পৃথিবীতে প্রতিদিন কত মানুষেরই তো জন্ম হচ্ছে। কিন্তু কতজন তার জন্মটাকে সার্থক করতে পারেন, মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতে পারেন? আজ ১২ জানুয়ারি এমন এক নারী পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছিলেন, যিনি নিভৃতে থেকে মানুষের জন্য, বিশেষ করে নারীদের জন্য আত্মনিবেদন করেছেন। তিনিই তাসমিমা হোসেন। এ দেশের বেশির ভাগ নারীর জন্য দুয়ার থাকে বন্ধ, পথে থাকে কাঁটা বিছানো। সে কারণে প্রতিটি নারীকে এগোতে হয় বাধার দুয়ার ভেঙে ভেঙে। তাসমিমা হোসেন বাংলাদেশের সেই বিরল সাহসী নারীদের একজন, যিনি ‘অপরাজেয় নারী’র নতুন উদাহরণ তৈরি করেছেন।
তাসমিমা হোসেন এ দেশের পুরো নারীসমাজের চিত্রটাকে নানাভাবে তার কাজের মাধ্যমে তুলে এনেছেন। আমরা খুব ভাগ্যবান যে, আমাদের এ সময়কালে এমন একজন প্রতীকী নারীকে আমরা আমাদের মাঝে পেয়েছি। আশির দশকের পর থেকে উদ্বুদ্ধ করেছেন এ দেশের পিছিয়ে পড়া নারীদের, আবার একইভাবে তুলে এনেছেন বহু আলোকিত নারীকে। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তাসমিমা হোসেনকে আমি প্রথম আবিষ্কার করি আমার পড়ার টেবিলে অনন্যা ম্যাগাজিনের প্রথম পাতার সম্পাদকীয় কলামে, সঙ্গে ছাপা হয়েছে তাসমিমা আপার হাসি হাসি মুখের মিষ্টি একটা ছবি। তিনি তার দর্শন এবং চিন্তার মাধ্যমে এমন একটা প্ল্যাটফরম দাঁড় করিয়েছেন সেই অল্প বয়স থেকেই, যা সমাজের অনেক প্রশ্নবিদ্ধ লিঙ্গবৈষম্য আমার চিন্তার জগতকে প্রসারিত করেছে। আমি জানতাম না, কখনো এই মহীয়সী নারীর সঙ্গে আমার সরাসরি দেখা হবে কি না।
আমি বহু বছর ধরে আমার জীবনের এক স্বপ্ন পূরণের তাড়নায় নীরবে ছুটে বেড়াচ্ছি পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। ২০১৪ সালে আমি সুইডেন থেকে যুগোস্লাভিয়া বেল্টের দেশগুলো সফরের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছি। সার্বিয়া থেকে বসনিয়া বর্ডার ক্রস করে তখন পৌঁছেছিলাম বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনার বিশেগ্রাদ শহরে। তুর্কিশ অটোমানদের এবং যুগোস্লাভিয়া যুদ্ধের চিহ্নিত স্থান সেই বিখ্যাত ড্রিনা রিভারের পাড়ে বসে কফি খেতে খেতে নেটে বাংলাদেশের খবরের কাগজে চোখ রেখে হঠাত্ করে আনন্দ আর বিস্ময়ে ভরে উঠল মন—‘ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হলেন তাসমিমা হোসেন।’ খবর পড়তে পড়তেই মনের অজান্তে বলে উঠলাম বাহ দারুণ খবর! তারপর ২০১৮ সালের জুনে আমি তখন জিম্বাবুয়েতে ১০০তম দেশ ভ্রমণ শেষ করে বতসোয়ানা, মোজাম্বিক, লেসোথো, সোয়াজিল্যান্ড সফর শেষে জুলাই মাসে সাউথ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে রওনা হলাম, চলন্ত গাড়িতে বসেই ইন্টারনেটে খবরের পাতায় ভেসে এলো বাংলাদেশের ইতিহাসে জাতীয় দৈনিকের প্রথম নারী সম্পাদক তাসমিমা হোসেন। আমি নিজের অজান্তেই আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠলাম। আফ্রিকা থেকে সুইডেন ফিরে আমি একবার গুগল সার্চ করে দেখি ৩ জুন ইত্তেফাকে আমাকে নিয়ে একটি সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে, আমার ১০০টি দেশভ্রমণের রেকর্ডকে সাধুবাদ জানিয়ে। তারপর একদিন তাসমিমা আপার সঙ্গে ফোনে প্রথম কথা বলার সুযোগ হয়। আমি কিছু বলার আগেই হ্যালো বলেই ওপার থেকে প্রথমে তাসমিমা আপা বলছেন, ‘হোয়াটএভার ইউ আর ডুইং ইটস সো গ্রেট।’ তার কনভারসেশনের প্রথম লাইনই আমাকে দারুণ উত্সাহিত করেছিল। তারপর থেকে চিত্রপট ভিন্ন আঙ্গিকে এসেছে। আমি জানতাম না যে, আমি তার অনন্যা শীর্ষদশের একজন হতে যাচ্ছি। তখন আমি পশ্চিম আফ্রিকা সফরে মৌরিতানিয়া ডেজার্ট থেকে ফিরে নোয়াকচট শহরে অবস্থান করছি। হঠাত্ করে আমার একটা ফোন এসেছিল, বাংলাদেশের পতাকা হাতে বিশ্বভ্রমণের স্বীকৃতি স্বরূপ আমাকে অনন্যা শীর্ষদশের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। ছোটোবেলায় যে মানুষটিকে আমি পড়ার টেবিলে আবিষ্কার করেছিলাম— গত বছর ৩০ জানুয়ারির সকাল ১১টায় সেই আলোকিতা নারী তাসমিমা হোসেনের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় তার অফিসে। কী অসাধারণ একজন মানুষ তিনি! জ্ঞান, আভিজাত্য, রুচিশীলতায় তিনি যেমনি ভরপুর তেমনি খুব সাবলীল, সুন্দর, হাসি-খুশি প্রাণোচ্ছল একজন মানুষ। পাক্ষিক অনন্যা ১৯৮৮ সাল থেকে এখন অবধি তিনি নিয়মিত প্রকাশ করে আসছেন। এই পত্রিকা থেকে বছরে দুটো সম্মাননা প্রদান করা হয়। ১৯৯৪ সাল থেকে প্রদান করা হচ্ছে ‘অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার’। অন্যদিকে, ১৯৯৩ সাল থেকে প্রদান করা হচ্ছে ‘অনন্যা শীর্ষদশ সম্মাননা’। এই সম্মাননার মাধ্যমে সমাজের সব নারীর কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়—যেসব নারী নিজেকে ভীরু, অবলা, অসহায় বলে মনে করেন, তারা জানুক— মেয়েরা পারে না, এমন কোনো কাজ নেই। ১৯৯৬ সালে সরাসরি জনগণের ভোটের মাধ্যমে উপনির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। অথচ রাজনৈতিক কিংবা জাগতিক সব অর্জনের সম্ভাবনাকে পাশ কাটিয়ে তিনি আত্মনিয়োগ করেন এ দেশের নারীর সামগ্রিক উন্নয়নে।
বহু শতাব্দী ধরে পৃথিবীতে এমন মানুষের জন্ম আমাদের ঘুণে ধরা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জমে থাকা কালো অশুভ ছায়াকে সরিয়ে দিয়ে আলোর উদয়ন ঘটিয়েছে। তাসমিমা হোসেন তেমনই একজন মানুষ। যাদের বাধার দুয়ার ভেঙে এগোতে হয়, সেই পিছিয়ে পড়া নারীদের স্বপ্ন দেখাতে ভালোবাসেন তাসমিমা হোসেন। শুভ জন্মদিন প্রিয় তাসমিমা আপা। (ইয়াঙ্গুন থেকে)
n লেখক :অনন্যা শীর্ষদশ বিজয়ী, বাংলাদেশের পতাকাবাহী প্রথম বিশ্ব পর্যটক
