শেষ পর্যন্ত তেহরানে ইউক্রেনের যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করার দায় স্বীকার করেছে ইরান। তারা এই ঘটনাকে অনিচ্ছাকৃত তবে ক্ষমার অযোগ্য মানব-ভুল বলে বর্ণনা করেছে। এ ঘটনার স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেছে কানাডা। আর দোষীদের শাস্তি ও ইরানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইউক্রেন। খবর:বিবিসি, সিএনএন ও আল জাজিরার।
গত ৩ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে ড্রোন থেকে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়। এই হত্যার বদলা নিতে গত বুধবার ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। এর কয়েক ঘণ্টা পরই ইউক্রেন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট পিএস৭৫২ তেহরানে বিধ্বস্ত হয়। বিমানের ১৭৬ আরোহীর সবাই নিহত হন। ফ্লাইটটি ইউক্রেনীয় রাজধানী কিয়েভ হয়ে কানাডার টরেন্টোর দিকে যাচ্ছিল, কিন্তু উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরই ইমাম খামেনি বিমানবন্দরের কাছে আছড়ে পড়ে বিমানটি। নিহতদের মধ্যে ইরানের ৮২, কানাডার ৫৭, ইউক্রেনের ১১, সুইডেনের ১০, আফগানিস্তানের চার এবং যুক্তরাজ্য ও জার্মানির তিন জন করে নাগরিক ছিলেন।
বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর থেকে ইরান এটিকে দুর্ঘটনা বলে দাবি করে। তবে প্রাথমিক গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডা দাবি করে যে, বিমানটি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিধ্বস্ত হয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমস ও সিএনএনের পাওয়া ভিডিওতে দেখা যায় যে, তেহরানের রাতের আকাশে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ঝলকানি দেখা যাচ্ছে এবং একটি বিমানের সংস্পর্শে আসার পর সেটি বিস্ফোরিত হচ্ছে। এর ১০ সেকেন্ড পর বিস্ফোরণের বিকট শব্দ মাটি থেকে শোনা যায়। আর আগুন ধরে যাওয়া বিমানটি উড়তে থাকে। পশ্চিমা দেশগুলোর ভিডিও প্রকাশের পর তেহরানের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত আগের অবস্থান থেকে সরে দায় স্বীকার করে নিয়েছে ইরান।
গতকাল শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়, ভুল করে ফ্লাইট পিএস৭৫২ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। রেভল্যুশনারি গার্ডের একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছাকাছি যাত্রীবাহী বিমানটি চলে এসেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা চরমে থাকায় ইরানের সামরিক বাহিনী সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে ছিল। এমন অবস্থায়, মানব-ত্রুটির কারণে ফ্লাইটটিতে আঘাত হানা হয়। বিমানটিকে ভূপাতিত করার কারণে বিবৃতিতে ক্ষমা চেয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সঙ্গে যারা জড়িত ছিল তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ইরান পূর্ণ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে। পাশাপাশি তারা তদন্তে অংশ নিতে ইউক্রেন, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিমান দুর্ঘটনার তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। বিধ্বস্ত বিমানের ব্ল্যাকবক্সের রেকর্ডিং ফ্রান্সে ‘ডাউনলোড’ করা হবে বলে ইরানের তদন্ত সংস্থা জানিয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি এই ভুলের বিষয়ে সামরিক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এক বিবৃতিতে আগামীদিনে এ ধরনের ভুল এড়াতে তিনি পদক্ষেপ নিতে বলেছেন। সামরিক বাহিনী স্বীকার করার পর গতকাল এক টুইট বার্তায় ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেন, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা ক্ষমার অযোগ্য ভুল। শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি আমি আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি। যদিও এক টুইট বার্তায় ইরানের পররাষ্ট্রন্ত্রী মোহাম্মদ জাভাদ জারিফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হঠকারিতা ইউক্রেনীয় বিমানটি ভূ-পাতিত হওয়ার জন্য আংশিকভাবে দায়ী। আমাদের জনগণ, নিহত ব্যক্তিদের স্বজন ও ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য জাতির প্রতি গভীর দুঃখ ও সমবেদনা প্রকাশ করছি।
রেভল্যুশনারি গার্ডের সিনিয়র কমান্ডার আমিরালি হাজিজাদেহ সব দায় কাঁধে নিয়ে বলেছেন, এই দৃশ্য দেখার চেয়ে আমি মরে যেতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতাম। যোগাযোগ বিভ্রাটের কারণে এটা ঘটেছে। ক্ষেপণাস্ত্র যারা ছুড়েছেন সিদ্ধান্ত নিতে তাদের হাতে ১০ সেকেন্ডের মতো সময় ছিল। যুক্তরাজ্যে ইরানের রাষ্ট্রদূত হামিদ বায়েদিনেজাদ এক টুইট বার্তায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কারণ একদিন আগেই তিনি ব্রিটিশ গণমাধ্যমের কাছে বিমান বিধ্বস্তে তার দেশের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।
এদিকে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনাকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো জাতীয় ট্রাজেডি বলে মন্তব্য করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি জবাবদিহিতা এবং স্বজনহারা পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার দাবি করেছেন। তিনি বলেন, পূর্ণ তদন্তের জন্য আমরা বিশ্বের অন্য অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করে যাব।
ইরান দায় স্বীকার করার পর একটি নিরপেক্ষ তদন্ত ও যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রত্যাশা করে বিবৃতি দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক কমিশন তদন্ত শেষ করার আগেই ইউক্রেনীয় বিমান ভূপাতিত করার অপরাধ স্বীকার করে নিল ইরান।
ইরানের ঘোষণার পর বিবিসির প্রধান আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা লিসে ডুসেট এক বিশ্লেষণে বলেন, খুবই কঠিন মুহূর্তে এটি ইরানের বড়ো স্বীকারোক্তি। ইরান পশ্চিমাদের সঙ্গে নতুন করে বাগ্যুদ্ধ এড়াতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই স্বীকারোক্তি উত্তেজনা প্রশমনের জন্য নেওয়া পদক্ষেপ। তবে বড়ো প্রশ্ন হলো- উত্তেজনাকর মুহূর্তে বেসামরিক বিমান চলাচলে অনুমতি কে দিয়েছিল?
