দুর্গম লালমাটি টিলার মেঠোপথে

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২০, ১৯:৩০

চা বাগানের ভেতর দিয়ে ২ কিলোমিটার সামনে এগুলেই আকর্ষণীয় লালমাটি টিলার ওপর চোখে পড়বে কালী মন্দিরটি। সমতল ভূমি থেকে প্রায় ২শ’ ফুট ওপরে অবস্থিত লালমাটি কালী মন্দিরে যাওয়ার জন্য টিলা কেটে তৈরি করা হয়েছে আকর্ষণীয় একটি মেঠোপথ

ইসমাইল মাহমুদ

 

ইতিহাস ঐতিহ্যের নগরী মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় রয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক দর্শনীয় স্থান। এসব দর্শনীয় স্থানের মধ্যে অন্যতম হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উপসানালয় লালমাটি টিলার কালী মন্দির। প্রতিদিন এ কালী মন্দিরে বাংলাদেশ ও ভারতের শতশত দর্শনার্থী ভিড় জমাচ্ছেন। শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন নয়, আকর্ষণীয় এ স্থানটি দেখতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার পদচারণায় মুখর।

মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ফিনলে টি কোম্পানির ফুলছড়া চা বাগানের ৫ নম্বর সেকশনে একটি লাল টিলায় কালী মন্দিরটির অবস্থান। ফুলছড়া চা বাগানের প্রবেশমুখে প্রথম নিরাপত্তা গেট থেকে বামপাশ দিয়ে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা সড়ক ধরে চা বাগানের ভেতর দিয়ে ২ কিলোমিটার সামনে এগুলেই আকর্ষণীয় লালমাটি টিলার ওপর চোখে পড়বে কালী মন্দিরটি। সমতল ভূমি থেকে প্রায় ২শ’ ফুট ওপরে অবস্থিত লালমাটি কালী মন্দিরে যাওয়ার জন্য টিলা কেটে তৈরি করা হয়েছে আকর্ষণীয় একটি মেঠোপথ। দু-পাশের সারিসারি চা বাগানের অভ্যন্তর এবং দুর্গম পাহাড় কেটে তৈরিকৃত মেঠোপথ দিয়ে পায়ে হেঁটে ২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছতে হবে পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত কালী মন্দিরে। চূড়ায় ওঠার পথে এগুতে হবে অত্যন্ত সাবধানে। পা পিছলেই ঘটতে পারে বিপদ। টিলায় উঠলেই মনপ্রাণ জুড়িয়ে যাবে। চারদিকের অপরূপ সৌন্দর্য মন কেড়ে নেবে মুহূর্তেই।

লালমাটি টিলার চূড়ায় অবস্থিত কালী মন্দিরে গিয়ে দেখা যায় প্রায় অর্ধশতাধিক দর্শনার্থী দুর্গম পাহাড় অতিক্রম করে সুউচ্চ টিলার কালী মন্দিরে উঠে মন্দির দেখার পর মন্দিরের চারপাশ ঘুরে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের মাঝে একটু প্রশান্তির পরশ খুঁজছেন। মন্দিরের চারপাশে সবুজের সমারোহে সকলের হূদয় মন কেড়ে নিচ্ছে। টিলার ওপরে দাঁড়িয়ে মনে হয় চারপাশের সুনীল আকাশ দূরে গিয়ে মিশে যাচ্ছে মাটিতে। সে এক অপরূপ দৃশ্য।

সৌন্দর্যের আঁধার লালমাটি কালী মন্দির দর্শনে আসা ভারতের কলকাতার তরুণ কুমার আইচ, তার স্ত্রী শ্যামলী আইচ ও কন্যা ত্রিশিতা আইচ (তিতলী) লালমাটি টিলার সৌন্দর্য দেখে বিমোহিত। তরুণ কুমার আইচ জানান, দেশ-বিদেশের অনেক সৌন্দর্যময় স্থান তারা দেখেছেন। এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তারা আগে দেখেননি।

ঢাকা থেকে লালমাটি টিলা দেখতে আসা গণমাধ্যম কর্মী রাজিব রায় এসেছেন স্ত্রী সুমনা পাল চৌধুরী ও কন্যা চৈতি রায়কে সঙ্গে নিয়ে। রাজিব রায় জানালেন, তিনি বহুবার এ স্থানটি দেখতে এসেছেন। যত আসেন ততই ভালোলাগার আবেশে মুগ্ধ হন তিনি। এবার এসেছেন স্ত্রী-সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে। রাজিব রায় জানান, সুউচ্চ টিলার ওপরে অবস্থিত লালমাটি কালী মন্দিরের আশেপাশে কোনো পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই। অনেক সময় এত ওপরে ওঠার পর পানীয় জলের পিপাসা লাগতে পারে। এছাড়া আশেপাশে কোনো শৌচাগার নেই। আর কালী মন্দিরে সার্বক্ষণিক লোক রাখাও আবশ্যক। মন্দিরটি তালাবদ্ধ থাকায় সাধারণ দর্শনার্থীরা মন্দিরের বাইরে থেকেই কালী মাকে দর্শন করে ফিরে যান। যেহেতু এখানে প্রতিদিনই অনেক হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা আসেন সেহেতু মন্দিরে একজন সার্বক্ষণিক সেবায়েত থাকা প্রয়োজন। সমতল ভূমি থেকে পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত মন্দিরের উচ্চতা অনেকের কাছে অজানা। তার মতে, পাহাড়ের চূড়া সমতল ভূমি থেকে কতটুকু ওপরে তা পর্যটকদের জানানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। নতুবা হূদরোগী মারাত্মক সমস্যায় নিপতিত হবেন।

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার হরিপুর গ্রামের জলিল মিয়া বন্ধুদের সঙ্গে এসেছেন লালমাটি টিলায়। টিলার চূড়ায় আরোহণ করে তিনি উচ্ছ্বাসিত। তিনি জানালেন, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ঘুরতে এসে বিভিন্নজনের কাছে এ স্থানটির কথা শুনে দেখতে এসেছেন। এ স্থানটি তার কাছে স্বর্গোধ্যান মনে হচ্ছে। এত সুন্দর একটি স্থান কেন অবহেলায় পড়ে রয়েছে সেটি নিয়ে তিনি বিষ্ময় প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন এ স্থানটি মৌলভীবাজার জেলার অন্যতম সৌন্দর্যময় একটি পর্যটন স্পট হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারে।

লালমাটি টিলার কালী মন্দিরের ইতিহাস সম্পর্কে ফুলছড়া চা বাগানের নিয়মিত শ্রমিক জগীন্দ্র তাঁতী জানান, শতাধিক বছর পূর্বে লালমাটি টিলা ও টিলার আশেপাশে বাগানের শ্রমিক কলোনি ছিল। সে সময়ে টিলার চূড়ায় দণ্ড কালী পূজো হতো। এক সময় চা বাগান কর্তৃপক্ষ চা শ্রমিকদের শ্রমিক লাইন লালমাটি টিলা থেকে সমতল এলাকায় সরিয়ে নেয়। এরপর থেকে টিলা এলাকায় পূজা-অর্চনা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তিনি জানান, ২০০০ সালে ময়মনসিংহ কৃষি বিদ্যালয় থেকে একদল ছাত্রছাত্রী শ্রীমঙ্গলে পিকনিক করতে আসে। তারা পিকনিকের জন্য বর্তমানে কালী মন্দির যেখানে অবস্থিত সে স্থানটি বেছে নিয়েছিল। পিকনিক শেষে বিকেলে তারা ফিরে যাওয়ার সময় আকস্মিকভাবে তাদের গাড়িটি টিলার পার্শ্বের খাদে প্রায় ২শ’ ফুট নিচের পড়ে যায়। এ ঘটনায় গাড়ির চালক ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। এ ঘটনার প্রায় ৬ বছর পর ২০০৬ সালের দিকে এক রাতে ওই বাগানের এক শ্রমিক স্বপ্নে দেখেন লালমাটি টিলার সামনে দিয়ে এক লোক গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় গাড়িটি ঝিলের পানিতে পড়ে যাচ্ছে। ঠিক তখনই লম্বা গড়নের কালো এক মহিলা ঝিলের কাছে এসে গাড়িটি ঝিলের পানিতে নিমজ্জিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেন। বিপদমুক্ত হয় গাড়িটি এবং গাড়ির চালক। স্বপ্নে এটি দেখার পর ওই চা শ্রমিক স্বপ্নের ঘটনাটি বাগানের পঞ্চায়েতদের জানালে সবাই মিলে এখানে কালী মন্দির করার সিদ্ধান্ত নেন।

ফুলছড়া চা বাগানের সাবেক টিলা বাবু বাপ্পি জানান, লালমাটি টিলার চূড়ায় ২০০৭ সালে কালী মন্দির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। মন্দির নির্মাণের পর কালী মূর্তি নির্মাণ কাজ অর্ধেক হওয়ার পর বিভিন্ন কারণে বন্ধ রাখা হয়েছিল। কিছুদিন পর মন্দিরে গিয়ে দেখা যায় একটি বিষধর সাপ অর্ধ সমাপ্ত কালী মূর্তিটিকে পেঁচিয়ে ধরে আছে। বাগানবাসী অনেক চেষ্টা করেও সাপটিতে ওই মূর্তি থেকে সরাতে পারছিলেন না। পরে এলাকায় পূজা-অর্চনা করা হয়। পূজা-অর্চনার পর সাপটি নিজেই সরে গেলে মন্দিরের কালী মূর্তি নির্মাণের কাজ শেষ করা হয়।

বাগানের মানস তাঁতী জানান, বর্তমানে ফুলছড়া চা বাগানের লালমাটি টিলায় অবস্থিত কালী মন্দিরের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে প্রতিদিনই অসংখ্য ভক্ত এখানে ভিড় জমাচ্ছেন। কেউ কেউ এখানে মানস নিয়ে আসছেন, কেউ কেউ কালী মাতার পূজো দিচ্ছেন মনোবাসনা পূর্ণ হওয়ার লক্ষ্যে। প্রতিবছর চৈত্র মাসে এ মন্দিরে দণ্ড কালীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়। যদি কর্তৃপক্ষ লালমাটি টিলা ও কালী মন্দিরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন তবে এ স্থানটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য হতে পারে জেলার অন্যতম দর্শনীয় পর্যটন স্পট।

 

আলোকচিত্র:মাহফুজ সুমন