মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা শুনে কাঁদলো ভিনদেশের শিশুরা

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২০, ১৯:২৯

তাহসীনা মুস্তারী অবন্তী

 

‘এটা কী বাংলাদেশের পতাকা!’ ‘আফটারনুন উইথ অবন্তী’ প্রামাণ্যচিত্রের পোস্টার দেখে আমাদের কোর্স পরিচালক লুইক ম্যাকবেনের এই প্রশ্নে আমি চমকে গেলাম! আমি বললাম, হ্যাঁ এটা আমার মাতৃভূমি বাংলাদেশের পতাকা। এরপর হলিউডের মুভিতে কাজ করা এ পরিচালক আমার কাছে বাংলাদেশের ইতিহাস জানতে চান। আমি তাকে সংক্ষেপে বাংলাদেশের ইতিহাস বলি। বলি মুক্তিযুদ্ধের কথা। মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ আর ২ লাখ নারীর সম্ভ্রম বিসর্জন দেওয়ার কথা শুনে ক্লাসের অনেকের চোখ ভিজে গিয়েছিল।

গতবছরের ২১ থেকে ২৬ জুলাই কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় ‘ডিজিটাল মিডিয়া একাডেমি’র এক কর্মশালার জন্য সারাবিশ্ব থেকে স্কলারশিপ প্রোগ্রামে বাংলাদেশ থেকে এই প্রথম আমি তাহসীনা মুস্তারী অবন্তী ও পাবনার সাবাবা আহমেদ অংশ নিই। আমি ভিকারুননিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্রী। আর সাবাবা পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার আল হেরা স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্রী। জাপান, ফ্র্যান্স, সুইডেন, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থীর মধ্যে আমরা দু’জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী কয়েকজনের সঙ্গে অন্যতম সেরা শিক্ষার্থী নির্বাচিত হই। আমরা দু’জনই দশ-এ দশ পাই। আমাদের এ ফলাফলে আগামী ২০২০ সাল থেকে বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে আগত শিক্ষার্থীরা কয়েকটি বিষয়ের ভিন্ন ভিন্ন ক্যাম্পে অংশ নেয়। বাংলাদেশ থেকে ক্যাম্পে এ বছরই প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে আমরা অংশগ্রহণ করি।

আমার বিষয় ছিল ‘ইন্ট্রো টু ফিল্মমেকিং’, আর সাবার বিষয় ছিল ‘অটোনোমাস আরডুইনো’। ৫ দিনের এই প্রশিক্ষণে আমাকে আফটারনুন উইথ অবন্তী শিরোনামে একটা টক শো টাইপের প্রাামণ্যচিত্রের স্ক্রিপ্ট লেখা, শুটিং, এডিটিং, সাউন্ড ডাবিং, পোস্টার বানানো থেকে সব কাজ করতে হয়। আমি বাংলাদেশের পতাকা দিয়ে ডকুমেন্টারির পোস্টার করে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে তুলে ধরি। এই প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের আগে আমি আগে কখনোই মুভি ক্যামেরা চালাইনি। তবে ফলাফল যাই হোক না কেন, আমি ছবি নির্মাণের বিষয়ে এখন খুবই আত্মবিশ্বাসী।

এ প্রোগ্রামে আমাদের ফিল্মের বিভিন্ন ধাপ ও বিষয় নিয়ে আমাদের কোর্স পরিচালক লুইক ম্যাকবেন সবাইকে ভিডিও তৈরি করা শেখান। একজন নিজের পরিচয় বলেছে আর দ্বিতীয়জন তা ভিডিও করবে। এছাড়াও নিউজ চ্যানেলের ভিডিও তৈরি করা, আন্তর্জাতিক ও আবহাওয়া বিষয়ক রিপোর্ট তৈরি করা। আমি দলনেতা নির্বাচিত হয়েছিলাম। আমাকে দেওয়া হয় প্রধান প্রতিবেদকের দায়িত্ব। স্ক্রিপ্ট লিখে সবার রিপোর্ট নিয়ে আলাদা আলাদা ভিডিও তৈরি করা হয়। এরপর আমাদের কয়েকটি বিখ্যাত হলিউড সিনেমার ট্রেইলার দেখানো হয় এবং সেগুলোর শুটিং, এডিটিং, ডাবিং নিয়ে আলোচনা করা হয়। আলোচনা হয় চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন কৌশল নিয়ে। পরে ইউনিভার্সিটির কিছু স্থান ঘুরে আমার স্পট নির্বাচন করি। বিভিন্ন স্থানের ছবি ওঠানো হয় এবং এসব স্থানে কোন ধরনের শুটিং করা যেতে পারে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। আউটডোরে স্পট নির্বাচনের বিষয়টিও ছিল আউট ডোর ক্লাসের অংশ। গল্প করেও যে ক্লাস করা যায় তা ছিল আমাদের কাছে পরম প্রাপ্তি। আসলে পড়াশোনা যদি আনন্দের মধ্য দিয়ে করা না যায় তবে কিছুই শেখা যায় না। আমি তখন ভাবি আমাদের দেশের শিশুরা খেলার মাঠ পায় না। দৌড়ানোর সময় পায় না। শুধু ক্লাস-কোচিং আর বাসা। সবসময় বন্দিজীবন। ইট-কাঠ-কংক্রিটের খাঁচায় বন্দি থাকি আমরা। আউট ডোর থেকে ক্লাসে ফিরে বলা হয় টিম মেম্বাররা মিলে কোনো একটা সিনেমা বানাতে দিলে সেই সিনেমার নাম, চরিত্র ও সংক্ষেপে তার বিষয় বর্ণনা করে টিম লিডারকে বোর্ডে এসে লিখতে হবে। আধঘণ্টা আলোচনার পর আমি প্রথমে আমার টিমের সঙ্গে আলোচনা করা সিনেমার নাম, চরিত্র ও সংক্ষিপ্ত বর্ণনা ইংরেজিতে লিখি। এভাবে সবাই এক এক করে সবার ভাবনা বলে আর আমি তা বোর্ডে লিখি। আমাদের কোর্স ডিরেক্টরের কাছে আমাদের সিনেমাটা বেশি পছন্দ হয়। সিনেমার বিষয় ছিল একটা দুষ্টু ছেলের দুষ্টুমি, কান্না, মারামারি ও বন্ধুতা। এছাড়াও আমার ডকুমেন্টারি তৈরি করা শিখি। শেষদিন আমি আর সাবা আপু শাড়ি পরে যাই। সকাল থেকে  অন্যরা নিজেদের এডিটিং ও শুটিং নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আমি প্রামাণ্যচিত্র সম্পাদনা শেষ করে তাতে সুর সংযোজন করি। বিকেলে ৪টায় অভিভাবক-বন্ধু-শুভানুধ্যায়ীদের সামনে সবার কাজ দেখানো হয়। ছিল সনদপত্র বিতরণ পর্ব। নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমাদের ৫ দিনের ক্যাম্প শেষ হয়। আমার স্বপ্ন বাংলাদেশের মহান মুক্তি সংগ্রামের ২শ’ বছরের বেশি সময়ের গল্প নিয়ে একটা আন্তর্জাতিকমানের বিশাল ক্যানভাসের পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করবো। আমি আমার বাবার লেখা সত্য ঘটনার গল্প ‘ওয়ান সিক্সটি ফোর’ নিয়ে একটা টেলিছবি তৈরি করবো। ৫ দিনের প্রোগ্রাম শেষে আমরা ব্রিটিশ কলম্বিয়ার বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান, নায়াগ্রা জলপ্রপাতসহ অটোয়া, কানাডার সুপ্রিম কোর্ট, পার্লামেন্ট ভবন, মন্ট্রিয়ল অলিম্পিক স্টেডিয়াম ও টরেন্টোতে বিভিন্ন বাংলাদেশিদের সঙ্গে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করি।

 

লেখক:শিক্ষার্থী, ভিকারুননিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজ