অণুগল্প

লজ্জা

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০১৮, ২০:৩৩

         

রনি লন্ডনে পাড়ি দিয়েছিল লেখাপড়া করার ইচ্ছায়। সেই যে ও গেল, আর ফিরে এল না। পড়াশোনা শেষ করে ওখানে একটা চাকরি নিয়েছে ও। ক’বছর পর এসেছিল একবার। মা-টা বেঁচেছিল তখন। বাপটা আগেই চলে গিয়েছিল পরপারে। মা-র কান্নাকাটিতেই ওর আসা। সেবার মা-র কাছে অনেক গল্প করেছিল ও। লন্ডনের গল্প। ওর বিয়ের গল্প। সোহানা আকাশ নামের এক অভিবাসী বালিকার সঙ্গে ওর পরিচয় হয় ওখানে। ওরা সমবয়েসি। ভার্সিটিতে পড়াকালীন সম্পর্কটা বিয়েতে রূপ নেয়। সে মাকে তা জানিয়েছিল এক চিঠিতে। ছেলের জীবনসঙ্গিনী হয়েছে এই মেয়েটি, এটা ছিল রনির মা-র কাছে খুশির খবর।

রনি দেখতে রাজপুত্রের মতো। ইংরেজিটা ভালোই রপ্ত করেছে ও। সোহানা ওকে ভালো করেই শিখিয়েছে। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘ক্যাপটিভ লেডি’ লেখার মতো যেন যোগ্য হয়ে উঠেছে ও। রনির সঙ্গে এই প্রথম বাংলাদেশে এসেছে সোহানা। ওর শাশুড়ি যারপরনাই ওকে আদর-যত্নও করছে। ওরও তো মাতৃভূমি ছিল এই দেশ। কতকাল আগে ওরা দেশ ছেড়েছিল, তা ওর জানা নেই। শ্যামলিমায় ভরা সুন্দর দেশ। খুব ভালো লাগছে ওর। দারুণ মুগ্ধ। ঢু মারছে এখানে-ওখানে। এই তো আজ, ঢাকা শহরের কত জায়গা সে ঘুরে বেড়াল। কত কী দেখল। এই দেখার মধ্যে তার অনুভূতিতে একটা বিষয়ে একটু খটকা লাগল। সোহানা বলল, ‘সারা ঢাকা শহরের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের নাম এবং নামফলকগুলো ইংরেজিতে লেখা এবং কিছু নামফলক অন্য ভাষার। এমনকি গাড়ির নাম ইংরেজি ও গায়ের লেখাও ইংরেজি। লন্ডন শহরে তো অন্য ভাষায় নিজস্ব কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচিতিমূলক একটি নামফলকও খুঁজে পাওয়া যাবে না। একজন ইংরেজের কথা বলার সময় অন্য ভাষার কোনো শব্দ শোনা যায় না।’

সোহানার কথার গুরুত্ব বুঝল রনি। বাংলা ভাষাকে ওরা ‘বাংলিশ’ ভাষা বানাতে চায়। সোহানা বলল, ‘দেখ, ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বিজয়গাথা রচিত হয়েছিল নিম্ন ও মধ্যবিত্তের মানুষগুলোর ঐকান্তিক চেষ্টায়। তাদের অবদানই বেশি। অথচ সমাজের কিছু মানুষ সুখ-সুবিধা-স্বার্থ ছাড়া কিছুই বোঝে না। আমরা জানি, পরাধীন ব্রিটিশযুগেও বাংলা সাহিত্যে ইংরেজির মিশ্রণ ছিল না। একদমই ছিল না। আজ স্বাধীন বাংলাদেশে কেন ভাষার এত অমর্যাদা? ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখের সাহিত্যে ইংরেজি শব্দের কোনো বাহুল্য নেই। মাতৃভাষার মর্যাদার প্রশ্নে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু একটি সুন্দর কথা বলেছিলেন। তা হলো, ‘টু লেট’ সাহেবদের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে। ওদের দিন শেষ। অর্থাত্ আর ‘টু লেট’ নয়, ‘বাড়ি ভাড়া’ এভাবে লিখতে হবে।’

সেদিন সোহানা আরো বলল, ‘আমি সত্যি সত্যি বলছি, ঢাকার অনেক জায়গা লন্ডন নগরীর অংশ বলে ভ্রম হয়। ঢাকার অদূরে পুলিশ প্রশাসনের প্রথম শ্রেণির কিছু উচ্চপদস্থ  কর্মকর্তার আবাসিক বহুতল ভবনগুলির নামফলক ইংরেজিতে করা এবং সেখানে প্রতিষ্ঠিত স্কুল ও দোকানের নামও ইংরেজি ভাষায় লেখা। এটা দেখে আমি কষ্ট পেয়েছি।’ তার মনে হলো—ভাষার বিপর্যয় কি একটা জাতির স্বকীয়তা বিনষ্টের শামিল নয়?