রাজধানীর শেরেবাংলানগরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পাবার পর একজন শিক্ষক মাস্টার্স করার জন্য ছুটি নেন। মাস্টার্স শেষে পিএইডি ডিগ্রি অর্জনের জন্য আবারও দীর্ঘ ছুটি নেন। একই সময় বৃত্তির টাকা ও পূর্ণ বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আর দেশে ফিরে আসেননি। বিদেশের একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়ে দিব্যি আরাম আয়েশে আছেন। এটি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত চিত্র।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাঠদানে নিয়োজিত থাকার কথা থাকলেও বিভিন্ন ধরনের ছুটিতে বছরের পর বছর পার করছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি অংশ। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪ হাজার ৫৫৬ জন শিক্ষক রয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ১৪৪ জন রয়েছেন শিক্ষাছুটিতে। প্রেষণ ও লিয়েনে আছেন ৭০ জন। বিনা বেতনে ছুটিতে আছেন ৭০ জন। অননুমোদিত ছুটিতে আছেন ২৫ জন। আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে আছেন প্রায় ১ হাজার ১০০ জন শিক্ষক। এরা পাঁচ ধরনের ছুটিতে আছেন।
তবে এর বাইরেও তথ্য গোপন করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, এনজিও, ব্যবসা, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন ধরনের চাকরি করছেন। এদের কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৬৫৭ শিক্ষকের মধ্যে শিক্ষাছুটিতে আছেন ২৬৯ জন। প্রেষণে আছেন ১৭ জন, বিনাবেতনে ১১ জন, অননুমোদিত ছুটিতে আছেন ৩ জন। খণ্ডকালীন ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে ছুটিতে আছেন ২৩১ জন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৩ জন শিক্ষকের মধ্যে শিক্ষাছুটিতে আছেন ৫২ জন। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এ্যানিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩০ জন শিক্ষকের মধ্যে ৩৫ জনই ছুটিতে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০৪ জন শিক্ষকের মধ্যে ৭৫ জন শিক্ষাছুটিতে। প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিমাত্রায় ছুটি ভোগ করছেন কিছু শিক্ষক।
এভাবে শিক্ষকদের ছুটি দেওয়ার কারণে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। একটি বিভাগের সর্বোচ্চ কতজন শিক্ষক ছুটিতে যেতে পারবেন এ সংক্রান্ত নীতিমালা না থাকায় সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। উপাচার্য বিভাগের শিক্ষকদের সংখ্যা বিবেচনায় না এনে নিজের ইচ্ছেমতো শিক্ষাছুটি দিচ্ছেন। এতেই সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
একজন অধ্যাপক এই প্রতিবেদককে জানান, একজন শিক্ষক শিক্ষা ছুটিতে গেলে বিভাগ কিভাবে চলবে সে বিষয়ে বিভাগের চেয়ারম্যানের কোনো মতামত নেওয়া হয় না। এতে পাঠদান ব্যাহত হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, যেহেতু নিয়মানুযায়ী শিক্ষকরা সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত শিক্ষাছুটি নিতে পারেন এবং এ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় তাদের বেতন-ভাতা সবই পরিশোধ করে, তাই সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা আইনের এ ফাঁককে কাজে লাগিয়ে ছুটি নিয়ে অনেকেই বাইরে আয়-উপার্জন করেন। আবার বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও টাকা উত্তোলন করেন। এরপর বিদেশে গমনকারীদের অনেকে সেখানে স্থায়ীভাবে থেকে যান।
একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন, নিজ প্রতিষ্ঠানেও ঠিকমতো ক্লাস নেন—এ ধরনের শিক্ষকও রয়েছে । আবার কেউ কেউ নিজের ক্লাস কোনোমতে শেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন। আবার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষকেও গোপন করছেন। নিজ প্রতিষ্ঠানে পাঠদানে এসব শিক্ষকের এক ধরনের অনীহাও দেখা যায়। শিক্ষক রাজনীতি এবং বিভিন্ন নির্বাচনে জয়লাভের আশায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসন একচেটিয়াভাবে এ অন্যায় কাজকে সমর্থন দিয়ে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার ঢাকার বাইরের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বেশির ভাগ সময় ঢাকায় থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর বা অন্য খণ্ডকালীন চাকরির বিষয়ে নীতিমালা রয়েছে। এ ধরনের চাকরি করলে নিজ প্রতিষ্ঠানকে বাড়তি আয়ের একটি অংশ সার্ভিস চার্জ বা ওভারহেড চার্জ হিসেবে দিতে হবে শিক্ষককে। কিন্তু সেই অর্থ যাতে জমা দিতে না হয় সেজন্যই বেশির ভাগ শিক্ষক নিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনুমতি নেন না।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. সেকেন্দার আলী বলেন, ‘ছুটি দেওয়ার এখতিয়ার একমাত্র উপাচার্যের। ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকদের সংখ্যা বিবেচনায় এনে ছুটি দেওয়া উচিত। কিন্তু উপাচার্যরা এটা না মেনে চললে কী আর করা। তবে গণহারে ছুটি দেওয়া ঠিক নয়।’
