দশ দিগন্তে g আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
ঢাকার কাগজে বিদায়ী বছরে বাংলাদেশের সাফল্য ও ব্যর্থতার তালিকা পড়েছিলাম। বর্তমানে ‘প্রথম আলো’ পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় নিরপেক্ষ কলামিস্ট ও সাংবাদিক নামের একটা ‘কাল্ট’ তৈরি হয়েছে। তারা হাসিনা সরকারের বড়ো সাফল্যগুলোকে ছোটো করে দেখেন, ছোটো ব্যর্থতাগুলোকে বড়ো করে দেখান। সুতরাং গত বছরের সালতামামিতেও ‘নিরপেক্ষ কাল্টের’ সাংবাদিকদের লেখায় রয়েছে একধরনের বিশ্লেষণ। অন্যদের লেখায় রয়েছে অন্য বিশ্লেষণ। কাল্টের বাইরে এই লেখকদের মধ্যে প্রবীণ বুদ্ধিজীবী আহমদ রফিকের লেখা আমার ভালো লেগেছে। তিনি সরকারের ব্যর্থতাগুলো সঠিকভাবে তুলেছেন। সাফল্যগুলো বাঁকা চোখে দেখেননি।
আমার ধারণা, ২০১৯ সালে সরকারের বড়ো সাফল্য ক্ষমতায় টিকে থাকা। যে কোনোভাবেই হোক সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরেও এই সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকার কথা ছিল না। অসাম্প্রদায়িক একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যে নাজুক কাঠামোটি এখনো বাংলাদেশে হাসিনা সরকারের কৃপায় টিকে আছে, তা থাকার কথা ছিল না। আবার ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীরা একজোট হয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে না পারলে চক্রান্ত করা—এই সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর যে বিরাট চক্রান্ত করছিল, তা দেশের বাইরে থাকায় আমরাও টের পেয়েছি।
গত সাধারণ নির্বাচনের আগে ২০০১ সালের মতো একটি চক্রান্ত দেশি-বিদেশি সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছিল। এই চক্রান্তটি ছিল আরো বড়ো ধরনের। প্রকাশ্য ফ্রন্টের নেতৃত্বে পুরোনো মুখের সঙ্গে নতুন মুখ যুক্ত করা হয়েছিল। আর নতুন মুখের সবগুলোই ছিল একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা অথবা মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক। যেমন কাদের সিদ্দিকী, আ স ম আব্দুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না প্রমুখ। যাদের সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা যায় না, তাদের কৌশলে বাদ দেওয়া হয়—যেমন ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী। আসলে জোটটি ছিল একটি বর্ধিত বিএনপি জামায়াত জোট। জনগণকে ধোকা দেওয়ার জন্য সামনে আনা হয়েছিল নামের খসম ড. কামাল হোসনকে এবং জোটের নাম রাখা হয়েছিল ঐক্যফ্রন্ট। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ছিল এই ঐক্যফ্রন্টের অঘোষিত মুখপত্র।
এই ঐক্যফ্রন্ট (অনেকে নাম দিয়েছিলেন ঐক্যফ্রড) গত সাধারণ নির্বাচনে ২০০১ সালের কায়দায় নির্বাচনে জয়ী হলে বা নির্বাচন বানচাল করে ষড়যন্ত্রের মাধ্যকে ক্ষমতায় এলে দেশে কী অবস্থা দাঁড়াত? ড. কামাল হোসেন, আ স ম আব্দুর রবেরা ক্ষমতায় বসতে পারতেন না। তারা হতেন ‘কিক্ড আউট’, যিনি অসংখ্য দুর্নীতির মামলায় দণ্ডাদেশ পেয়ে দেশে ফিরে আসতে সাহস পাচ্ছেন না, বিদেশ থেকে ওহি পাঠিয়ে রাজনীতি করছেন এবং সাময়িক কৌশলের জন্য ড. কামাল হোসেনকে তার খেলাফত দান করেছিলেন, তিনি সেই খেলাফতকে বাতিল করে ‘জাতির ত্রাতার’ বেশে দেশে ফিরে আসতেন।
দেশে ফিরেই দশ বছরের জন্য কারাদণ্ডে দণ্ডিত মাতাজিকে জেল থেকে মুক্ত করে এনে প্রেসিডেন্ট পদে বসাতেন। নিজে বসতেন প্রধানমন্ত্রীর গদিতে। মন্ত্রিসভা গঠিত হতো কোণঠাসা জামায়াতি এবং পুলিশের ওয়ান্টেড লিস্টে থাকা লুত্ফজ্জামান বাবরের মতো অধিকাংশ অপরাধীদের নিয়ে। এবার তারেক রহমান কাউকে দয়ামায়া করতেন না। প্রথমেই সেনাবাহিনীতে হাত দিতে সাহস করতেন না। সব কটি সরকারি সংস্থায় বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীতে চলত নির্মম পার্জ। ‘গোপালিদের’ বেছে বের করা হতো। প্রশাসনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ত।
তারেক রহমান লন্ডনের সভায় তার ঘোষণা মতো জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকা বদলাতেন। বঙ্গবন্ধুর জাতির পিতার মর্যাদা হরণের চেষ্টা করতেন। ঘোষণা করতেন তার পিতা জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট এবং রাষ্ট্রের স্থপতি। তার ঘোষণা মতেই দেশ স্বাধীন হয়েছে। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিতেন। শুরু হতো নতুন করে সেতু নির্মাণের নামে দুর্নীতির টেন্ডারবাজি। হাসিনা-সরকারের সব উন্নয়নমূলক কাজ বন্ধ করে দেওয়া হতো। শুরু হতো নব্য ধনী ও অসাধু ব্যবসায়ীদের আরো অবাধ শোষণ-লুণ্ঠন।
রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে অসাম্প্রদায়িকতা ও গণতন্ত্রের যেটুকু অবশিষ্ট আছে, তা মুছে ফেলা হতো। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবার আরো চরমভাবে বিকৃত করা হতো। দেশে ধর্মান্ধতার রাজনীতির দরোজা খুলে দেওয়া হতো। শিক্ষাব্যবস্থায় ভারতের বিজেপি সরকারের অনুসরণে সাম্প্রদায়িক বিকৃতি ঢোকানো শুরু হতো। পাকিস্তানের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপনের দ্বারা ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠী এবং আইএসের জন্য বাংলাদেশের দরোজা খুলে দেওয়া হতো। যেমন খুলে দেওয়া হয়েছিল খালেদা-নিজামীর সরকারের আমলে। জন্ম দেওয়া হয়েছিল বাংলা ভাইদের। বাংলাদেশে পাকিস্তানের মতো জঙ্গি ঘাঁটি প্রতিষ্ঠিত হলে ট্রাম্প সাহেবের খায়েশ পূর্ণ করা হতো। তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় জঙ্গি দমনের নামে মার্কিন সৈন্য বাংলাদেশে পাঠানোর সুযোগ পেতেন। তারপর ড. কামাল সাহেবদের বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার খোয়াব ভেঙে গিয়ে বাংলাদেশ দুঃস্বপ্নের নরকে পরিণত হতো। পাকিস্তান, আফগানিস্তানের মতো রোজ জঙ্গিনামা তৈরি হতো বাংলাদেশে।
আরো কি হতো বাংলাদেশে তা লিখে লেখার কলেবর বাড়াতে চাই না। সৈয়দ মুজতবা আলী তার গ্রন্থে আফগানিস্তানে দস্যু বাচ্চা-ই-সাক্কোর রাজত্বকালের একটা বিবরণ লিখে গেছেন। তার উদ্ভব আবার ঘটত বাংলাদেশে। বর্তমানে শেখ হাসিনা যেভাবেই ক্ষমতায় টিকে থাকুন, তাতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা একটু ক্ষুণ্ন হলেও তা ধ্বংস হয়নি। রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র বদলে যায়নি। বিস্ময়করভাবে উন্নয়নের চাকা ঘুরছে। মানুষের মধ্যে অভাব নেই। একজন অর্থনীতিবিদ বলেছেন, আগে বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্য কম ছিল। তখন মানুষ তা কিনতে পারত না। তাদের হাতে টাকা ছিল না। এখন দ্রব্যমূল্য বেড়েছে। কিন্তু মানুষ তা কিনছে। কেনার সক্ষমতা তাদের অনেক বেড়েছে। ৯ লাখ টাকা দামের কোরবানির গরুও বাজারে অবিক্রিত থাকছে না।
দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, আবাসন সর্বক্ষেত্রেই সংস্কার ও উন্নয়ন চলছে। যা স্বাধীনতার পর সামরিক ও স্বৈরাচারী সরকারগুলোর আমলে চলেনি। উন্নয়ন চলছে। তবে চলছে ধীরগতিতে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংস্কার ও পরিবর্তনের কাজে ধীরগতি থাকবেই। অর্থনৈতিক উন্নয়ন দ্রুতগতিতে করা যায়। হাসিনা সরকার তা করছেন। কিন্তু সামাজিক উন্নয়ন, তথা দুর্নীতি, নানা ধরনের সামাজিক অপরাধ দ্রুত দূর করা সম্ভব নয়। তিন টার্ম ক্ষমতায় থাকলেও নয়। কম্যুনিস্ট দেশে বল প্রয়োগে এই সামাজিক অবিচার দ্রুত দূর করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল তা বেশিদিন টেকেনি।
আমি হাসিনা সরকারের পক্ষে কোনো সাফাই গাইছি না। হাসিনা সরকারের বড়ো বড়ো ব্যর্থতা আছে। আওয়ামী লীগও ধোয়া তুলসি পাতা নয়। তা নিয়ে গঠনমূলকভাবে অবশ্যই আলোচনা করা যায় এবং করা উচিত। কিন্তু আলো-স্টারের তথাকথিত ‘নিরপেক্ষ কাল্টের’ কলামিস্ট ও সাংবাদিকেরা তা কি করছেন? তারা কৌশলে বিএনপি-জামায়াতের প্রচারণাগুলোই এমনভাবে চালাচ্ছেন, যাতে দেশে গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক ব্যবস্থার যেটুকু অবশিষ্ট আছে, তাও ধ্বংস হয়। ক্ষমতায় গণতন্ত্রের নামে সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠি চলে আসে।
ড. কামাল হোসেন ও ড. ইউনূসের নেতৃত্বে এই চক্রান্ত এক এগারোর সময় হয়েছে। এবার সাধারণ নির্বাচনের সময়েও হয়েছে। এক এগারোর আধা সামরিক সরকারকে ক্ষমতায় আনা মাইনাস টু থিয়োরির উদ্ভাবনা কী ড. কামাল হোসেনদের ষড়যন্ত্র ছিল না ? এখনো তিনি তার সুশীল সমাজ নিয়ে ষড়যন্ত্র চালাচ্ছেন। হালে পানি পাচ্ছেন না। তার ষড়যন্ত্র সফল হলে দেশে কী ঘটত তার একটা তালিকা ওপরে দিয়েছি। খোন্দকার মোশতাককে আমরা ষড়যন্ত্রের নায়ক বলি, ড. কামাল তার চাইতেও নিকৃষ্ট। টিকটিকির প্রাণ লেজেও থাকে। ড. কামালের ষড়যন্ত্রের ব্রেন এই বৃদ্ধবয়সেও তাজা রয়েছে।
আমার কথা, হাসিনা সরকারের আমলে দুর্নীতি আছে এবং বেড়েছে। অত্যাচার, অবিচার একশ্রেণির এমপি, মন্ত্রী, দলের বড়ো বড়ো নেতার অত্যাচারে, অবিচারে জনগণের জীবন বিপর্যস্ত এ কথাও মিথ্যা নয়। কিন্তু এই মুহূর্তে এই সরকারের কোনো বিকল্প নেই। বিকল্প খালেদা-তারেকের আধা-তালেবানি রাজত্ব; যা মুক্তিযুদ্ধের সকল অর্জন এবং রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক ভিত্তি সম্পূর্ণ ধ্বংস করবে। এটা জেনেই মহাজোটের বাম নেতারা মন্ত্রিত্ব না পেলেও এবং আওয়ামী লীগ তাদের সুদিনের ঘুঘুর ডাক শোনালেও তারা এখনো মহাজোট আঁকড়ে আছেন।
আমাদের সকলেরই আশা, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক ও সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের নীতিভিত্তিক একটি বিকল্প রাজনৈতিক দল দেশে গড়ে উঠবে। ১৯৪৯ সালে মুসলিম লীগ শাসনের অত্যাচারের যুগে আওয়ামী লীগের জন্ম যেমন আশার বাতি জ্বেলেছিল, তেমনি বর্তমানের সকল সংকট, বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে জনগণের মনে আশার বাতি জ্বেলে আওয়ামী লীগের বিকল্প রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব দেশে গড়ে উঠবে। হয়তো তাতে দুদিন বিলম্ব হবে। কিন্তু সুস্থ রাজনীতির এই শূন্যস্থানটি বেশিদিন শূন্য থাকবে না।
[ লন্ডন, ১১ জানুয়ারি, শনিবার, ২০২০ ]
