শিশুদের নিউমোনিয়া

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৯:২৩

মানব দেহের একটি অত্যাবশ্যকীয় অঙ্গ হচ্ছে ফুসফুস। আমরা বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত শ্বাস প্রশ্বাস নিচ্ছি এই ফুসফুসের সাহায্যে। আর ফুসফুসে যখন প্রদাহের সৃষ্টি হয় তখন তাকে বলা হয় নিউমোনিয়া। নিউমোনিয়া প্রধানত: শিশুদের একটি শ্বাসকষ্ট জনিত রোগ। এটি একটি মারাত্মক ব্যধি। যে শ্বাসতন্ত্রের দ্বারা শ্বাস প্রশ্বাস কার্য পরিচালিত হয় তা প্রধানত: নাক থেকে ফুসফুস পর্যন্ত পরিব্যপ্ত। শ্বাসতন্ত্রের ইনফেকশনকে বলা হয়  এ্যাকুডট রেসপারেটরী ইনফেকশন বা এ আর আই। শ্বাসতন্ত্রে যদি ইনফেকশন হয় তবে আতঙ্কিত হবার কোন কারণ নেই। কারণ শ্বাসতন্ত্রের ইনফেকশন নিউমোনিয়া নয়। নিউমোনিয়ার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ফুসফুসে প্রদাহ হয়ে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়।

নিউমোনিয়ার উপসর্গসমূহ:

২ মাসের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে-

lসর্দি এবং কাশির সাথে প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট। এ বয়সী শিশুরা যদি মিনিটে ৬০ বা তার চেয়ে বেশিবার শ্বাস নেয় তবে বুঝতে হবে শিশুটি জটিল নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। যা কিনা শিশুটির জন্য খুবই মারাত্মক।

lবুকের ভিতর বাঁশির মত সাঁই সাঁই আওয়াজ হওয়া।

lগলার স্বরের পরিবর্তন হওয়া।

lঘুমের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া।

lখাদ্যে অনিহা।

lশরীর ম্যাজম্যাজ করা, কখনোও খিঁচুনি হওয়া।

lমাঝে মাঝে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া, কখনও তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যাওয়া।

lদ্রুত শ্বাস নেবার সময় বুকের নীচের অংশ ভিতরে বসে যাওয়া।

২ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে।

lসর্দি কাশির প্রকোপতা বৃদ্ধি পাওয়া।

lশ্বাস কষ্টের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া অর্থাত্ ২ মাস থেকে ১ বছর বয়সী শিশুরা প্রতি মিনিটে ৫০ বা তার বেশি বার এবং ১ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুরা প্রতি মিনিটে ৪০ বা তার বেশি বার শ্বাস নেয়।

lখিঁচুনির সৃষ্টি হওয়া।

lগলার স্বর পরিবর্তন হওয়া।

lঅস্বাভাবিক ঘুমের প্রবণতা।

lখাবারে অনিহা এসে পানি পর্যন্ত না খেতে পারা।

lঅপুষ্টি জনিত সমস্যায় ভোগা।

নিউমোনিয়ার প্রতিরোধ ও প্রতিকার মূলক ব্যবস্থা:

শশুদের শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ বা ইনফেকশন যদিও নিউমোনিয়া নয়, তবুও এব্যাপারে বাচ্চার পিতা মাতাকে সচেতন থাকতে হবে। এ, আর, আইটি হলে শিশুকে উজ্ঞ রাখতে হবে, নাক সবসময় পরিষ্কার রাখতে হবে, বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করা যাবে না। আদার রস, মধু, তুলসী পাতা, লেবুর রস ইত্যাদি খাওয়াতে হবে। আর শিশুর অবস্থা যদি জটিল হয় তাহলে শিশুকে ডাক্তারের নিকট নিয়ে যেতে হবে। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে বক্ষব্যধি চিকিত্সকগণ সাধারণত এন্টিবায়োটিক সেবনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কিন্তু কোন শিশু যদি মারাত্মক নিউমোনিয়া অর্থাত্ শিশুর শ্বাস নেবার ও ছাড়বার সময় বুকের বা পাজরের নীচের অংশ ভিতরের দিকে বসে যায়, সেক্ষেত্রে চিকিত্সকগণ রোগীকে এন্টিবায়োটিক ইনজেকশন প্রয়োগ করে থাকেন। এ পরিস্থিতিতে চিকিত্সকগণ এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন যাতে রোগীকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা যায়। নিউমোনিয়া শিশুদের একটি জটিল রোগ। এই ব্যাধিটি প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ করাই শ্রেয়। একটু সতর্ক থাকলেই এই ব্যাধিটিকে খুব সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

২ মাস থেকে ৫  বছর বয়সী শিশুদের বাবা মাকে যে সকল বিষয় সচেতন থাকতে হবে-

lশিশুকে সুস্থ আলো বাতাসপূর্ণ পরিবেশে রাখতে হবে। স্যাঁতস্যাঁতে কিংবা ধোঁয়ামুক্ত পরিবেশ থেকে শিশুকে দূরে রাখতে হবে।

lশিশুকে সব সময় মায়ের সান্নিধ্যে রাখতে পারলে ভাল।

lবাচ্চার শরীর যাতে খুব বেশি ঠান্ডা না হয়ে যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

lযে সকল শিশু মায়ের বুকের দুধ খায় সেসব শিশুর সাধারণত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হবার ঝুঁকি কম থাকে। সেই শিশুকে নিয়মিত বুকের দুধ পান করাতে হবে।

l৬ মাসের পর বুকের দুধের পাশাপাশি অন্য খাবার খাওয়াতে হবে।

lহামের টিকা সঠিক সময়ে দিতে হবে।

lনিউমোনিয়া সম্পূর্ণ নিরাময় যোগ্য ব্যাধি। সঠিক সময়ে চিকিত্সকের শরনাপন্ন হলে এবং চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী শিশুকে সেবাদান ও ওষুধ সেবন করালে শিশুর পক্ষে সুস্থ ও সুন্দর জীবন যাপন করা সম্ভব।

 

অধ্যাপক ডাঃ একেএম, মোস্তফা হোসেন

বক্ষব্যাধি ও এজমা বিশেষজ্ঞ

চেম্বার:ইউনাইটেড হাসপাতাল, গুলশান-২, ঢাকা