্থে ইরাক থেকে তারা কিছু সেনা সরিয়ে কুয়েতে নেবে এবং তাদের কর্মকাণ্ড সাময়িকভাবে বিরত রাখবে। যদিও অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন জানিয়েছেন, সামরিক মিশনে থাকা অস্ট্রেলিয়ার সেনা ও কর্মকর্তারা ইরাকেই থাকবে।
