রবি ঠাকুরের দুয়ারে

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৭:৩৬

ভ্রমণপিপাসু মানুষের ভ্রমণ অভ্যাস অনেকটাই তৈরি হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ‘শিক্ষাসফর’ থেকে। শিক্ষাসফর একজন শিক্ষার্থীর জীবনকে করে আনন্দময় ও পরিপূর্ণ। শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব জ্ঞানের সংমিশ্রণ ঘটাতে পারলেই তা হয়ে ওঠে পরিপূর্ণ শিক্ষা। নানারকম ব্যবহারিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে এ পূর্ণতা পায়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের আয়োজনে এ বছর আমরা প্রথম ও দ্বিতীয় আবর্তনের শিক্ষার্থীরা শিক্ষাসফরে গিয়েছিলাম পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। এই শিক্ষাসফরে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্যই ছিল রবি ঠাকুরের ছায়ায় তাকে জানা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা এবং তার বিচিত্র ভাবনাকে প্রত্যক্ষ করা। শুধু বইয়ের পাতায় যা জানতে পেরেছি তা স্বচোখে দেখার সুযোগ পেয়েছি এই শিক্ষাসফরের মাধ্যমে। কেননা, জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, শ্রীনিকেতনে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংরক্ষিত জীবন নিদর্শন।

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি এখন রবীন্দ্রভারতী জাদুঘর নামে পরিচিত। ঊনবিংশ শতাব্দির বাঙালির সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে এই বাড়ির বাসিন্দারা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছিলেন। বর্তমানে এই বাড়ি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন। ১৯৬২ সালের ৮ মে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধন করেন তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামাঙ্কিত মহর্ষি ভবনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই জাদুঘরে রবীন্দ্রনাথের ব্যবহূত বহু জিনিসপত্র দেখলাম। অন্যদিকে, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদুঘরে রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির বিচিত্র অনুবাদ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ এবং নোবেল পুরস্কারের প্রতিকৃতির দেখা পেলাম।

এছাড়াও ছিল প্রিন্সেপ ঘাট, বাগবাজার ঘাট, দক্ষিণেশ্বর, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ, বিরলা মন্দির, গড়িয়াহাট, দক্ষিণাপণ, কলেজ রোড, কফি হাউজ, সিনেমা দেখা এবং বিখ্যাত পিটার ক্যাটে শেষ বেলার রাত্রিভোজ। কলকাতার খাবারগুলো যে অনেক সুস্বাদু ও মজাদার তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

শিক্ষাসফরে গিয়ে আমরা নিত্যদিনের পড়াশোনার চ্যাপ্টার ভুলে আনন্দে মেতে উঠেছিলাম। শিক্ষাসফরের অন্যতম আকর্ষণ ছিল নাচ, গান, অভিনয়, আবৃত্তি, কৌতুকসহ নানা পরিবেশনা। ফলে একদিকে আমাদের যেমন বিনোদন পাওয়া হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি সুপ্ত প্রতিভা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটেছে। এ শিক্ষাসফরে আমরা শিখেছি সাহায্য সহযোগিতা সম্প্রীতির মনোভাব গড়তে। একটি শিক্ষাসফর সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে আনুষাঙ্গিক অনেক কাজ করতে হয়। যাতায়াতের ব্যবস্থা করা, থাকার হোটেল বুক করা, খাবার সরবরাহ করাসহ বেশকিছু কাজ দায়িত্বের সাথে সম্পাদন করতে হয়। এসব কাজ শিক্ষকদের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে করেছি। ফলে আমাদের মাঝে এক ধরনের সাহায্য সহযোগিতা ও সম্প্রীতির মনোভাব গড়ে ওঠে। তাছাড়া এসব কাজ করার মাধ্যমে আমাদের মধ্যে দায়িত্ব ও সচেতনতাবোধ জন্মেছে, যা আমাদের ভবিষ্যত্ জীবনেও বড় ধরনের দায়িত্ব গ্রহণে সাহায্য করবে।

দেশের বাইরে এটিই ছিল আমাদের প্রথম শিক্ষাসফর। বই থেকে অর্জিত জ্ঞান অন্তরে ধারণ করে আমরা শিক্ষাসফরে গিয়েছিলাম সেই অর্জিত জ্ঞান প্রত্যক্ষ করতে। বইয়ের পড়া আর চোখের দেখা এ দুটো মিলে পরিপূর্ণভাবে আলোকিত হয়ে উঠেছে আমাদের অন্তর্লোক।  শিক্ষাসফর আমাদের যেমন মুক্তি দিয়েছে লেখাপড়ার একঘেয়েমি থেকে তেমনি পুস্তক লব্দ জ্ঞানকে দৃঢ়তা ও স্থায়ীত্ব প্রদান করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিন্তা-ভাবনা, শিক্ষা ভাবনা, কৃষি ভাবনা থেকে শুরু করে অনেককিছুই খুব কাছ থেকে স্বচোখে প্রত্যক্ষ করেছি, যা সারাজীবন হূদয় মন্দিরে জাগ্রত হয়ে থাকবে।