একটা ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে যে আধ্যাত্মিক হওয়া মানে আপনি ভালো খাবার খান না, ভালো সাজপোশাক পরেন না, বা ভালোভাবে জীবন নির্বাহ করেন না। না। যোগ ব্যাপারটা জীবনের জন্য নিজেকে ক্ষমতাসম্পন্ন করে তোলা। এটা জীবনকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য নয়। ‘জীবন’ বলতে আমি জীবনের আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোর কথা বলছি না। আজকাল যখন মানুষ ‘আমার জীবন’ বলেন, তখন তারা সচরাচর তাদের কাজের সম্বন্ধে, বা তাদের পরিবারের, তাদের বাড়ির বা হয়তো তাদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের সম্বন্ধে বলেন। এগুলো সবই জীবনের সঙ্গে যুক্ত আনুষঙ্গিক বিষয়। আমরা আমাদের জীবনে যা কিছু যোগ করেছি—শরীর ও মনের অভ্যন্তরের বিষয়বস্তুসমেত—সেসব এই বিশ্বাসেই যুক্ত করেছি যে সেগুলো আমাদের জীবনকে আরো উন্নত করে তুলবে। আর তাদের সেইভাবেই কাজ করা উচিত। আপনার নিজের শরীর এবং আপনার জীবনের ব্যবস্থাগুলি আপনার সামনে একটা দেওয়ালের মতো হয়ে ওঠা উচিত নয়। আর আপনি যদি সেগুলিকে এক নির্দিষ্টভাবে না রাখেন, সেগুলো একটা প্রাচীরে পরিণত হবে।
আপনি হয়তো বেঁচে থাকতে পারেন কিন্তু আপনি জীবন সম্বন্ধে কিছুই জানতে নাও পারেন, কারণ আপনার সারা জীবনটাই কেটে যেতে পারে কেবল জীবনের আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো নাড়াচাড়া করতে করতে। জীবনের ক্রিয়াকলাপগুলো জীবন নয়। এটা এমন নয় যে, আমরা সক্রিয় আছি বলেই আমরা জীবিত, আর জীবিত আছি বলেই আমরা ক্রিয়াকলাপে সমর্থ। আপনি যদি আপনার প্রাণময়তা অনুভব না করেন, আপনি যদি জীবিত থাকার বিভিন্ন মাত্রাগুলো না জানেন, তাহলে জীবনটাই বৃথা।
তারা সবাই শীঘ্রই সেকেলে হয়ে যাবেন, যারা শুধুই ক্রিয়াকলাপ নিয়ে ব্যস্ত আর কখনো জীবনকে উপলব্ধি করেন না, কারণ রোবটেরা আসছে! ভবিষ্যতে একদিন এমন সব যন্ত্র আসছে যেগুলো আপনার করণীয় সব রকম কাজে আপনার থেকে বেশি দক্ষ হবে। তখন আমাদের আপনাকে ‘মুছে দিতে’ হবে, যদি না আপনি এমন একটা জীবন হন, যাকে কোনো যন্ত্রই অনুকরণ করতে পারে না। আপনার সংগৃহীত সবকিছু—আপনার সব তথ্য এবং জ্ঞান—আমরা সেই সব, একসঙ্গে জমা করে একটা যন্ত্রের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে তাকে সক্রিয় করতে পারি। কিন্তু মানুষ হওয়ার কারণে আপনার মধ্যে এমন কিছু একটা আছে, যা অনন্য। যদি সেটা সক্রিয় না থাকে, যদি সেটার উপলব্ধি না হয়, তাহলে যন্ত্রেরা আসছে! তারা আপনার থেকে বেশি ভালো চিন্তা আর কাজ করবে, তখন আপনাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, ‘আপনাকে প্রয়োজন কীসের জন্য?’
এটা দারুণ হবে যদি সব কাজ যন্ত্রেরা করে, কারণ তখন, আমরা শুধুই বাঁচতে পারি। কিন্তু আপনি যদি জীবনধারণের উপায়টা শিখে না থাকেন, আর আপনার কাছ থেকে সব কাজ সরিয়ে নেওয়া হয়, আপনি পাগল হয়ে যাবেন। কারণ, আপনার কোনো কাজ করার থাকবে না। লোকেরা ভাবে, জীবন পুরোটাই হলো তারা যা করছে তা-ই নিয়ে। না। জীবনটা কিছু করা নিয়ে নয়, জীবনটা একটা অস্তিত্ব। আপনি একটা অস্তিত্ব। কাজ করা উচিত দুনিয়ার প্রয়োজন অনুযায়ী। যদি কিছুর প্রয়োজন হয়, আমরা সেটা করব। যদি কিছুর প্রয়োজন না হয়, আমরা সেটা করব না।
ঘটনাক্রমে একসময়, দুজন ব্যক্তি রাস্তার ধারে কাজ করছিল। একজন গর্ত খুঁড়ছিল আর অপরজন তার পেছনে গর্তগুলো বোজাতে বোজাতে আসছিল। তারা এটা অবিরাম করে চলেছিল। একজন পথচারী লক্ষ করলেন সেটা, এবং জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনারা কী করছেন?’ তাই প্রথম ব্যক্তি উত্তর দিলেন, ‘আসলে আমরা হলাম তিন জনের একটা দল। আমি গর্ত খুঁড়ি, আর তিনি গর্ত বোজান। মধ্যেকার ব্যক্তি, যিনি গাছ পোঁতেন তিনি ছুটিতে আছেন।’
মানুষের সকল ক্রিয়াকলাপ এই রকমই হয়ে পড়বে, যদি আবশ্যক সচেতনতার অভাব থাকে। যে গর্ত খুঁড়ছে, আর যে গর্ত বন্ধ করছে, উভয়েই এটা বিশ্বাস করে যে তারা যেন প্রগাঢ় কিছু একটা করছে। না। আপনার প্রগাঢ়তা আপনার ক্রিয়াকর্মে থাকে না, আপনার প্রগাঢ়তা থাকে শুধু আপনার অস্তিত্বে। যদি সেখানে প্রয়োজনীয় সচেতনতা থাকে, তাহলে প্রয়োজন অনুযায়ী ক্রিয়াকর্ম ঘটবে। যখন প্রয়োজন হবে আমরা কাজ করব, অন্যথায় আমরা শান্ত হয়ে বসে থাকব। এটা এরকমভাবেই হওয়া উচিত।
n সৌজন্যে : ঈশা ফাউন্ডেশন
